এটাকে কোনোমতেই ঘটতে দেয়া যাবে না, একে কোনোধরনের প্রশয় দেয়ার প্রশ্নই উঠে না। সে এটা ঘটতে দিতে পারে না। হুমায়ুন হাটু ভেঙে বসে পড়ে এবং উঁচু স্বরে একটা প্রতিশ্রুতি উচ্চারণ করে।
যত পরিশ্রমই সহ্য করতে হোক, যতদীর্ঘই হোক আমাদের সগ্রাম, আমি অবশ্যই আবারও হিন্দুস্তানের সম্রাট হব। আর এটা করার জন্য আমি আমার দেহের শেষ রক্ত বিন্দুটুকুও আমি বিসর্জন দিতে প্রস্তুত। আমার আব্বাজানের কল্পনার চেয়েও বিশাল একটা সাম্রাজ্য উত্তরাধিকার সূত্রে আমার সন্তান এবং তাঁদের সন্তানদের জন্য রেখে যাব। আমি, হুমায়ুন এটা শপথ করে বলছি।
*
হুমায়ুন আর তার সৈন্যবাহিনী মারওয়ারের নিকটবর্তী হতে মরুভূমির উষ্ণতা প্রায় অসহনীয় মাত্রায় পৌঁছে। প্রতিটা দিন যেন আগের দিনের চেয়ে উষ্ণতর এবং প্রাণান্তকর বলে মনে হয়। চওড়া, চ্যাপ্টা পায়ের অধিকারী খিটখিটে মেজাজের উটের পাল পরিস্থিতি কোনোমতে সামাল দেয় কিন্তু ঘোড়া আর মালবাহী খচ্চরগুলো কোমর পর্যন্ত বহমান গনগনে বালিতে ডুবে যায়। প্রতি দিনই, নিস্তেজ ভঙ্গিতে পা নেড়ে আর ফাটা ঠোঁটের মাঝ দিয়ে বের হয়ে থাকা খটখটে শুকনো জীহ্বা নিয়ে, ক্লান্তি আর পানি শূন্যতায় আক্রান্ত পশুগুলো মুখ থুবড়ে পড়ছে। হুমায়ুন তার লোকদের আদেশ দিয়েছে মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে যাওয়া হাঁটতে অক্ষম পশুগুলোকে জবাই করে সেগুলোর মাংস রান্না দিয়েছে, কিন্তু সেই সাথে সে জম্ভগুলোর রক্ত সংগ্রহ করারও নির্দেশ দিয়েছে। তৈমূরের আমলে, আদিগন্ত বিস্তৃত তৃণভূমিতে নিজেদের ভারবাহী জম্ভর রক্ত পান করে যোদ্ধারা অনেক বিপর্যয় সামাল দিয়েছে।
হুমায়ুন, কাঁধের উপর দিয়ে পেছনে তাকিয়ে, হামিদাকে বহনকারী চারদিকে আবদ্ধ পালকিটাকে চোখ ঝলসানো রূপালি অস্পষ্টতার ভেতর থেকে তাঁর শক্তিশালী ছয়জন লোকের কাঁধে স্থাপিত অবস্থায় বের হয়ে আসতে দেখে। খানজাদা, গুলবদন এবং বহরের সাথে ভ্রমণকারী অন্যান্য সম্ভ্রান্ত মহিলারা টাট্ট ঘোড়ায় ভ্রমণ করলেও, গর্ভবতী হামিদার পথের কষ্ট দূর করতে হুমায়ুন সম্ভাব্য সবকিছু করতে চেষ্টা করছে। পালকিটার বাঁশের তৈরী কাঠামোর দুপাশে ঘাস আর সুগন্ধি লতাপাতা দিয়ে একটা আচ্ছাদনের মতো তৈরী করা হয়েছে এবং কয়েক ঘন্টা পরপর পরিচারকেরা মরুভূমির প্রেক্ষাপটে সোনার চেয়েও মূল্যবান পানি দিয়ে সেটা ভিজিয়ে দিচ্ছে, দাবদাহের কবল থেকে হামিদাকে খানিকটা হলেও সুবাসিত প্রশান্তি দিতে। এতসব প্রয়াসের পরেও, তাঁর মুখ খুবই রুগ্ন দেখায় এবং তাঁর চোখের নীচের প্রায় স্বচ্ছ ত্বকের চারপাশে সৃষ্ট কালো দাগ স্পষ্টই জানিয়ে দেয় যে গর্ভাবস্থা তার জন্য মোটেই কোনো সুখকর অভিজ্ঞতা নয়। হামিদা প্রায়শই বিবমিষা বোধ করে এবং খাবারের প্রতি প্রচণ্ড অরুচি দেখা দেয়।
হামিদাকে বহনকারী পালকিটা নিকটবর্তী হতে দেখে, হামিদাকে হারাবার ভয়টা নতুন করে হুমায়ুনকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। তাকে রক্ষা করতে এবং নিরাপদ স্থানে নিয়ে যেতে, হুমায়ুন তাঁর সামর্থ্যের ভিতরে রয়েছে এমন কোনো কিছু করতে দ্বিধা করছে না, কিন্তু তারপরেও বিপদ চারপাশে ওঁত পেতে রয়েছে। সাপ আর বিছে ছোবল দেয়ার জন্য ফণা তুলে রয়েছে। মরুভূমিতে গিজগিজ করতে থাকা দস্যুবাহিনীও তাঁদের জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে, যেহেতু তার খুব অল্প সংখ্যক সৈন্যই এখন অবশিষ্ট আছে- খুব বেশী হলে হাজারখানেক হবে। কাবুল তাঁর হাতছাড়া হয়েছে জানতে পেরে, তার বাহিনীর একটা বিশাল অংশ ভোজবাজির মতো শূন্যে মিলিয়ে গেছে।
আল্লাহ সহায় থাকলে তারা শীঘ্রই মারওয়ার রাজ্যের কাছাকাছি পৌঁছে যাবে এবং সেখানে আশ্রয় লাভ করবে। রাজা মালদেওয়ের সমর্থনজ্ঞাপক বার্তা হুমায়ুনকে যে রাজদূত সরকার ত্যাগ করতে রাজি করিয়েছিল সেই একই রাজদূত সাম্প্রতিক সময়গুলোতে বার্তাবাহকের দায়িত্ব পালন করছেন- হুমায়ুন তার বাহিনী নিয়ে রাজ্যের নিকটবর্তী হবার সাথে সাথে পাল্লা বেড়ে চলেছে। সে অবশ্য আশা করেছিল মালদেও ব্যবহার উপযোগী সাহায্য করবেন- রসদ, পানি এবং তাজা ঘোড়ার পাল প্রতিশ্রুতির সুললিত বাণীর চেয়ে এই মুহূর্তে তার কাছে অনেকবেশী কাম্য। কিন্তু হুমায়ুন এইসব সাহায্যের জন্য অনুরোধ জানাতে ইতস্তত বোধ করে। সে মহারাজের অতিথি এবং মিত্র হিসাবে মারওয়ার যাচ্ছে, ভিক্ষুকের মতো সাহায্যপ্রার্থী হিসাবে না।
চামড়া দিয়ে বাঁধান লাল খেরো খাতাটা যেখানে কাশিম দায়িত্বের সাথে প্রতিদিন তাদের রসদ খরচ হবার পরিমাণ লিপিবদ্ধ করেন, ঠিক যেমনটা তিনি রাখতেন বাবর যখন সমরকন্দে অবরুদ্ধ ছিল তখন, সেটায় লিপিবদ্ধ নথি থেকে দেখা যায় বেঁচে থাকার মতো এখনও যথেষ্ট পরিমাণ খেজুর, শস্য আর অন্যান্য শুকনো ফল তাঁদের সংগ্রহে রয়েছে। অবশ্য, রোগাক্রান্ত অথবা ক্লান্ত হাড় জিরজিরে পশুর মাংস, যদি আদৌ সেটাকে তাজা বলা যায় ছাড়া, শেষ কবে তাঁরা তাজা মাংস খেয়েছে মনেই করতে পারবে না। তাদের চলার পথে যেসব গ্রাম পড়ত প্রথম দিকে তারা সেখান থেকেই প্রয়োজনীয় রসদ সংগ্রহ করতো। এখন আমের মৌসুম চলছে। এবং চকচকে সবুজ পাতার মাঝে থোকায় থোকায় ঝুলে থাকা মিষ্টি গন্ধযুক্ত, কমলা রঙের, কোমল ফলটার রসাল অংশই হামিদা একটু আগ্রহ করে খায়। কিন্তু ছয়দিন আগে তারা শেষ বসতিটা অতিক্রম করেছে- একটা কুয়ার চারপাশে মাটির তৈরী ঘরবাড়ির একটা জটলা আর তারপরে মরুভূমি তাদের গ্রাস করে ফেলেছে। আহমেদ খানের গুপ্তদূতেরা, চন্দ্রালোকিত রাতের আঁধারে সামনে বহুদূর পর্যন্ত এগিয়ে গিয়েও কোনো বসতির সন্ধান খুঁজে পায়নি।
