না। আমি এসবের কিছুই জানতাম না। হুমায়ুন নিজেকে সুস্থির করতে আপ্রাণ চেষ্টা করে। তোমার আব্বাজান মোটেই আমার বিশ্বাসের অমর্যাদা করেননি- আমার জন্য তিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন এবং আমি এটা কখনও ভুলবো না। তুমি অনেকদূরের পথ অতিক্রম করে আসছে, তোমার এখন বিশ্রামের প্রয়োজন এবং এ বিষয়ে আমরা পরে বিস্তারিত আলোচনা করবো। সেখানে ঠিক কি ঘটেছিল সে সম্বন্ধে আমাকে যতটা সম্ভব অবশ্যই জানতে হবে।
আহমেদ খানের লোকেরা দারইয়াকে হুমায়ুনের সামনে থেকে সরিয়ে নিয়ে যেতে, সে একটু একা থাকতে চায় ইঙ্গিতে জওহরকে সেটা বুঝিয়ে দিয়ে সে তাবুর ভেতরে প্রবেশ করে। ঠাণ্ডা পানি দিয়ে চোখে মুখে ঝাপটা দেয়ার সময় সে নিজের মুখে তাঁদের শীতল পরশ খুব একটা টের পায় না। পরস্পরবিরোধী আবেগ- যার কোনটা ব্যক্তিগত, কোনটা রাজনৈতিক, কিন্তু এসবের একটাও সুখকর না- তার মনের ভিতরে হুড়োহুড়ি করছে। তার নানাজানকে সে আর কখনও দেখতে পাবে না এটা জানার পরে শুরুতে এই শোকই ছিল সবচেয়ে প্রবল। তাঁর আব্বাজানের মুখে বাইসানগারের যৌবনের প্রাঞ্জল গল্পগুলো স্মরণ করতে গিয়ে হুমায়ুন চোখ বন্ধ করে ফেলে, অশ্বারোহী বাহিনীর একজন তরুণ যোদ্ধা হিসাবে কিভাবে তিনি তৈমূরের আঙ্গুরীয় বাবরের কাছে নিয়ে এসেছিলেন, আংটিটা তখনও পূর্ববর্তী ধারকের রক্তে সিক্ত; বাবরের প্রতি নিজের বিশ্বস্ততার কারণে বাইসানগার কিভাবে নিজের ডানহাতকে তুচ্ছ জ্ঞান করেছিলেন এবং তাঁর জন্য সমরকন্দের তোরণদ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন। হুমায়ুনের আম্মিজান মাহামও নিজের আব্বাজানের অনেক গল্প জানতো- সেগুলো অবশ্য কম সংঘাতময় কিন্তু অনেকবেশী আবেগময়। বাইসানগার এখন মৃত এবং হুমায়ুনের বিয়ের কথা না জেনেই তিনি মারা গেছেন। কামরান আর আসকারি কাবুল আক্রমণের পূর্বেই তিনি মারা গেছেন এই একটা যা বাঁচোয়া।
ভাবনাটা মনের ভিতরে উঁকি দিতেই, শোকের চেয়ে রূঢ় একটা আবেগ তাঁকে আচ্ছন্ন করে- সৎ-ভাইদের প্রতি নির্মম ক্রোধ। ঠিক এই মুহূর্তে যদি তার সামনে হাজির করা হত তাহলে তাদের বিশ্বাসঘাতক মাথাগুলোকে দেহের বরাভয় থেকে বিচ্ছিন্ন করে লাথি মেরে ধূলোতে সেগুলো গড়িয়ে দেয়া থেকে সহমর্মিতা প্রদর্শনের জন্য বাবরের শত অনুরোধও তাঁকে বিরত রাখতে পারতো না। সহজাত প্রবৃত্তির বশে হুমায়ুন তার কোমরের পরিকর থেকে খঞ্জরটা টেনে বের করে আনে এবং তাবুর অন্যপ্রান্তে লাল গোলাকার একটা তাকিয়া লক্ষ্য করে- সেটা ছুঁড়ে দিতে খঞ্জরটা গিয়ে তাকিয়ার ঠিক মধ্যস্থলে বাঁট পর্যন্ত গেঁথে যায়, সে মনে মনে ভাবে তাকিয়াটা যদি কামরানের কণ্ঠনালী হত।
কামরান নিজের জন্য সিংহাসনের একটা সম্ভাবনা আঁচ করতে পেরে এবং তাঁর আগ্রহী সহযোগী হিসাবে আসকারীকে সাথে নিয়ে সে সুযোগটা গ্রহণ করেছে। তারা যতদিন কাবুল দখল করে রাখবে, ততদিন হুমায়ুনের পক্ষে হিন্দুস্তানে নিজের কর্তৃত্ব। পুনরায় ফিরে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। একটা বিষয় বহুদিন আগেই প্রমাণিত হয়েছে। যে পারিবারিক একতা, মোগল রাজবংশের জন্য গর্ব এসব বিষয়ের চেয়ে তাঁদের কাছে নিজেদের ধনবান, লাভবান করার সুযোগ, এবং যেনতেন প্রকারে তার ক্ষতিসাধন করাটাই যেন আপাত দৃষ্টিতে বেশী গুরুত্বপূর্ণ। তাদের এই প্রতিহিংসাপরায়ন ঈর্ষা কতটা ভয়ঙ্কর, তাঁদের সবাইকে এটা কি বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে এই বিষয়টা তারা কেন কখনও বুঝতে চেষ্টা করেনা?
নিজের মনের ভাবনাগুলোকে গুছিয়ে নেয়ার চেষ্টা করতে করতে হুমায়ুন পায়চারি করতে থাকে। তাকে অবশ্যই চিন্তাভাবনা করে যুক্তিযুক্ত আচরণ করতে হবে কারণ তার সাথে এখন তার স্ত্রী আর তাঁদের অনাগত সন্তানের ভবিষ্যতও জড়িয়ে রয়েছে। হামিদার কথা মনে হতে ক্ষণিকের জন্য তার মেজাজ প্রসন্ন হয়ে উঠে। চারপাশের বিপদসঙ্কুল পারিপার্শ্বিকতা সত্ত্বেও, গত কয়েক সপ্তাহ ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে আনন্দময় সময়, বিশেষ করে একমাস আগে, চোখের তারায় দারুণ প্রভা নিয়ে হামিদা যখন তাঁকে জানায় যে তাঁর স্বপ্ন সফল হয়েছে। সে আদতেই গর্ভবতী হয়েছে। সে অচিরেই একজন উত্তরাধিকারী লাভ করতে চলেছে সম্ভবত এই কথাটা জানা থাকার কারণেই হুমায়ুনের পক্ষে কামরান আর আসকারির সাম্প্রতিক এই বিশ্বাসঘাতকতা মেনে নিতে আরও বেশী কষ্ট হচ্ছে। তাকে আঘাত করার চেষ্টা করে তাঁরা তাঁর স্ত্রী আর ভাবী সন্তানকে- যারা এই পৃথিবীতে হুমায়ুনের কাছে সবচেয়ে প্রিয়- তাদেরও আঘাত করতে চেষ্টা করেছে।
আর সে যদি সত্যিই পুত্রসন্তান গর্ভে ধারণ করে থাকে, যা হামিদা নিজেও বিশ্বাস করে, তবে কাবুল হাতছাড়া হওয়াটা তার সন্তানের ভবিষ্যতকে আরো বেশী বিপদসঙ্কুল করে তুলবে। ছেলেটা যদি হুমায়ুনের শঙ্কা অনুযায়ী দ্রুত এগিয়ে আসা বিপদসঙ্কুল সময়টা কাটিয়ে উঠতে পারে তাহলেও একটা বিশাল সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী হবার বদলে সে হয়ত- যখন অন্য রাজবংশ হিন্দুস্তান শাসন করছে, তার কোনো কোনো পূর্বপুরুষের মতো যুদ্ধবাজ মামুলি গোত্রপতির জীবন লাভ করবে এবং মাটির দেয়াল দেয়া কয়েকটা গ্রাম আর ভেড়ার পালের মালিকানা নিয়ে নিজের আত্মীয়দের সাথে লড়াই করবে- নগণ্য এমন কিছু একটার উত্তরাধিকারী হবে।
