এক্ষুনি তাকে আমার সামনে নিয়ে এসো।
জ্বী, সুলতান।
শঙ্কার ছায়ারা গুঁড়ি মেরে হুমায়ুনের মনের প্রান্তরে বিচরণ শুরু করে। কয়েক মিনিট পরে, পরিপাটিভাবে বিন্যস্ত তাবুর সারির মাঝে সে আহমেদ খানকে ফিরে আসতে দেখে এবং তাঁর পেছনে, তারই দুজন গুপ্তদূত লম্বা এক যুবককে পাহারা দিয়ে নিয়ে আসছে। দলটা নিকটবর্তী হলে, হুমায়ুন খেয়াল করে দেখে যে সদ্য আগত লোকটার কাপড়চোপড়ে ভ্রমণের ছাপ স্পষ্ট ফুটে রয়েছে। লোকটা দেখতে কৃশকায় এবং তাঁর চোখের নীচের বেগুনী ছায়া তার ভ্রমণের শ্রান্তি প্রশমিত করেছে।
সুলতান। কুনীশের প্রথাগত অভিবাদনের রীতিতে সে মাটিতে অধোমুখে নিজেকে প্রণত করে।
উঠে দাঁড়াও। কে তুমি এবং আমাকে তুমি কি বলতে চাও?
নবাগত লোকটা ধীরে ধীরে নিজের পায়ে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। আমার নাম দারইয়া, কাবুলে আপনার সেনাছাউনির এক সেনাপতি নাসিরের পুত্র।
নাসিরকে হুমায়ুনের ভালোই মনে আছে- পোড় খাওয়া, ঝানু এক তাজিক গোত্রপতি, বহু বছর বিশ্বস্ততার সাথে যে তার অধীনে চাকরি করেছে। যৌনতার প্রতি তাঁর উদগ্র বাসনার কারণে লোকটা সেনাছাউনিতে বেশ পরিচিত ছিল আর সেই সাথে তার চার স্ত্রীর গর্ভে তারই ঔরসে জন্ম নেয়া সন্তানের সংখ্যার কারণে আঠারজন ছেলে আর ষোলজন মেয়ে এবং সেই সাথে তার অগণিত উপপত্নীর গর্ভে জন্ম নেয়া সন্তানতো রয়েইছে। হুমায়ুন বহুবছর নাসিরকে দেখেনি এবং তাঁর সন্তানদের ভিতরে সে কেবল তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা জনকেই দেখেছে।
তুমি নিজেকে যাঁর সন্তান বলে দাবী করেছে আমি হয়তো তাকে চিনি কিন্তু তার আগে আমাকে বলল তোমার বাবা মোট কতজন সন্তানসন্ততির জনক?
দারইয়ার ঠোঁটের কোণে বিষন্নামিশ্ৰিত মৃদু হাসির আভাস ফুটে উঠে। কেউ নিশ্চিত করে সেটা বলতে পারবে না কিন্তু তাঁর প্রথম চার স্ত্রীর গর্ভে আমরা মোট চৌত্রিশ ভাইবোন এবং তাঁদের একজন গতবছর ইন্তেকাল করলে- আমি কৃতজ্ঞ তিনি আমার জন্মদাত্রী নন- সে পঞ্চমবারের মতো বিয়ের করতে এই স্ত্রীর গর্ভে তার পঁয়ত্রিশতম সন্তানের জন্ম হয়। অবশ্য আমার পরিচয়ের স্মারক হিসাবে আমার পোষাকের নীচে একটা থলেতে আমার বাবার গলায় শোভা পাওয়া নেকড়ের দাঁতের একটা মালা রয়েছে। সে তাঁর ধূলিধূসরিত আলখাল্লার নীচে হাত দিয়ে থলেটা বের করতে যায়।
সেটার কোনো প্রয়োজন নেই। আমি বিশ্বাস করেছি তুমি নাসিরের ছেলে। কাবুলের কি খবরাখবর? এবার বল…।
খবর খুবই খারাপ, সুলতান, আমি যে খবর নিয়ে এসেছি তারচেয়ে বোধহয় খারাপ আর কিছুই হতে পারে না। আপনার নানাজান কাবুলের পৌঁছাবার কয়েকদিনের ভেতরেই তিনি হৃদরোগের আক্রমণের শিকার হন। তিনি প্রায় বাকরহিত হয়ে পড়েন এবং তার সারা শরীর প্রায় অসার হয়ে যায়। তিনি ধীরে ধীরে পুনরায় হাঁটাচলার মতো সুস্থ হয়ে উঠছিলেন কিন্তু…
কি হয়েছে? দারইয়াকে কথা শেষ করতে না দিয়েই হুমায়ুন জিজ্ঞেস করে কিন্তু সে ততক্ষণে উত্তরটা মনে মনে জেনে ফেলেছে।
সুলতান, প্রায় চারমাস আগে, ঘুমের ভিতরেই তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর পরিচারকেরা সকালবেলায় বিষয়টা টের পায়, তার চোখেমুখে প্রশান্তির একটা অভিব্যক্তি ফুটে রয়েছে।
হুমায়ুন কোনো কথা না বলে নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে, বাইসানগার আর নেই এই বিষয়টার সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে চেষ্টা করে।
সুলতান, আমার আরো কিছু বলার আছে…আপনার সৎ-ভাই কামরান আর আসকারি, খাইবার গিরিপথের পাদদেশে যারা আধিপত্য বিস্তার করে অবস্থান করছিল, যখন বাইসানগারের অসুস্থতার কথা জানতে পারে তারা তখন এই বিষয়টা থেকে লাভবান হবার চেষ্টা করে। তারা নিজেদের বাহিনী নিয়ে গিরিপথ অতিক্রম করে কাবুলে এসে উপস্থিত হয়। তারা যখন কাবুলে পৌঁছে ততদিনে আপনার নানাজান ইন্তেকাল করেছেন। কোনো ধরনের আগাম হুশিয়ারি না দিয়েই তারা কাবুলের প্রাসাদদূর্গ আক্রমণ করে এবং সহজেই আমার আব্বাজান আর অন্যানদের প্রতিরোধ প্রচেষ্টা গুঁড়িয়ে দেয়।
হুমায়ুনের নিমেষের জন্য বাইসানগারের মৃত্যুশোক বিস্মৃত হয়। কামরান আর আসকারি কাবুল দখল করেছে?
জ্বী, সুলতান।
অসম্ভব! আমার সৎ-ভাইয়েরা এতো দ্রুত এমন একটা আক্রমণ উপযোগী সেনাবাহিনী কিভাবে একত্রিত করবে?
সুলতান, গিরিপথে আগত বণিকদের কাফেলা লুট করে সংগৃহীত সোনা তাঁদের কাছে রয়েছে। আমরা শুনেছি পারস্যের ধনবান বণিকদের একটা কাফেলা তারা আটক করেছিল এবং তাঁদের কাছ থেকে জব্দ করা স্বর্ণমুদ্রা তারা উৎকোচ হিসাবে ব্যবহার করে পাহাড়ী গোত্রগুলোকে হাত করেছে। ফাশাইস, বারাকিশ, হাজারা আর অন্যান্য বর্বর গোত্রগুলো তাদের পক্ষে লড়াই করার জন্য তাই বিপুল সংখ্যায় সমবেত হয়েছিল। কিন্তু কাবুলে বস্তুতপক্ষে কোনো লড়াই হয়নি। আপনার সৎ-ভাইয়েরা আমাদের দূর্গপ্রাসাদের এক সেনাপতিকে স্বর্ণমুদ্রার প্রলোভন দেখিয়ে হাত করে যে তাঁদের দূর্গের প্রধান ফটক খুলে দেয়।
পুরো সেনাশিবিরে যদিও সূর্যের আলো ঝলমল করছে কিন্তু হুমায়ুনের মনে হয় সহসা পৃথিবীতে যেন অন্ধকার নেমে এসেছে এবং কেমন শীত শীত একটা অনুভূতিতে সে আক্রান্ত হয়।
আমার আব্বাজান… দারইয়ার কণ্ঠস্বর এই প্রথমবারের মতো একটু কেঁপে উঠে, আমাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে এবং শত্রুসেনা দূর্গের প্রধান তোরণদ্বার দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করেছে- দূর্গের প্রতিরক্ষায় দূর্গের অভ্যন্তরে অবস্থানরত সৈন্যদের সর্তক করতে তিনি যখন প্রধান তোরণদ্বার থেকে দৌড়ে ভেতরের দিকে আসছিলেন তখন একটা ফাশাইস রণকুঠার তার পিঠের ঠিক মধ্যভাগে আঘাত করে। তিনি কোনোমতে একটা দেওড়ির অভ্যন্তরে লুকিয়ে যান যেখানে আমি তাকে খুঁজে পাই। আমাকে অবশ্যই কাবুল থেকে পালাতে হবে…নিজের পরিচয়ের স্মারক হিসাবে তাঁর গলার মালাটা যেন অবশ্যই আমি সাথে রাখি আর আপনার সন্ধান করি এবং আপনাকে জানাই যে এখানে কি ঘটেছে…এবং তিনি আন্তরিকভাবে দুঃখিত যে তিনি আপনার বিশ্বাসের মর্যাদা রাখতে পারেননি… মারা যাবার আগে আমাকে বলা আব্বাজানের এই ছিল শেষ কথা। আপনার সন্ধানে আমি প্রথমে সরকারে যাই কিন্তু আপনি ততদিনে সেখান থেকে চলে গিয়েছেন। তারপর থেকে আমি ক্রমাগত আপনাকে খুঁজছি। আমি ভেবেছিলাম আমি বোধহয় অনেক দেরী করে ফেলেছি, আপনি হয়তো ইতিমধ্যে লোকমুখে কাবুল বিপর্যয়ের কথা জানতে পেরেছেন…
