পরের দিন সকাল বেলা, হুমায়ুন সেদিনের জন্য অগ্রযাত্রা বাতিল করে এবং তার ব্যক্তিগত জ্যোতিষী সারাফকে তার তাবুতে ডেকে পাঠায়। রাজকীয় বিয়ের জন্য সবচেয়ে শুভদিনের সন্ধানে তারা একসাথে গ্রহ-নক্ষত্রের মানচিত্র পর্যবেক্ষণ করে, রাহু-কেতুর অবস্থান পর্যালোচনা করে। শারাফ তার হাতের অ্যাস্ট্রোলেইব নামিয়ে রেখে অবশেষে বলে, অতি সত্ত্বর আয়োজন করতে হবে- আমাদের হাতে মাত্র তিন সপ্তাহ সময় আছে। হুমায়ুনও সেটা মেনে নেয়। বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ না হওয়া পর্যন্ত সে রাজস্থান অভিমুখে তাঁদের অগ্রযাত্রা স্থগিত রাখবে যাতে করে প্রস্তুতির জন্য সময় পাওয়া যায়। সে এখন যদিও ভূমিহীন আর সিংহাসনহীন, তথাপি হামিদার সাথে তার বিয়েটা কোনো মামুলি ঘটনা নয়। সৈন্যবাহিনীর সাথে আগত নগন্য কোনো অনুসারীদের বিয়ে আর বাসরের অনুষ্ঠান এটা নয় বরং সম্রাট আর সম্রাজ্ঞীর বিবাহ।
*
সোনালী রেশমের ঝলমল করতে থাকা কয়েক পরতের নীচে হামিদা নিশ্চল ভঙ্গিতে বসে আছে, মুক্তার সাথে ফারগানার প্রতীক হিসাবে হলুদ বৈদুর্যমণি আর সমরকন্দের স্মারকসম সবুজ পান্না একত্রে পাকিয়ে তৈরী করা শিরোমালা, যা গুলবদন বিশেষভাবে তার জন্য তৈরী করেছে, অবগুণ্ঠন আটকে রেখেছে। মাওলানারা সুর করে তাঁদের মোনাজাত শেষ করার পরে, হামিদার মেহেদী রাঙা হাত হুমায়ুন স্পর্শ করে এবং অনুকূল একটা স্পন্দন অপরপক্ষের মাঝে অনুভব করে। তার উজির কাশিম পাদিশাহ জিন্দাবাদ শ্লোগান শুরু করতে হুমায়ুন আর হামিদা উঠে দাঁড়ায় এবং বিয়ের মঞ্চ থেকে নিজের তাবুর দিকে তাঁকে নিয়ে এগিয়ে যায় যেখানে বিয়ের ভোজসভার আয়োজন করা হয়েছে।
ভোজসভায় আমন্ত্রিত মেহমানের সংখ্যা অবশ্য সামান্য কয়েকজনই কাশিম,জাহিদ বেগ, আহমেদ খান আর অন্য কয়েকজন আধিকারিক এবং সেই সাথে খানজাদা, গুলবদন আর তাদের স্ত্রীরা। আগ্রায় যদি এখনও সে সম্রাট হিসাবে অধিষ্ঠিত থাকতো, সেখানে তাহলে হাজার লোকের জমায়েত হত। ট্রে ভর্তি বিয়ের উপঢৌকন বিরল মশলা, রেশম আর রত্নপাথর- তার সামনে ছড়িয়ে পড়ে থাকতো। দূর্গের প্রাঙ্গণে এসে জমা হত জীবন্ত সব উপঢৌকন- মূল্যবান পাথরে সজ্জিত হাতি যার দাঁতগুলো সোনা দিয়ে গিল্টি করা এবং প্রাণবন্ত আর তরতাজা ঘোড়ার পাল। আজ্ঞাবাহী, আর বশংবদ রাজারা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকতো অভিবাদন জানাতে এবং রাত ঘনিয়ে আসবার সাথে সাথে দূর্গের সুবাসিত আঙ্গিনা সঙ্গীতের কোমল মূৰ্ছনায় মাতোয়ারা হয়ে উঠতো এবং আতশবাজির আলোকচ্ছটায় রাতের আকাশ দিনের দ্যোতনা লাভ করতো।
কিন্তু তার পাশে মখমলের লাল একটা তাকিয়ার উপরে বসে থাকা হামিদার দিকে আড়চোখে তাকাতে এবং সে যেন তার নিখুঁত অবয়ব দেখতে পায় তারজন্য একটা ছাড়া তাঁর বাকি সব নেকাব পেছনে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। তাঁর গালের কোমল বাঁক, তার আলখাল্লার মসৃণ কাপড়ের নীচে স্তনযুগলের ভীরু উঠা নামা হুমায়ুন অনুভব করে সত্যিকারের সুখের খুব কাছাকাছি সে অবস্থান করছে। সে অনেক রমণীর সাথেই সঙ্গম করেছে, নিজের দক্ষতা আর বীর্যের পরাভব প্রেমিকের মতো উপভোগ করেছে, কিন্তু এই মুহূর্তে সে নিজের ভেতরে যে আবেগের ক্ষরণ টের পাচ্ছে সেটা তার কাছে একেবারেই নতুন। এমনকি সে সালিমার জন্যও এমন ভালোবাসা তার মাঝে সৃষ্টি হয়নি।
ভোজসভা শেষ হবার পরে, খাবারের পাত্রগুলো সরিয়ে নেয়া হয় এবং তাঁদের ব্যক্তিগত পরিচারকের দল ছাড়া আর সবাই এবার বিদায় নিতে, জীবনে প্রথমবারের মতো কোনো রমণীর সংস্পর্শে আসা বালকের মতো হুমায়ুন লাজুক হয়ে উঠে। তার নিজের পরিচারকেরা তাঁকে যখন নিরাভরণ করে রেশমের একটা আলখাল্লায় তাকে জড়িয়ে দেয়, হামিদার সহচরীরা তাঁকে লাল চামড়া দিয়ে মোড়ান কাঠের অন্তঃপটের সাহায্যে তৈরী কনের শয়নকক্ষে নিয়ে যায়, চামড়ার ফিতার সাহায্যে পরস্পরের সাথে যুক্ত অন্তঃপটগুলো তাবুর একেবারে শেষপ্রান্ত পর্যন্ত বিন্যস্ত। হুমায়ুন একটু থামে তারপরে দুটো অন্তঃপটের মধ্যের ফাঁকাস্থানের উপর টানটান অবস্থায় ঝুলন্ত ব্রোকেডের নীচ দিয়ে মাথা নীচু করে প্রবেশ করে।
হামিদা তখনও প্রস্তুত হয়নি। সে টের পায় হামিদার হাস্যমুখরিত পরিচারিকার দল তাঁকে নিরাবরণ করে, তার মাথার লম্বা কালো ঝলমলে চুল পরিপাটি আঁচড়ে দিয়ে গোলাপজলে সিক্ত বিছানায় তাকে নিয়ে এসে পাতলা একটা চাদরের নীচে তাঁকে যত্ন করে শুইয়ে দেয়ার সময়, সারাক্ষণ সে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়ার ছলে আড়চোখে তার দিকেই তাকিয়ে ছিল। পরিচারিকার দল বিদায় নেবার সময় সে তাদের মৃদু হাসির আওয়াজ ভেসে আসছে শুনতে পায়। সে কেমন যেন একটু বিভ্রান্ত আর অস্বস্তি বোধ করে। হামিদাকে নিজের করে পাবার জন্য সে এতোটাই স্থিরপ্রতিজ্ঞ ছিল, এতোটাই নিশ্চিত ছিল যে এই মেয়েটার সাথেই তার ভবিষ্যত জড়িত কিন্তু আদতে সেই মেয়েটা তার কাছে একজন অপরিচিত আগন্তুক। তারা আজকের পূর্বে কখনও একসাথে নিভৃতে কখনও সময় অতিবাহিত করেনি। তাদের ভিতরে সামান্য যতটুকু কথা হয়েছে তার পুরোটাই হয়েছে অন্যদের উপস্থিতিতে। অনাহুত অতিথির ন্যয়, ভাবনাটা পুনরায় তার মাঝে ফিরে আসে যে হামিদার সামনে অন্য আর কোনো পথ না থাকায় সে তাঁকে স্বামী হিসাবে গ্রহণ করতে সম্মত হয়েছে। হামিদার কাছে যাবার সময় এই ভাবনাটার কারণে সে একটু অস্বস্তিবোধ করতে থাকে।
