হামিদা। আমার সাথে এখানে দেখা করার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ। তুমি কি জানো আমি কেন এসেছি। আমি তোমাকে আমার স্ত্রী করতে চাই…
হামিদা কোনো কথা বলে না কিন্তু পলকহীন চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকে, তার কালো, দীর্ঘ অক্ষি-পযুক্ত চোখ কান্নার স্মৃতিতে লাল হয়ে আছে এবং সেই দৃষ্টির সামনে হুমায়ুনই প্রথম নিজের দৃষ্টি আনত করে।
তুমি আমাকে কি উত্তর দেবে?
আব্বাজান আমাকে আদেশ পালন করতে বলেছেন…
আমি ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাউকে স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করতে চাই না… তুমি একেবারে তোমার মন থেকে আমাকে বল তোমার কি ইচ্ছা?
আমি জানি না। আমি আপনাকে উত্তর দিতে পারবো না। আমার আব্বাজানের কাছ থেকে মাত্র গতকালই আমি আলাদা হয়েছি। তাকে আমি আর হয়ত কখনও দেখতে পাব না…
আমার ভাইয়ের সাথে গমন করার সিদ্ধান্ত একেবারেই তোমার আব্বাজানের নিজস্ব। শেখ আলি আকবর একজন ভালোমানুষ, সৎ আর বিশ্বস্ত এবং তার সাথে আমার কোনো বিরোধ নেই। আমি আমার সামর্থ্যের ভিতরে আছে, এমন সবকিছু করতো- এটা নিশ্চিত করতে যে একদিন- আল্লাহর যদি মর্জি হয়- তার সাথে তুমি পুনরায় মিলিত হবে। এবং আমি তোমাকে আরও প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি যে আমি তোমার খুব ভালো স্বামী হব। আমি তোমাকে ভালোবাসবো আবার সম্মানও করবো। এবং বর্তমানে যদিও আমার ভাগ্য বিরূপ কিন্তু আমার প্রত্যাশা অনেক উঁচু এবং একদিন আমি তোমাকে মহান একজন সম্রাজ্ঞীর মর্যাদায় অভিষিক্ত করব… নিজের জীবন দিয়ে হলেও আমি শপথ করে বলছি।
হামিদা সোজা টানটান হয়ে দাঁড়ায় কিন্তু কথা বলে না। হুমায়ুন ভাবে, মেয়েটার এখনও নিতান্তই অল্পবয়স। নিজের আব্বাজানের এবং পরিচিত পারিপার্শ্বিকের কাছ থেকে সহসা বিচ্যুত হবার শোকে সে এখনও কাতর। গত কয়েকদিনে অনেক কিছু ঘটেছে, হুমায়ুন কোমল কণ্ঠে বলে, এবং তুমিও ক্লান্ত। আমি তোমাকে এখন আর বিব্রত করবো না কিন্তু আমি যা বলেছি সেসব নিয়ে একটু ভেবে দেখবে।
আমি বিষয়টা ভেবে দেখবো। হামিদা এখনও ব্যগ্রভাবে তাঁকে আবেক্ষণ করছে, যেন চেষ্টা করছে ভবিষ্যতের গর্ভে কি অপেক্ষা করছে সেটা জানতে। হুমায়ুন বুঝতে পারে সে পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছে এবং জীবনে এই তাঁর আত্মবিশ্বাস মাতাল হয়ে উঠে। সে অনুধাবন করে যে তার স্ত্রী হিসাবে সে যদি কাউকে নির্বাচিত করে তাহলে যেকোনো মেয়েরই মাথা ঘুরে যাবে বিশ্বাস করে, নিজের সাফল্যের ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েই সে আজ রাতে হামিদার সাথে দেখা করতে এসেছিল।
*
হুমায়ুন নিজের অস্থিরতাকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং এই ক্ষেত্রে সে যা আশা করেছিল তার চেয়েও বেশীদিন তাঁকে অপেক্ষা করতে হয়। হামিদাকে একপলক দেখার জন্য প্রতিরাতে খানজাদার তাবুতে যাওয়া থেকে নিজেকে বিরত রাখতে সে হিমশিম খেয়ে যায় কিন্তু সে জোর করে নিজেকে নিরস্ত করে। তার প্রস্তাব বিবেচনা করার জন্য সে হামিদাকে সময় দেবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং সে অবশ্যই নিজের দেয়া প্রতিশ্রুতির বরখেলাপ করবে না। অবশেষে, প্রায় মাসাধিক কাল অতিবাহিত হবার পরে এক জেলো সন্ধ্যাবেলা সেনাছাউনির অস্থায়ী শিবিরের চারপাশের অন্ধকারে সেদিন জোনাকির ঝাঁক হীরককুচির মতো জ্বলজ্বল করছিল, খানজাদা শেষ পর্যন্ত তার জন্য সংবাদ নিয়ে হাজির হয়।
হুমায়ুন, হামিদা সম্মতি জানিয়েছে। তুমি যখন চাইবে সে তোমার স্ত্রী হতে রাজি আছে।
প্রবল আনন্দের একটা জোয়ার এসে তাঁকে ভাসিয়ে নেয় এবং সে তাঁর ফুপিজানকে জড়িয়ে ধরে। তাকে রাজি করাতে শেষ পর্যন্ত তাঁকে আপনি কি বলেছিলেন?
তাকে আমার শরণে নেয়ার পর থেকেই আমি তাকে যা বলে আসছি সেই একই কথা- তাকে যদি কাউকে বিয়ে করতেই হয় তবে রাজার চেয়ে ভালো পাত্র আর কে হতে পারে- বস্তুতপক্ষে একজন সম্রাট? তাকে আমি স্মরণ করিয়ে দেই যে সম্ভ্রান্ত পরিবারের অনেক মেয়েই বাধ্য হয় বুড়ো অথর্বকে বিয়ে করতে কিন্তু সেই তুলনায় তুমি নিজের যৌবনে পা দেয়া সুদর্শন এক যোদ্ধা মেয়েদের ভিতরে যার বিশেষ একটা সুনাম আছে… খানজাদা চোখ মটকে বলে।
আপনি নিশ্চিত এই বিয়েতে সে আগ্রহী?
হ্যাঁ। আমার প্রতিশ্রুতি তাঁকে সবচেয়ে বেশী প্রভাবিত করেছে যে তুমি তাকে সত্যিই ভালোবাস।
আমি তাকে সত্যিই ভালোবাসি।
আমি জানি। তাঁর সম্পর্কে তুমি যতবারই কিছু বল তোমার চোখেমুখে প্রতিবারই আমি সেই ভালোবাসা ঝলসে উঠতে দেখি, নয়তো এই ক্ষেত্রে আমি তোমাকে কখনও সাহায্য করতাম না।
হিন্দালের ব্যাপারটা? তার কথা কি সে কখনও জানতে চেয়েছে?
না। হিন্দাল সত্যিই হয়তো হামিদাকে ভালোবাসতো কিন্তু মেয়েটা এ বিষয়ে কিছুই জানতো না। তুমি যদি হামিদার অন্তরে প্রবেশের পথ খুঁজে পাও, সেখানে তুমি কোনো প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হবে না…
ফুপিজান, আপনাকে ধন্যবাদ। বরাবরের মতোই, এবারও আপনি আমার ত্রাণকর্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন।
আর বরাবরের মতোই, হুমায়ুন তোমার সুখই আমার কাম্য।
একটু অপেক্ষা করেন। আমি চাই হামিদার জন্য আমার তরফ থেকে একটা উপহার আপনি নিয়ে যান। লোহা দিয়ে বাধান তাঁর সিন্দুকের দিকে সে এগিয়ে গিয়ে ভেতর থেকে ফুল ভোলা রেশমের একটা কাপড় বের করে এবং সেটার ভাঁজ খুলতে দেখা যায় ভেতরে রয়েছে সোনার উপরে আগুনের শিখারমতো দেখতে রুবি আর গাঢ় সবুজ রঙের আকাটা পান্নার একটা দু-লহরী হার যা গুজরাতে দখল করা ধনসম্পদের ভিতরে সে পেয়েছিল। মোমবাতির আলোতে পাথরগুলো দারুণভাবে জ্বলজ্বল করতে থাকে এবং কালো চোখের অধিকারিণী হামিদার সৌন্দর্যের সাথে দারুণ মানাবে। আপনি আমাকে একবার বলেছিলেন, আমার স্ত্রীকে দেয়ার জন্য আমি যেন হারটা নিজের কাছে সামলে রাখি… সেই মুহূর্ত এখন এসেছে…
