হিন্দালের প্রতি নিজের আচরণ সম্বন্ধে যত অপরাধবোধ আর দ্বিধাকে ছাপিয়ে তীব্র আনন্দের একটা রেশ হুমায়ুনকে জারিত করে। শেখ আলি আকবর, নিজের জীবন দিয়ে হলেও আমি তাকে আগলে রাখবো। আমি তাকে দারুণ সুখী করবো। আপনার ভীত হবার কোনো কারণ নেই, সে নিজেকে ফিসফিস করে বলে।
পরের দিন, সূর্যের দাবদাহে শুষ্ক হয়ে উঠা একটা ধুসর প্রান্তরের উপর দিয়ে নিজের হীনবল হয়ে পড়া সৈন্যবাহিনীর সামনে ঘোড়ায় চড়ে যাবার সময়েও, হুমায়ুন নিজের ভিতরে তীব্র আনন্দের একটা শিহরন টের পায়। হিন্দালের সাথে তাঁর সম্পর্কে ফাটলের জন্য যদি কেবল এই মূল্যটা তাকে দিতে না হত। কয়েক ঘন্টা আগে, তার সামনে প্রসারিত রাস্তায় ধূলো উড়তে দেখে তাঁর হৃৎপিণ্ডের গতি দ্রুততর হয়ে উঠে। নিজের মতো পরিবর্তন করে হিন্দাল ফিরে আসছে এই আশার দ্বারা তাড়িত হয়ে, সে তার গুপ্তদূতদের একটা দলকে বিষয়টা অনুসন্ধান করতে পাঠায় কিন্তু তারা গিয়ে কেবল খচ্চরের একটা বহরের সাথে একদল রেশম ব্যবসায়ীকে দেখতে পায়। হিন্দাল এতক্ষণে সম্ভবত হুমায়ুনের সৈন্যসারির উত্তরশ্চিমে বেশ কয়েক মাইল এগিয়ে গিয়েছে। কাশিমের ভাষ্য অনুযায়ী, হিন্দালের এক সেনাপতির সাথে তার সংক্ষিপ্ত আলাপচারিতার ভিত্তিতে, তাঁর সৎ-ভাই সিন্ধু নদী অতিক্রম করে উত্তরের দিকে এগিয়ে যাবার পরিকল্পনা করেছে।
হিন্দাল কি কামরান আর আসকারিকে খুঁজে বের করতে চায়? তাঁর বিরুদ্ধে তাঁর সৎ-ভাইদের তিনই যদি আবারও মৈত্রীর বন্ধনে একত্রিত হয় তাহলে তার নিজের অবস্থান আরও বিপজ্জনক হয়ে পড়বে। হিন্দাল খুব ভালো করেই জানে হুমায়ুন তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে কোথায় যাচ্ছে এবং কি তার ভবিষ্যত পরিকল্পনা। কামরান আর আসকারির কাছে এহেন তথ্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রতিয়মান হতে পারে এমনকি শেরশাহের কাছেও। হুমায়ুন নিজের ভাগ্যের এই সাম্প্রতিক বিড়ম্বনা নিয়ে আপনমনে ভাবতে ভাবতে চারপাশের রৌদ্র ঝলসিত প্রেক্ষাপট সম্বন্ধে একেবারে বেখেয়াল হয়ে এগিয়ে যায়। হিন্দাল ফিরে না আসায় সে একজন পরীক্ষিত মিত্র হারিয়েছে এবং একজন তৎপর শক্ত লাভ করেছে এই কারণেই যে সে আশাহত হয়েছে তা না, বিগত কয়েক মাসে তার এই ছোট ভাইটির সাথে, হোক সৎ-ভাই, তাঁর বেশ একটা আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল এবং কখন জানি সঙ্গী হিসাবে সে তাকে গুরুত্ব দিতে শুরু করেছিল।
সেই দিনই রাতের মতো অস্থায়ী ছাউনি আর রান্নার জন্য আগুন জ্বালান হতে, মেয়েদের তাবু যেখানে স্থাপন করা হয়েছে সে তৃষিতের মতো সেদিকে তাকিয়ে থাকে। হামিদা এখন কি করছে এবং তার মনে কি ভাবনা খেলা করছে? তাঁকে একবার দেখার আকাঙ্খর সাথে সে তাঁকে যে মর্মপীড়ার মধ্যে ফেলেছে সেজন্য তার ভেতরে জমে উঠা অপরাধবোধের সাথে কেমন যেন মিশে যেতে থাকে এবং সে ইতস্তত করে, একজন তরুণ প্রেমিক হিসাবে নিজের কর্তব্যকর্ম সম্বন্ধে একেবারেই অনিশ্চিত। তারপরে তাঁর বোধোদয় হয়। জওহরকে ডেকে এনে, খানজাদাকে তাঁর সাথে দেখা করার জন্য তাঁকে আদেশ দেয়। হুমায়ুন প্রতিটা ক্ষণ অতিক্রান্ত হবার সাথে সাথে শঙ্কাকুল মনে অপেক্ষা করতে থাকে। তার ফুপিজান যদি তার সাথে দেখা করতে অস্বীকৃতি প্রকাশ করে তাহলে সে মোটেই অবাক হবে না, কিন্তু জওহর অবশেষে খানজাদাকে সাথে নিয়েই ফিরে আসে।
বেশ আমার প্রিয় ভাস্তে, তুমি কেন আমার সাথে দেখা করতে চেয়েছে আমি জানি।
ফুপিজান, আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ… যথাযথ শব্দ খুঁজতে খুঁজতে, হুমায়ুন ইতস্তত ভঙ্গিতে বলে। গতরাতে রাগারাগি করে আমরা বিদায় নিয়েছিলাম। আপনি যা বলেছিলেন তাঁর অধিকাংশই ন্যায্য। কিন্তু যা ঘটে গিয়েছে আমার পক্ষে সেটা পূর্বাবস্তায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব না। সত্যি কথা বলতে কি আমার পক্ষে যদি সেটা সম্ভবও হত আমি সেটা করতাম না। তবে আপনার কথাগুলো নিয়ে আমি আজ সারাদিন চিন্তা করেছি। আমি আপনাকে আমার সব বিপদে পাশে পেয়েছি, বরাভয় লাভ করেছি। এই বিপদের মুহূর্তে আমি আশা করবো আপনি আমাকে ছেড়ে যাবেন না।
খানজাদার চোখমুখের অভিব্যক্তি এখনও কঠোর এবং তিনি একটা কথাও বলেন না কিন্তু তাঁর খয়েরী চোখের দৃষ্টি কোমল হয়ে উঠে তাঁকে নিজের বক্তব্য প্রকাশ করতে সাহস জোগায়।
হামিদা আপনি অনুগ্রহ করে বলবেন যে আমি আমার কাণ্ডজ্ঞানহীন কাজের জন্য দুঃখিত এবং তাকে কষ্ট দেয়াটা কখনওই আমার উদ্দেশ্য ছিল না। সে কয়েক পা সামনে এগিয়ে আসে। আমার মানসিক অবস্থার কথা তাকে বলেন। তাঁকে বলেন প্রেমের বশবর্তী হয়েই আমি সবকিছু করেছি। আমার বিষয়টা তাকে একটু বোঝন… সে আপনার কথা নিশ্চয়ই শুনবে। আর তাকে আরও বলবেন যে রাতের আহারের পরে আমি আপনাদের সবার সাথে দেখা করতে যাব- অবশ্য যদি সে সম্মতি জানায় তবেই।
দুঘন্টা পরে, খানজাদার কয়েকজন পরিচারিকাকে অনুসরণ করে হুমায়ুনকে অস্থায়ী ছাউনির মাঝ দিয়ে এগিয়ে যেতে দেখা যায়, জলন্ত মশালের আলোয় তারা তাঁকে মেয়েদের তাবুর দিকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছে। খানজাদার তাবুর অভ্যন্তরে নীচু হয়ে প্রবেশ করতে, প্রদীপের কমলা রঙের কোমল আলোয় এবং দিয়ার জ্বলন্ত শলতের দ্বারা উদ্ভাসিত তাবুর কেন্দ্রস্থলে নীচু আসনে সে গুলবদন আর খানজাদাকে উপবিষ্ট অবস্থায় দেখতে পায়। তাঁকে স্বাগত জানাতে তারা উঠে দাঁড়ায় এবং সে যখন তাদের দিকে এগিয়ে যায় অবগুণ্ঠিত একটা অবয়ব- সে জানে হামিদা ছাড়া সেটা আর কেউ না আলো আঁধারির ভেতর থেকে বের হয়ে এসে খানজাদার পাশে দাঁড়ায়। কেউ কিছু বলার আগেই অনাদিষ্ট ভঙ্গিতে, হামিদা তাঁর মুখের নিম্নাংশ আবৃতকারী নেকাব সরিয়ে দেয় এবং তাঁর সামনে এসে দাঁড়ায়। হুমায়ুন আগে বুঝতে পারেনি যে হামিদা এত দীর্ঘকায়- গুলবদন কিংবা খানজাদার চেয়ে কমপক্ষে তিন কি চার ইঞ্চি সে লম্বা। নীল আলখাল্লা আর একই রঙের কাচুলির সাথে কোমরে সবুজাভ-হলুদ রঙের ফিরোজা পাথরখচিত পরিকর পরিহিত অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতে বোঝা সে সেই সাথে হাল্কা পাতলা গড়নের।
