ফুপুজান, আমি এটা পারবো না। ব্যাপারটা এমন একটা পর্যায়ে গিয়েছে যে আমার আর কিছুই করার নেই…
যত্তসব ফালতু কথা! অব্যাহত গতিতে কাছে এগিয়ে এসে, তিনি তার চোখের দিকে তাকান। তুমি কি আবার আফিম সেবন শুরু করেছো? দৃষ্টিবিভ্রম ঘটছে? সেজন্যই কি তুমি এমন পাগলের মতো আচরণ করছো? আমি হিন্দালের রক্তাক্ত মুখ আর গলার কালসিটে দাগ দেখেছি… সেটা কি কোনো সম্রাটের মতো আচরণ হয়েছে, ঠ্যাঙারে মার দিয়ে তাঁকে ধরাশায়ী করে তারপরে তাঁকে নিজের শিবির থেকে বিতাড়িত করা?
সে আমাকে আক্রমণ করেছিল…
সেটা কোনো কাজের কথা না। হিন্দুস্তানে তোমার সাম্রাজ্যের ভবিষ্যত যখন সবচেয়ে বেশী অনিশ্চিত, যখন তোমার মিত্রের সংখ্যা হাতে গোনা যায় তখন সে তোমার প্রতি বিশ্বস্ত থেকেছে। তোমার এই সর্বশেষ পাগলামি আমাদের ভীষণ বিপদের মধ্যে ফেলেছে- লাহোর থেকে তোমার সাথে যারা এসেছিল তাঁদের ভিতরে কতজন এখনও তোমার সাথে রয়েছে? মাত্র আট কি নয় হাজার হবে। সংখ্যাটা আমি জানি কারণ কাশিম আমাকে বলেছে। এখন যদি হিন্দালও চলে যায় তাহলে তোমার সাথে আর কতজন লোক থাকবে? খুব বেশী হলে পাঁচ কি ছয় হাজার। আর তারা যদি একবার তোমার সিদ্ধান্তের প্রতি সন্দিহান হয়ে উঠে তাহলে তাদের ভেতরে কতজন লোক শেষ পর্যন্ত তোমার সাথে থাকবে? শীঘ্রই ডাকাতি আর রাহাজানির হাত থেকে আমাদের রক্ষা করার মতো পর্যাপ্ত লোকই তোমার সাথে থাকবে না, সিংহাসন পুনরুদ্ধারের কথা না হয় বাদই দিলাম। আর এসব ঘটবে স্বার্থপর, অসংযত, বল্গাহীন কামনার বশবর্তী…।
না। হামিদার প্রতি যখনই আমার দৃষ্টি আকর্ষিত হয়েছে, কেবল শারীরিক কামনা ছাড়াও আমার একেবারে ভিন্ন একটা অনুভূতি হয়েছে, এমন একটা অনুভূতি যার অভিজ্ঞতা আগে কখনও আমার হয়নি…আমি বুঝতে পেরেছি যে ভালোবাসা আমাকে আপুত করে ফেলেছে এবং তাকে আমি আমার স্ত্রী হিসাবে চাই। আমি কখনও কল্পনাও করিনি যে এমন কিছু একটা আমার জীবনে ঘটতে পারে কিন্তু তারপরেও সেটাই ঘটেছে। আমি শপথ করছি সুরা আর আফিম আমার মাথা ঘুলিয়ে দিয়ে আমাকে বিভ্রান্ত করেনি। আমার মন পরিষ্কার আর আমি জানি আমি যা করছি ঠিক করছি। ফুপুজান … সে তার কাঁধে আলতো করে একটা হাত রাখে, আমার প্রতি একটু ভরসা রাখেন এবং এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরনে আমাকে সাহায্য করেন…আমি আপনার কাছে মিনতি করছি…।
আমি পারবোনা। হুমায়ুন, আমার বয়স হয়েছে। এই জীবনে অনেক কিছু আমি দেখেছি, অনেক কষ্ট সহ্য করেছি, নতুন করে কোনো ঝামেলা কাঁধে নেবার মতো শক্তি আমার আর নেই। বাবর মারা যাবার সময় থেকে তাকে দেয়া আমার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আমি চেষ্টা করেছি তোমাকে সাহায্য করতে। নির্ভীক যোদ্ধা হিসাবে তুমি নিজেকে প্রমাণ করেছে কিন্তু সত্যিকারের একজন সম্রাট হতে হলে তোমাকে এখনও অনেক কিছু শিখতে হবে আর আমার মনে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে তুমি সেটা আদৌ শিখতে পারবে। তোমার আব্বাজানের থেকে তুমি একেবারেই আলাদা। বাবর সবসময়ে মাথা খাঁটিয়ে চলতো। তাঁর বিয়েগুলো- এমনকি তোমার আম্মিজান যাকে সে ভালোবাসতো তার সাথে বিয়েটাও ছিল বিবেচনাপ্রসুত পদক্ষেপ। সে কখনও একজন স্বার্থপর ছেলের মতো আচরণ করতে না যে পরিণতি বিচার না করেই সবসময়ে নিজের কামনা আর লালসাকে প্রাধান্য দেয়। প্রথমে আফিম। আর এখন এটা।
কিন্তু ফুপিজান, আমি আপনাকে বারবার একটা কথা বোঝাতে চাইছি যে হামিদার প্রতি আমার অনুভূতি মামুলি কামনার চেয়ে অনেক বেশী গভীর…
আর বাবাকে ছাড়া অসহায় অবস্থায় এখানে আটকে থাকার পরে হামিদার অনুভূতির বিষয়ে কি বলবে। তুমি অবশ্যই জানো যে শেখ আলি আকবর হিন্দালের সাথেই থাকবেন? তিনি একটু আগেই নিজের মেয়েকে বিদায় জানিয়ে গিয়েছেন।
আমি এটা জানতাম না।
গুলবদন চেষ্টা করছে হাদিমাকে শান্ত করতে কিন্তু বেচারী একদম হতবিহ্বল হয়ে আছে। সত্যি কথা বলতে কি, গুলবদন নিজেও মর্মপীড়ায় ভুগছে যদিও সে নিজের আপন ভাইকে সঙ্গ দেবার চেয়ে আমার সাথে থাকাকেই বেছে নিয়েছে।
আমার কখনও এসব অভিপ্রায় ছিল না…আমি…
হুমায়ুন অনেক হয়েছে।
খানজাদা ঘুরে দাঁড়ায় এবং আর একটা কথাও না বলে সোজা তাবু থেকে বের হয়ে যায়। হুমায়ুন অপেক্ষা করে, আশা করে তিনি বোধহয় নরম হবেন এবং ফিরে আসবেন কিন্তু তিনি ফিরে আসেন না। সে স্থবির হয়ে নিজের তাবুতে বসে থাকে এবং তেলের প্রদীপের হলুদাভ জ্বলন্ত শিখার দিকে সময়ের হিসাব ভুলে গিয়ে আনমনে তাকিয়ে থাকে। বরাবরের মতো তার ফুপিজান কি এবারও ঠিক কথাই বলছেন? একটা বিষয়ে সে নিশ্চিত, ঝোঁকের বশে কাজটা করা হয়েছে- বোধহয় হঠকারীও হয়েছে এবং সবচেয়ে বড় কথা সে হামিদার অনুভূতিতে আঘাত দিয়েছে। হিন্দাল আর তার ভিতরে যে ভঙ্গুর কিন্তু সম্ভাবনাময় বন্ধন গড়ে উঠছিল সে সেটাকেও ছিন্ন করেছে।
সুলতান। জওহর ভিতরে প্রবেশ করে এবং হুমায়ুনের দিকে সে তার হাতে ধরা কাগজের টুকরোটা এগিয়ে দেয়। শেখ আলি আকবর আপনাকে এটা দেবার জন্য আমাকে অনুরোধ করেছে।
আপনি আমাদের সম্রাট, হুমায়ুন পড়তে শুরু করে, আমার কন্যাকে আপনি যদি চান আমি আপনাকে না বলতে পারবো না। ভারাক্রান্ত হৃদয়ে আমি তাঁকে এখানে রেখে যাচ্ছি কিন্তু আপনার ভাইয়ের সাথে আমাকে অবশ্যই যেতে হবে বহুবছর আগে যাঁর কাছে আমি বিশ্বস্ত থাকার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছিলাম। আশা করি আপনি হামিদার সাথে ভালো ব্যবহার করবেন। তাঁকে রক্ষা করার কোনো ক্ষমতা আমার নেই এবং আপনি আপনার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবেন এটা বিশ্বাস করা ছাড়া আমার আর কোনো পথ নেই। শেখ আলি আকবর।
