নিজের দেহের নীচে হিন্দালের দেহ নিস্তেজ হয়ে পড়ছে টের পেয়ে, সে চোখ নামিয়ে তার মুখের দিকে তাকায়। পুরো ব্যাপারটা ভাওতা হতে পারে, মল্লযুদ্ধে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে সে নিজেও বহুবার এই কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু হিন্দালের চোখ বন্ধ এবং রক্ত জমে তার মুখ বেগুনী বর্ণ ধারণ করেছে। হুমায়ুন নিজের মুঠি শীথিল করে এবং ভাইয়ের উপুড় হয়ে থাকা দেহের কাছ থেকে সাবধানে উঠে দাঁড়ায়, পুরোটা সময় এক মুহূর্তের জন্যও তার উপর থেকে চোখ সরায় না।
বাতাসের জন্য হাঁসফাঁস করতে থাকা হিন্দাল হাপড়ের মতো মুখ করে জোরে জোরে শ্বাস নিতে চেষ্টা করে এবং হাত দিয়ে নিজের গলা আকড়ে ধরে, হুমায়ুন সেদিকে তাকিয়ে দেখে ইতিমধ্যে সেখানে কালসিটে পড়তে আরম্ভ করেছে। কিছুক্ষণ পরে, সদ্য লড়াইয়ে পরাভূত হওয়া বিশাল একটা ভালোকের মতো টলোমলো পায়ে সে উঠে দাঁড়ায়। তার কপালের ক্ষতস্থান থেকে এবার প্রবলভাবে রক্তপাত শুরু হতে তাঁর পরনের জোব্বার সামনের অংশ নিমেষে রক্তে লাল হয়ে উঠে। কিন্তু সে ঘুরে হুমায়ুনের দিকে পরিষ্কার, উজ্জ্বল আর অবজ্ঞাপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকায়।
বেশ তাহলে আপনিই তাকে গ্রহণ করেন। আপনি আমাদের সম্রাট আর এই একটা বিষয় আমাকে স্মরণ করিয়ে দিতে আপনি কখনও ক্লান্তিবোধ করেন না। কিন্তু ভবিষ্যতে আবারও আপনার সাথে আমার দেখা হতে পারে এমন আশা পোষণ করবেন না। আজ এখানে আমাদের মৈত্রীর সমাপ্তি ঘটল। আজ রাতেই আমি আমার লোকজন নিয়ে এখান থেকে বিদায় নেব।
আমি তোমাকে আঘাত করতে চাইনি। তুমি আমাকে বাধ্য করেছে। মাথা গরম করে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে যেও না…হামিদাকে তোমার কাছ থেকে কেড়ে নেবার কোনো পরিকল্পনা আমার মাথায় ছিল না… কিন্তু তাঁকে যখন আমি দেখি আমি সেই মুহূর্তে বুঝতে পারি এটাই নিয়তির লিখন…।
হিন্দালের রক্তাক্ত মুখে বিদ্রুপাত্মক একটা হাসি ফুটে উঠে। নিয়তির লিখন…? মানুষের অভিব্যক্তি আপনি এখনও বুঝতে পারেন না, তাই না, এমনকি আপনার নিজের ভাইদেরও না। আপনি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা জগতের বাসিন্দা যেখানে আপনি নিজের আকাঙ্খাকে ভুল করে নিয়তি ভেবে বসেছেন এবং কামনা করছি এটা আপনার জন্য সৌভাগ্যই বয়ে আনবে। ভাইজান, বিদায়। হিন্দাল এবার দেহের শেষ শক্তিটুকু ব্যয় করে সোজাভাবে দণ্ডায়মান হয় এবং ধীরে কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে মেঝের গালিচার উপরে থুতু ফেলে, আর রক্তাক্ত শ্লেষ্মার একটা দলা গিয়ে হুমায়ুনের ডান পায়ের নাগড়ার ঠিক সামনে পড়ে। তারপরে, পিছন দিকে একবারও না তাকিয়ে তাবুর প্রবেশ পথের দিকে ধীরে, যন্ত্রণাক্লিষ্ট ভঙ্গিতে হেঁটে যায় কিন্তু পুরোটা পথ তাঁর পিঠ টানটান সোজা হয়ে থাকে, হুমায়ুনের দেহরক্ষীর দল দুপাশে সরে গিয়ে তাকে যাবার স্থান করে দিতে সে ডানেবামে কোনোদিকে না তাকিয়ে সোজা তাবু থেকে বের হয়ে যায়।
হুমায়ুন মুহূর্তের জন্য আবেগআপ্লুত হয়ে তাকে আটকাবার জন্য যেতে চায় কিন্তু কি লাভ হবে গিয়ে? রাগের বশবর্তী হয়ে তারা পরস্পরকে যা বলেছে এরপরে সম্পর্ক আর কখনও পূর্বাবস্থায় ফিরে যাবে না। জওহর, সে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠে। জওহর তাঁর পাশে এসে দাঁড়ান মাত্র, হুমায়ুন অন্য কেউ যাতে আড়ি পেতে শুনতে না পায় সেজন্য নীচুকণ্ঠে দ্রুত আদেশ দিতে শুরু করে। আমার দেহরক্ষী বাহিনীকে কালক্ষেপন না করে দ্রুত আমার ভাইয়ের সফরসঙ্গী হিসাবে আগত মহিলাদের নির্ধারিত তাবুতে প্রেরণ কর। আমার ভাইয়ের উজির, শেখ আলি আকবরের কন্যা, হামিদাবানুকে তাঁরা খুঁজে বের করবে, এবং যথাযথ সম্মান প্রদর্শনপূর্বক তাকে আমার ফুপুজানের কাছে পৌঁছে দেবে। আমার আদেশটা দ্রুত তাঁদের কাছে পৌঁছে দাও এবং আদেশটা পালিত হওয়া মাত্র আমি যেন খবরটা পাই…
আধঘন্টা পরে, জওহর এসে হুমায়ুনকে জানায় যে হামিদাবানুকে তাঁর ফুপুজান খানজাদার হেফাজতে পৌঁছে দেয়া হয়েছে। হুমায়ুন তাবুর বাইরে থেকে লোকজনের ইতস্তত দৌড়াদৌড়ি আর চিৎকারের শব্দ, ষাড়ের হাম্বা ডাক, লাগামের রিনিঝিনি শব্দ আর ঘোড়ার চিহি রব ভেসে আসতে শুনে। তাবুর পর্দার ফাঁক দিয়ে। উঁকি দিয়ে পাত্রে রক্ষিত জ্বলন্ত কয়লার কমলা আগুনে সে দেখে যে হিন্দালের লোকেরা শিবিরের মাঝে সহসা একটা বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে। তার সৎ-ভাইয়ের তাবু এর ভিতরে গুটিয়ে নেয়া হয়েছে এবং সেটা এখন একটা মালবাহী শকটে তোলা হচ্ছে। হুমায়ুন বাইরের দিকে আনমনে তাকিয়ে থাকার মাঝেই হঠাৎ একটা পরিচিত অবয়বকে হট্টগোলের ভিতরে দ্রুত তার তাবুর দিকে এগিয়ে আসতে দেখে।
হুমায়ুন, তুমি এটা কি করেছো? …শেষ পর্যন্ত কি তোমার বুদ্ধিনাশ হল? হুমায়ুনের তাবুর ভেতরে প্রবেশ করার আগেই খানজাদা বাইরে থেকেই চিৎকার জুড়ে দেন। হিন্দাল এইসময়ে চলে গেলে তুমি কিভাবে সফলতা আশা করতে পার? এবং এসবের পেছনে রয়েছে এক পলকের জন্য তোমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এমন একটা মেয়ে, সেই মেয়ে যার সাথে তুমি এমনকি কখনও কথাও বলনি এবং আমাকে কিছু না জানিয়ে যাকে তুমি আমার হেফাজতে প্রেরণ করেছে। সে তার ফুপুজানকে এর আগেও বহুবার ক্রুদ্ধ হতে দেখেছে কিন্তু কখনও তাঁর চোখের তারায় এমন হতবুদ্ধি করা নির্মমতা ভাসতে দেখেনি। এসব পাগলামি বন্ধ কর। দেরী হয়ে যাবার আগেই এখনই হিন্দালের সাথে দেখা কর এবং তাঁকে বলল যে মেয়েটার উপর থেকে তুমি তোমার দাবী প্রত্যাহার করে নিচ্ছো।
