বিশ্বাস কর, তাঁর বাবার সাথে কথা বলার আগ পর্যন্ত আমি জানতাম না যে তুমি তাকে পছন্দ কর।
কিন্তু আপনি যখন বিষয়টা জানতে পেরেছেন তখনও আপনি নিজেকে সংযত করেননি, তাই না? হিন্দাল তার দিকে এগিয়ে আসে। কামরান আর আসকারি
ন ৩২.পণ ও এ এম এম ঠিকই বলতো। আপনি হলেন আপনার নিজের ব্রহ্মাণ্ডের স্বনিয়োজিত কেন্দ্র। বছরের পর বছর আপনি আমাদের কেবল অবহেলাই করেছেন, আমাদের প্রত্যেককে নিজ নিজ প্রদেশে পড়ে পড়ে পচার জন্য ফেলে রেখে পুরোটা সময় আপনি মহান সম্রাটের নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। শেরশাহের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হবার পরে আমাদের সাহায্য যখন আপনার প্রয়োজন হয়েছে। কেবল তখনই আপনি আমাদের সবার অলিখিত শত্রুর বিরুদ্ধে একতা আনয়ন, ভ্রাতৃসুলভ দায়িত্ব নিয়ে বড় বড় কথা বলতে আরম্ভ করেছেন।
হিন্দালের কণ্ঠস্বর এখন প্রায় চিল্কারের পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং অবদমিত ক্রোধের কারণে সে প্রায় থরথর করে কাঁপছে। সহজাত প্রবৃত্তির বশে, হুমায়ুন সিন্দুকের দিকে তাকায় যার উপরে জওহর কিছুক্ষণ আগে কারুকার্যময় ময়ানে রক্ষিত আলমগীর রেখে গিয়েছে। তাঁর খঞ্জর অবশ্য এখনও তার সাথেই রয়েছে এবং তার কোমরের পরিকরের নীচে পাঁজরের কাছে সে এর শক্ত ধাতব বাটের অস্তি ত্ব বেশ অনুভব করতে পারে।
ছোট ভাই, যা বলছো একটু ভেবেচিন্তে বল…
কেবল সৎ-ভাই।
তুমি এখন ভুলে গেছো কেন অন্যদের সাথে তোমাকেও আমি আগ্রা থেকে সরিয়ে দিয়েছিলাম। তোমরা আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিলে। তোমাদের কৃতকর্মের জন্য আমি মৃত্যুদণ্ড দিতে পারতাম… আমি তোমাদের সবার জান বখশ দিয়েছিলাম।
আমি তখন মাত্র কৈশোর অতিক্রম করেছি, বয়সটাই ছিল সহজে অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হবার। আপনি যদি আমার প্রতি সামান্যতম আগ্রহ প্রদর্শন করতেন, আমার দ্বারা এমন ঘটনা কখনও সংঘটিত হতো না। কিন্তু আপনি তখন কেবলই নক্ষত্রের দিকে নির্নিমেষ চোখে তাকিয়ে থাকতেন… আমি ছেলেটা আসলেই কেমন, আমার আশা এবং আকাঙ্খগুলোর রং কেমন, আপনি কখনও এসব জানবার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেননি। আমার কাছ থেকে আপনি কেবল প্রশ্নতীত আনুগত্য এবং আজ্ঞানুবর্তিতা কামনা করেছেন যাতে করে আপনি নিজের উচ্চাকাঙ্খ বাস্তবায়িত করতে পারেন…
হুমায়ুন তার এই সৎ-ভাইটিকে এতো প্রাণবন্ত ভঙ্গিতে কথা বলতে বা চোখে দেখেনি। সে ঘনঘন শ্বাস নেয়। তার পুরো মুখটা টকটকে লাল হয়ে আছে এবং নাসারন্ধ্র প্রসারিত আর কপালের পাশে রক্তবাহী একটা শিরা দপদপ করছে।
হিন্দাল, এই বিষয়টা নিয়ে তর্ক করাটা আমাদের উচিত হবে না। বিশ্বাস কর, নতুন মেয়ে মানুষের জন্য এটা কোনো খেয়াল বা ক্ষনিকের মোহ নয়। আমি এই ব্যাপারটা নিয়ে কোনো প্রকার পরিকল্পনা করিনি- ব্যাপার কেমন করে যেন ঘটে গিয়েছে। ভোজসভায় তাকে আমি যখন দেখেছি তখনই আমি জানি…
কিন্তু হিন্দালকে দেখে মনে হয় এসব কিছুই শুনছে না। কোনো ধরনের আগাম পূর্বাভাষ না দিয়ে সে সহসা হুমায়ুনকে লক্ষ্য করে ঝাঁপিয়ে পড়ে, অপ্রস্তুত থাকার কারণে সে দ্রুত সরে যেতে পারে না। হিন্দালের পেষল হাতের মুঠি হুমায়ুনের কাঁধে চেপে বসে এবং পরমুহূর্তে হুমায়ুন নিজেকে ঢালাই লোহার লম্বা ধূপদানের উপরে। আছড়ে পড়তে দেখে।
তাবুর ভেতরে ধ্বস্তাধ্বস্তির শব্দ শুনে হুমায়ুনের দেহরক্ষীরা দ্রুত ভেতরে প্রবেশ করে। না! সে চিৎকার করে উঠে, ইঙ্গিতে তাঁদের হস্তক্ষেপ করতে মানা করে। হিন্দাল আবারও তাকে লক্ষ্য করে এগিয়ে আসতে শুরু করে এবং হুমায়ুন টের পায় তাঁর পাঁজরে সৎ-ভাইয়ের নাগড়া পরা পা এসে সজোরে আঘাত করেছে, তার বুক থেকে সব বাতাস বের হয়ে গেলে সে নিঃশ্বাসের অভাবে হাঁসফাঁস করতে শুরু করে। কিন্তু যৌবনের উদ্যম দিনগুলোতেই হুমায়ুন নিজেকে একজন তুখোড় কুস্তিগীর হিসাবে গড়ে তুলেছে- শক্তিধর এবং দ্রুতগতিসম্পন্ন এবং নিজের সেই নৈপূণ্য সে এখনও বিস্মৃত হয়নি। হিন্দাল তাকে আবারও লাথি মারতে চেষ্টা করতে সহজাত প্রবৃত্তির বশে সে তার পা আকড়ে ধরে এবং গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে সেটা মুচড়ে দেয়। দেহের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যেতে, হিন্দালের ভারী দেহটা একপাশে কাত হয়ে যায় এবং হুমায়ুন যেখানে তাঁর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ গচ্ছিত রাখে কোহ-ই-নূর আর তার আব্বাজানের নিজের হাতে লেখা রোজনামচার খাতাগুলো লোহা দিয়ে মোড়া সেই সিন্দুকের কিনারায় সে নিজের মাথা দিয়ে সজোরে আঘাত করে।
কপাল থেকে টপটপ করে গড়িয়ে পড়া রক্ত আর চোখেমুখে একটা বিমূঢ় অভিব্যক্তি নিয়ে হিন্দাল টলমল করতে করতে নিজের পায়ে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। সে নিজেকে সুস্থির করার আগেই হুমায়ুন মাথা নীচু করে সামনে এগিয়ে আসে এবং নিজের গতি আর ভরবেগ ব্যবহার করে হিন্দালের ভারী দেহ মোকাবেলা করে। হিন্দালের বাম পা পেছন থেকে নিজের ডান পা দিয়ে আকড়ে ধরে, সে তাঁকে পেছনের দিকে ঠেলে দিতে সক্ষম হয় এবং নিজের দেহের ভর তার উপরে চাপিয়ে দিয়ে দুজনে একসাথে মাটিতে আছড়ে পড়ে, হুমায়ুন তার উপরে থাকে। হিন্দালের মোষের মতো মাথাটা সে দুহাত দিয়ে আকড়ে ধরে টেনে তুলে এবং তারপরে সেটা সজোরে মাটিতে ঠুকে দেয়। হিন্দাল তার দেহের নীচে যন্ত্রণায় মোচড়াতে শুরু করে, চেষ্টা করে তাকে সরিয়ে দিতে কিন্তু হুমায়ুনের আঙ্গুলগুলো ততক্ষণে মৃত্যুর বারতা নিয়ে তার শ্বাসনালীতে চেপে বসতে শুরু করেছে। হিন্দালের শ্বাসপ্রশ্বাসের বেগ ঘ্যঁসঘেঁসে ফোপানির সাথে দ্রুততর হতে থাকে, পাগলের মতো তার দেহ মোচড়াতে শুরু করলে আরেকটু হলেই হুমায়ুন ছিটকে পড়তো। অবশ্য নিজের দুই উরু দিয়ে যত জোরে সম্ভব হিন্দালকে আকড়ে ধরে থাকায় হুমায়ুন তার উপরেই অবস্থান করে এবং তার হাত আরো জোরে ভাইয়ের গলায় চেপে বসতে থাকে।
