শেখ আলি আকবর চুপ করে থাকে, কোনো কথা বলে না। বিমূঢ় হুমায়ুন এবার তাঁর দিকে এগিয়ে যায়। লোকটার চোখে মুখে ফুটে উঠা অস্বস্তি দেখে বোঝা যায় কোনো একটা সমস্যা দেখা দিয়েছে। কি ব্যাপার বলেনতো? এমন প্রস্তাবে বেশীর ভাগ পিতারই উল্লসিতবোধ করার কথা।
সুলতান, আমার জন্য এটা একটা অকল্পনীয় সম্মান। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি…না ভুল বললাম, আমি জানি… আপনার সৎ-ভাই হিলাল হামিদার প্রতি দুর্বল। হিন্দাল তাঁকে খুব অল্প বয়স থেকেই চেনে। আমি তার নুন খেয়েছি এবং সুলতান, আপনাকে এসব বিষয়ে অবহিত না করে তাঁকে যদি আমি অন্যকারো হাতে তুলে দেই, এমনকি সেটা যদি আপনিও হন, ব্যাপারটা আমার জন্য অবাধ্যতারই পরিচায়ক হবে।
তাঁদের বাগদান কি হয়ে গিয়েছে?
না, সুলতান।
আর হামিদা। তার কি অভিপ্রায়?
সুলতান, এটা আমি ঠিক বলতে পারবো না। এসব বিষয়ে আমি কখনও তাঁর সাথে আলোচনা করিনি এবং আমার স্ত্রী বেঁচে থাকলে তিনি এসব বিষয়ে তাঁর সাথে আলোচনা করতে পারতো… হামিদার জন্মের ঠিক পরপরই তাঁর মা একটা অজানা জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করে।
আপনি নিজের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমাণ করেছেন। আমি এটা সম্মান করি কিন্তু সেই সাথে আমি আপনার মেয়ের সাথে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হতে চাই। আজ থেকে এক সপ্তাহের ভিতরে আশা করি আমি আপনার মনোভাব জানতে পারবো। আর শেখ আলী…আমার ভাই আমাকে বলেছে যে এক মহান ভবিষ্যদর্শীর রক্ত আপনার ধমনীতে বহমান, যিনি ভবিষ্যতের ঘটনাবলী আগাম বলে দিতে পারতেন…আপনি যদি তার বিন্দুমাত্র গুণ লাভ করে থাকেন তবে ভবিষ্যত দেখতে পাবার সেই ক্ষমতা আপনি এবার কাজে লাগাতে পারেন। আপনি দেখতে পাবেন যে আপনার কন্যা মহীয়সী আর সুখী হবে যদি আপনি তাকে আমার হাতে তুলে দেন।
সুলতান। কিন্তু শেখ আকবর আলি বিদায় নেবার জন্য যখন ঘুরে দাঁড়ায় তাঁর মুখাবয়বে তখনও উদ্বেগ আর অশান্তি খেলা করে। শেখ আলি আকবর যখন বাইরে বের হবার জন্য প্রবেশপথের পর্দা একপাশে সরিয়ে দিতে, তাবুর ভিতরটা দিনের প্রথম সূর্যালোক উদ্ভাসিত হয়ে উঠতে, একমুহূর্তের জন্য হুমায়ুনের চোখ ধাঁধিয়ে যায়।
সেদিনই দুপুরের দিকে, হুমায়ুন কিছুক্ষণ একাকী থাকবার অভিপ্রায়ে মূলসৈন্যসারি ত্যাগ করে এবং দুলকীচালে একাকী ঘোড়া দাবড়াতে আরম্ভ করে। ঘোড়ার খুরের ছন্দোবদ্ধ আওয়াজ তাঁর কানে তালা লাগিয়ে দেয়, সে এখনও এতো আকষ্মিক, এতো প্রবল, আর এতো অপ্রত্যাশিত অনুভূতির সাথে খাপ নিতে চেষ্টা করছে। অন্য আর কোনো মেয়ে তার মাঝে এমন চাঞ্চল্য সৃষ্টি করতে পারেনি। তাঁর হৃদয়ের ভিতরে অবশ্য একটা অশুভ ভাবনা ঘাপটি মেরে থাকে একটা অপরাধবোধ যে নিজের সৎ-ভাইয়ের ভালোবাসার নারীকে সে নিজের স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করতে চাইছে। কিন্তু সে কিছুতেই হামিদার অপরূপ মুখশ্রী, তার ঝকঝকে ব্যক্তিত্ব নিজের মন থেকে মুছে ফেলতে পারে না। সে হামিদাকে তাঁর সম্রাজ্ঞী করবে আর সে হিন্দালের অনুভূতিকে তার যতই আঘাত করতে হোক।
সেদিন সন্ধ্যাবেলা, একটা পিতলের গামলায় জওহরের নিয়ে আসা ঠাণ্ডা পানি দিয়ে হুমায়ুন যখন তার চোখেমুখে ঝাপটা দিচ্ছে তখন সে তার তাবুর বাইরে বেশ কয়েকজনকে উচ্চকণ্ঠে আলাপ করতে শোনে। তারপরেই ঝড়ের বেগে হিন্দাল তাবুর ভিতরে প্রবেশ করে, তার পরনে তখনও সারাদিনের যাত্রার পরে ধূলো আর ঘামে ভেজা অশ্বারোহীর পোষাক।
এটা কি সত্যি? হিন্দালের কণ্ঠস্বর সংযত কিন্তু চোখে দাবানলের পূর্বাভাষ।
কোনটা কি সত্যি? হুমায়ুন জওহরকে ইঙ্গিতে বাইরে যেতে বলে।
শেখ আলি আকবর আমাকে বলেছে আপনি নাকি হামিদাকে বিয়ে করবেন বলে মনস্থির করেছেন।
হ্যাঁ। তাকে আমি আমার স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করতে চাই।
সে… সে আমার উজিরের কন্যা। আমি তাকে ছোট থেকে বড় হতে দেখেছি… তার প্রতি আপনার চেয়ে আমার দাবী অনেকবেশী জোরাল… হিন্দালকে স্নায়ুবিকারগ্রস্থ একজন মানুষের মতো দেখায়।
তোমাকে আঘাত দেয়াটা আমার অভিপ্রায় না কিন্তু একটা সময় এটা প্রশমিত হবে। তুমি আরেকজন রমণীকে খুঁজে পাবে যে তোমাকে প্রীত করবে…
গত কয়েকমাস একসাথে কাটাবার পরে আমি মনে করেছিলাম আমরা বোধহয় পরস্পরকে খানিকটা হলেও চিনতে পেরেছি। আপনাকে আমি বিশ্বাস করতাম। আমি আপনাকে সমর্থন করেছি যখন কামরান আর আসকারির মতো আমিও অন্য কোথাও নিজের ভাগ্য অন্বেষণ করতে পারতাম আর তার ফলাফল হয়ত ভালোই হত। আপনাকে অনুসরণ করে এটা আমি কি পুরষ্কার পেলাম? কিস্যু না! লাহোর থেকে আমরা বলতে গেলে প্রায় দুপায়ের ফাঁকে লেজ গুটিয়ে পালিয়ে বেঁচেছি। সিন্ধে আমাদের ভাগ্য বলতে হবে প্রসন্নই ছিল- নিজেদের মানসম্মান নিয়ে সরে আসবার পূর্বে মির্জা হুসেন আমাদের সাথে পোষা কুকুরের মতো আচরন করেছে। কিন্তু আমি তারপরেও বিশ্বস্ত থেকেছি আর আমার অধীনস্ত যোদ্ধাদের মনোবল চাঙ্গা রাখতে চেষ্টা করেছি, এই আশায় যে শীঘ্রই শেরশাহের বিরুদ্ধে আমি আর আপনি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধে অবতীর্ণ হব। আপনি এর পরিবর্তে, নিশিকুটুম্বের মতো, তিলেকমাত্র চিন্তা ভাবনা না করে, আমাদের পরিবারের প্রধান হিসাবে নিজের অবস্থানের অপব্যবহার করে আমি যে মেয়েকে ভালোবাসি তাকে আমার কাছ থেকে চুরি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন…
