আমাদের যা খাবার আর বাড়তি পানির বোতল আছে তাকে দিয়ে দাও, অশোক সিংকে নির্দেশ দিলেন শাহজাহান। দুর্ভিক্ষের এতটা প্রকোপ আমি তো বুঝতেই পারি নি।
অবস্থা বেশ খারাপ, জাহাপনা। বোরহানপুরের দেয়ালের চারপাশে আমি দেখেছি পশুর মলের ভেতরে হজম না হওয়া অক্ষত শস্যদানা নিয়ে মারামারি করছে পুরুষের দল। কিন্তু প্রত্যন্ত অঞ্চলের এসব গ্রামের অবস্থা আরো খারাপ। এমনও শোনা যাচ্ছে যে, কয়েকটা মুদ্রার লোভে পিতা মাতারা, নিজ সন্তানদেরও বিক্রি করে দিচ্ছে ক্রীতদাস হিসেবে, এই আশায় যে, এতে করে উভয় পক্ষই ভালো থাকবে। এছাড়া পাহাড়ের লোকদের মাঝে তো স্বজাতির মাংস খাওয়ার গুজবও শোনা গেছে; যাদের ভেড়া আর ছাগলের মাংস শেষ।
রাজপুত সৈন্যরা লোকটাকে খাবার আর পানি দিয়ে দিলেও শাহজাহান কিছুতেই মন থেকে তাড়াতে পারলেন না হাড় দিয়ে ময়দা তৈরি বা স্বজাতের মাংস খাবার মত ব্যাপারগুলো। কিন্তু এতে তো অবাক হবার তেমন কিছু নেই। একটু আগে তিনি নিজেও তো খুন করে এসেছেন এক বৃদ্ধাকে। যাই হোক, অন্য আরেকটা চিন্তা এলো মাথায়। মানুষটা নিশ্চয়ই তার স্ত্রীকে অসম্ভব ভালোবাসে, তাই অন্য গ্রামে গিয়ে খাবারও খুঁজতে যায় নি পত্নীকে একা রেখে। যেমন তিনিও করতেন মমতাজের সাথে। যদি জন্তুর মতো টিকে থাকাই হয় একমাত্র স্বার্থপর চেতনা, তাহলে মানুষের মাঝে এর চেয়েও মহৎ গুণ আছে…যেমন ভালোবাসা।
১.৪ সাত্তি আল-নিসার সহযোগী
১.৪
সাত্তি আল-নিসার সহযোগী তার গায়ে স্যাফায়ার সিল্ক জড়িয়ে মমতাজ সাবধানে নেমে গেলেন সাদা মার্বেলের তৈরি সিঁড়ির তিন ধাপ নিচে গোলাপ তেলের সুগন্ধিওয়ালা পানির পুকুরে। ভারী শরীর সত্ত্বেও কয়েক সপ্তাহের মাঝেই সন্তান জন্মদান করবেন মমতাজ। তাঁর প্রতিটি চলনে ফুটে উঠেছে এক ধরনের মাধুর্য, হাম্মামের দরজার কাছ থেকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ভাবলেন শাহজাহান।
মোমবাতির উজ্জ্বলতায় ফুটে রয়েছে মমতাজের শরীরের প্রতিটি ভজ। এক মুহূর্তের জন্য পত্নীর দিকে তাকিয়ে থাকার বিলাসিতায় পেয়ে বসলো সম্রাটকে। পাশের দেয়ালে মাথা রেখে বসে আছেন মমতাজ, সেবাদাসীরা পানি ঢালছে মাথার উপর। নিচে মাছের আশের আকৃতিতে তৈরি বাকানো মার্বেলে পানি পড়ে বৃষ্টির মত নৃত্য করছে। বোরহানপুরের এই চার দেয়ালের মাঝে মমতাজের জন্য স্বর্গ রচনা করেছেন শাহজাহান। আঙিনায় ফুটে আছে লাল পদ্ম আর মিষ্টি সুগন্ধওয়ালা চম্পা ফুল, অন্যদিকে প্রাচীন ঝরনা গেয়ে চলেছে জীবনের জয়গান।
দেয়ালের বাইরের কঠোর বাস্তবতায় রুক্ষ সূর্যতাপের নিচে যুদ্ধ করছে মানুষ আর পশু, জীবনীশক্তি শেষ হয়ে যাচ্ছে মাটি আর মানুষের। হিন্দু মন্দিরের ভক্তরা প্রার্থনা শুরু করেছে দেব-দেবীর উদ্দেশে, যেন তাদের দুঃখ লাঘব করেন দেবতারা। এমনকি কালীর উদ্দেশে রক্ত উৎসর্গও করা হচ্ছে। অন্য কয়েকজন আবার নিজেদের দুর্ভাগ্যের সময় সহায়তা না করার অভিযোগে দোষারোপ করছে মোগল সম্রাটকে। গত সপ্তাহে দুজন সাধু সারা গায়ে ছাই মাখানো হাড়সর্বস্ব ভূতের মত চেহারা নিয়ে হাজির হয় বোরহানপুরের প্রধান ফটকে। নিজেদের লাঠি নেড়ে শাপ-শাপান্ত করতে থাকে ম্রাটকে। শাহজাহান নির্দেশ দেন যেন তাদেরকে কিছু করা হয় আর তাই কড়া রোদে ঘণ্টাখানেক দাঁড়িয়ে থেকে চলে যায় সাধুগণ। কিন্তু যাবার আগে মাটিতে রেখে যায় ছোট্ট বাচ্চার দেহের মত কিছু একটা। সৈন্যরা গিয়ে পরীক্ষা করে দেখতে পায় যে ময়লা ন্যাকড়ায় জড়িয়ে ফেলে রেখে গেছে একদঙ্গল কাঠি আর মাথার কাছে শুকনো লাউ; কিন্তু যা বলতে চেয়েছে সেই বার্তা পরিষ্কারভাবেই বুঝতে পেরেছেন সম্রাট। মারা যাচ্ছে ছোট বাচ্চারা আর এর সব দোষ সম্রাটের। মমতাজকে কিছুই জানাননি তিনি।
পুকুরের সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে লাগলেন শাহজাহান। পদশব্দে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে হাসলেন মমতাজ। কেন যেন খুব ক্লান্ত লাগছে আজ রাতে–তাই ভাবলাম গোসল করলে ভালো লাগবে।
লম্বাদেহী সাত্তি আল-নিসা আর অন্য দাসীরা চলে না যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন শাহজাহান। এরপর বসলেন পুকুরের মার্বেল বাঁধানো ঘাটে। দুর্ভিক্ষের অবস্থা ক্রমশ খারাপ হচ্ছে। প্রতিদিনই আমি খবর পাচ্ছি যে গ্রামবাসী পুরো গ্রাম খালি করে গবাদিপশু নিয়ে চলে যাচ্ছে পশ্চিমে পানির খোঁজে। আক্রান্ত অঞ্চলগুলোর রাজকীয় শস্যাগার খুলে দেয়ার আদেশ দিয়েছি আমি; কিন্তু প্রয়োজনীয় শস্যেরও মজুদ কম। শুধুমাত্র সপ্তাহখানেক দেয়া যাবে মানুষকে, পশুকে নয়। কিন্তু গবাদি প্রাণী ছাড়া তাদের ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত। কয়েকটা জায়গায় আবার বিজাপুরের বিদ্রোহীরা শস্যভাণ্ডারে হামলা চালিয়েছে।
আপনি তো যা পারছেন, করছেন।
কিন্তু নিজেকে খুবই অসহায় মনে হচ্ছে। আমার সম্পদ আর শক্তি সত্ত্বেও যেটার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তা হচ্ছে পানি, সোনা নয়। যদি এরই মাঝে বর্ষা না হয়। তো আরো বহু প্রাণ মৃত্যুবরণ করবে।
আপনি তো আর প্রকৃতিকে পরাজিত করতে পারবেন না।
আমার জনগণের জন্য আরো ভালো কিছু করতে হবে আমাকে, কিন্তু এই যুদ্ধের কারণে তাও পারছি না…দ্রুত এর সমাপ্তি টানতে হবে।
আপনি আবারো অধৈর্য হয়ে পড়েছেন। আমি এখানে এক বছর এমনকি দুই বছরও থাকতে রাজি আছি। তবুও একটা সংক্ষিপ্ত অভিযানের জন্য আপনাকে এমন বিশৃঙ্খল অবস্থায় দেখতে চাই না।
