পাতাবিহীন গাছদের নিচ দিয়ে ধীরে ধীরে দক্ষিণ দিকে এগোতে শুরু করলেন। ঘোড়ার খুরের দাগ অনুসরণ করলেও আস্তে আস্তে তাও হারিয়ে যেতে বসেছে, কেননা ঝোঁপের কিনারে মাটি বেশ শক্ত। গভীরভাবে উপলব্ধি করলেন যে দূতদের সাথে বসে লুকিয়ে চলাফেরার কৌশল রপ্ত করা কতটা জরুরি ছিল। ঝাপসা হয়ে যাওয়া দাগের উপর থেকে চোখ সরিয়ে সামনের দিগন্তের দিকে তাকিয়ে চেষ্টা করলেন ঘোড়ার কোন চিহ্ন দেখা যায় না কিনা তা খুঁজতে। এর বদলে দেখতে পেলেন খুব বেশি হলে এক মাইল দূরত্বে উত্তর দিক থেকে ধূলি উড়িয়ে এগিয়ে আসছে একদল অশ্বরোহী। শাহজাহান জানেন না এরা বন্ধু নাকি শত্রু। তাই দ্রুত গিয়ে লুকিয়ে পড়লেন বড় একটা গাছের গুঁড়ির পেছনে। সাবধানে তাকিয়ে দেখতে লাগলেন পরিচিত চিহ্ন চোখে পড়ে কিনা। কিছুই বুঝতে পারলেন না, দলটা একেবারে কাছে চলে এলো। এরপরই বিভক্ত হয়ে গেল। অর্ধেক এগিয়ে গেল ঝোঁপের এক দিকে, বাকিরা ঝোঁপের অন্যদিকে। সবাই প্রায় অর্ধেক নিচু হয়ে খুঁজতে লাগল কী যেন। আরো কাছে চলে আসতেই শাহজাহান গুঁড়ির গায়ে হেলনা দিয়ে যতোটা সম্ভব গুটিসুটি মেরে বসে রইলেন। হঠাৎ করেই স্বস্তি নিঃশ্বাস ফেলে চিনতে পারলেন সেনাপতিকে লম্বা এক রাজপুত সৈন্য কালো ঘোড়ার উপর বসে আছে। লোহার বুক বর্মের নিচে কেশর রঙা আলখাল্লা। অশোক সিং। সৈন্য তাঁর নিজ বাহিনীর। গাছের গুঁড়ি থেকে বের হয়ে ঝোঁপের কিনারে দৌড়ে গেলেন শাহজাহান।
জাহাপনা, আপনি? আপনি কী আহত হয়েছেন? ঘোড়া থেকে নামতে নামতে চিৎকার করে জানতে চাইল অশোক সিং।
হ্যাঁ–আর না, তেমন গুরুতর কিছু না, আল্লাহর অশেষ দয়া যে তোমরা আমাকে খুঁজে পেয়েছে। আমি আঘাত পেয়েছিলাম আর আমার ঘোড়া আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে মনে হয়।
আমরা ঘোড়াটাকে খুঁজে পেয়েছি, বেশি দূরে যেতে পারে নি।
যুদ্ধে কি আমাদের জয় হয়েছে?
হা জাহাপনা। যুদ্ধে আমরাই এগিয়ে থেকেছি আর তখনি আপনাকে হারিয়ে ফেলি দৃষ্টিসীমার বাইরে। অন্যদিকে বিজাপুরে সৈন্যরা তাঁবু ছেড়ে বিস্তর ক্ষয়-ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে পিছু হটেছে।
এখনো পিছু ধাওয়া করছ?
না। আমাদের ক্ষতিও কম হয়নি। আপনার অনুপস্থিতিতে সেনাপতিরা ভেবে দেখলেন যে পিছু ধাওয়া করার চেয়ে আহত সেবা আর পুনরায় শৃঙ্খলিত হওয়া বেশি জরুরি। সবাই ভয় পাচ্ছিলেন আহমেদ আজিজের মত কোন চোরা হামলা যদি হয় আর আপনাকে খুঁজে বের করাও জরুরি।
তো, বিজয় তাহলে সম্পূর্ণ হল না, ভাবলেন শাহজাহান। কিন্তু এর আগে যে সমস্যাগুলোর মুখে পড়েছিলেন তার চেয়ে এই আংশিক সাফল্যও ভালো।
দুই ঘণ্টা পরে আবারো নিজের ঘোড়ার পিঠে উঠে বসলেন শাহজাহান। লুকানো জায়গা থেকে এক সৈন্য আবার দেহবর্মটাও উদ্ধার করে এনেছে। পরে নিলেন তিনি। কাছাকাছিই আবার ঝোঁপের মড়া ডাল জ্বালিয়ে তাড়াতাড়ি একটা চিতা তৈরি করল রাজপুত সৈন্যরা। পোশাক দেখে এটুকু নিশ্চিত যে বৃদ্ধ নারী হিন্দু, তাই আচার মাফিক শেষকৃত্য সম্পন্ন হল। কিন্তু তুলোয় মোড়া দেহ থেকে আগুনে শিখা বের হতেই অপেক্ষা করার প্রয়োজন রইল না।
এই বৃদ্ধা একাই পুড়ে ছাই হয়ে যাবে এই মরুভূমিতে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে নিজের বাহিনীর সাথে একত্রিত হতে হবে, নতুবা গুজব ছড়িয়ে যাবে যে সম্রাট আহত হয়েছেন অথবা মৃত্যুবরণ করেছেন। চিতার কালো ধোঁয়ার দিকে আরেক নজর তাকিয়ে ক্লান্ত ঘোড়াকে ছুটে চলতে তাগাদা দিলেন তিনি।
প্রথম কয়েক মাইল জুড়ে চারপাশে দেখা গেল শুধু শুষ্ক ভূমি। একটিও কোন জীবিত প্রাণীর দেখা মিলল না। কিন্তু এর পরই শাহজাহান দেখতে পেলেন যেন ছোট একটা গ্রাম–ছয় থেকে সাতটা গোলাঘরের বেশি না। ডানদিকে পড়ল সেই গ্রাম। হতে পারে এখানে হয়তো এমন কোন কুয়া পাওয়া যাবে যেটা এখনো শুকিয়ে যায়নি, নিজেদের ঘোড়াকে পানি খাওয়াতে পারবেন তারা। নিজের লোকদের ইশারা করে ঘোড়া ছুটিয়ে মাটির ইট দিয়ে তৈরি নিচু ঘরগুলোর দিকে চললেন তিনি। কাছাকাছি এগোতেই দেখা গেল কয়েকটা পাতা ঝুলছে এমন একটা বট গাছের নিচে সরু পা ছড়িয়ে বসে আছে এক বৃদ্ধ পুরুষ। এত লিকলিকে পা যে মনে হল নিজের ভার বইতেও অক্ষম লোকটা।
খাবার দাও, বাপু, আমি ভিক্ষা চাইছি…ফেটে যাওয়া ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে কথা বলে উঠল লোকটা। নিজের ঘোড়ার পিঠে বসে জিজ্ঞেস করলেন শাহজাহান, তোমাদের খাদ্যের গুদাম কি শেষ হয়ে গেছে? শেষ কবে খেয়েছিলে তোমরা?
উঁচু গালের হাড়ের উপরে কোটরে বসা বৃদ্ধের চোখ সূর্যের আলোয় চকচকে ভাব নিয়ে তাকিয়ে রইল সম্রাটের দিকে।
ছয় সপ্তাহ আগেই ফুরিয়ে গেছে আমাদের শস্য। এর কয়েক দিন পর থেকে মারা যেতে শুরু করে গবাদিপশু। এগুলোর মৃতদেহও খেয়ে ফেলি আমরা, চামড়া আর নাড়ি-ভুড়িসহ। এছাড়া হাড়গুলোকেও মাটিতে পুঁতে রাখি এক ধরনের ময়দা তৈরির জন্য। ভাগ্যক্রমে কুয়োতে এখনো পানি আছে। কিন্তু এছাড়া খাওয়ার মত শুকনো পাতা ছাড়া আর কিছুই নেই। কয়েকদিন আগে দুইটি বনবিড়াল ধরেছিলাম, এই-ই।
অন্য গ্রামবাসীরা কোথায়?
তিন দিন আগে চলে গেছে অন্য কোথাও খাবার পাওয়া যায় কিনা খুঁজতে; কিন্তু আমার স্ত্রী অনেক দুর্বল হওয়ায় আমি রয়ে গেছি।
