‘এত কম সৈন্য কেন সে সেখানে নিয়ে গেছে?
কারণ তার ইচ্ছে ছিল খুব কম সময় সেখানে কাটাবে। তার বেশির ভাগ সেনা সে সেখান থেকে একটু দূরে দেবরুখ নামে একটি স্থানে ছেড়ে এসেছে। ওরা সেখান থেকে অস্ত্রশস্ত্র, রসদ নেবে আর প্রশিক্ষণের জন্য কিছুদিন অবস্থান করছে। তবে সংঘামেশ্বরের এমন প্রচণ্ড আর্কষণ যে, সে এক মাসেরও বেশি সময় সেখানে রয়েছে আর সেখান থেকে তার চলে আসারও কোনো নামগন্ধ দেখা যাচ্ছে না।
আওরঙ্গজেব চোখ বুজে একটু ভাবলেন। সম্ভাজি সম্পর্কে তিনি যা যা শুনেছেন এটা তার সাথে খাপে খাপে মিলে যায়। বাবার মতো সাহসী যোদ্ধা হলেও সে যুদ্ধের প্রস্তুতি আর পরিকল্পনার কাজটি তার অধীনস্থ সেনা কর্মকর্তাদের উপর খুশি মনে ছেড়ে দেয়, যা শিবাজি করতেন না। তাঁর মনে একটা প্রশ্ন জাগতেই তিনি বললেন, “তোমার চরেরা সম্ভাজিকে সংঘামেশ্বরে কেমন করে খুঁজে পেল?
কামরান বেগ একটু অপ্রস্তুত হয়ে একমুহূর্ত ইতস্তত করলো, তারপর বললো, ‘এটা প্রথমে ওয়াজিম খান বলেছিলেন যে, সে ঐ জায়গায় থাকতে পারে। সন্তাজি নামে যে তরুণ মারাঠি বন্দীটিকে আপনি ছেড়ে দিয়েছিলেন, প্রথমবার জিজ্ঞাসাবাদের সময় ঐ তরুণটি বলেছিল যে সম্ভাজি সংঘামেশ্বর জায়গাটি পছন্দ করেন…এমনকি সে নিজেও তার সাথে সেখানে সময় কাটিয়েছে।
তাহলে ওয়াজিম খান আসলেই খুব গুরুত্বপূর্ণ একজন লোক ছিল …তার প্রধান গুপ্তচরকে বরখাস্ত করার পর থেকে আওরঙ্গজেব কয়েকবার আফসোস করেছিলেন যে, সে আর তার পাশে নেই। তার মন ছিল খুব তীক্ষ্ণ আর পরামর্শগুলোও সবসময় খুবই বুদ্ধিদীপ্ত ছিল। আর এখন মনে হচ্ছে ওয়াজিম খান তাকে একটা সুযোগ উপহার দিল যে তাকে ভোলা যায় না। তিনি বললেন, কামরান বেগ, তুমি নিশ্চয়ই এখান থেকে সংঘামেশ্বর পর্যন্ত যে এলাকাটি আছে তা ভালো করেই জান। আমাদের সৈন্যদের সেখানে পৌঁছতে কত সময় লাগবে?
‘এই দুর্গ থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে সংঘামেশ্বর প্রায় একশো মাইল দূরে। ভালো ঘোড়া আর সুসজ্জিত একটি অশ্বারোহী সেনাবাহিনীর সেখানে পৌঁছতে প্রায় দুই দিন লাগবে আর কোনো সাহায্য পৌঁছার আগেই সম্ভাজিকে ধরে আনা যাবে–আমি আমার জীবন বাজি রেখে একথা বলতে পারি!
‘একটি সেনাদল কী যথেষ্ট হবে?’
স্থানটি খুব একটা সুরক্ষিত নয়। তাছাড়া একটি ছোট সেনাদল মারাঠি এলাকায় ঢুকলে খুব একটা দৃষ্টি আকর্ষণ করবে না।
‘ঠিক বলেছ, কামরান বেগ। তুমি একজন ভালো যোদ্ধা আর সেনানায়ক আর আমার প্রধান গুপ্তচর। আমি তোমাকেই এই অভিযানের দায়িত্ব দিচ্ছি। মারাঠি বন্দীটিকে তোমার সাথে নাও। সংঘামেশ্বর সম্পর্কে তার জ্ঞান কাজে লাগতে পারে। আর তোমার জন্য রয়েছে উত্তম পুরস্কার যদি তুমি সফল হতে পার। আর যদি ব্যর্থ হও তবে একজন শহীদ হিসেবে আমাদের মহৎ উদ্দেশ্য আর ধর্মবিশ্বাসের জন্য প্রাণ বিসর্জন দেবে। দুই দিকেই তোমার জন্য গৌরবজনক সম্মান অপেক্ষা করছে। প্রস্তুতি নেবার জন্য কামরান বেগ দ্রুত চলে যেতেই আওরঙ্গজেব মুখ বিকৃত করে মৃদু হাসলেন। তাঁর গুপ্তচর প্রধানের বাঁচামরা নির্ভর করছে তার চরদের পর্যবেক্ষণের নির্ভুলতা, গুণ আর তার নিজের নির্দেশনার উপর। আসলে এভাবেই এটা হওয়ার কথা।
*
কামরান বেগ তার লোকদেরকে নির্দেশ দিল, আমরা এই জঙ্গলের কিনারায় থামবো। ঐ গাছগুলোর গুঁড়িতে ঘোড়া বাঁধ। আর তুমি ইব্রাহিম আলি চারজন লোকসহ এখানে থেকে ঘোড়াগুলো পাহারা দেবে। আর অন্যরা হেঁটে যাওয়ার জন্য তৈরি হও।’ দ্রুত আলো কমে আসছে, অশ্বারোহী সেনারা চটপট কাজে লেগে পড়লো। বড় চামড়র মশক থেকে পেটপুরে পানি খেয়ে আবার ঘোড়ার জিনের সাথে বেঁধে রেখে অস্ত্রশস্ত্র পরীক্ষা করে নিল। কামরান বেগ ওদের মাঝে ঘুরে ঘুরে দেখে নিল সবকিছু ঠিক আছে কি-না। যখন সবাই তৈরি হল তখন সে খুশি হয়ে একবার ঘোৎ করে একটা শব্দ করলো। বুদ্ধি করে সে তার লোকজনদের মারাঠিদের মতো পোশাক পরিয়েছিল। এতে পথে আসার সময় যেমন ছদ্মবেশ হিসেবে কাজ করেছে তেমনি এখন প্রাসাদে ঢুকতেও সাহায্য করবে।
সে একজন সৈন্যকে বললো, ‘সন্তাজিকে নিয়ে এস। তাকে আমার সাথে রাখবো। কয়েকমুহূর্ত পর সন্তাজি তার সামনে হাজির হল। কামরান দৃঢ়হাতে তার কাঁধ জাপটে ধরে তার মুখের দিকে তাকিয়ে বললো, “শোন, এখন সামনে যা হবে তাতে তোমার ভাগ্য নির্ধারণ হবে। যদি আমি দেখি যে সংঘামেশ্বর সম্পর্কে তুমি কোনো কিছু মিথ্যা বলেছ, তাহলে আমি তোমার গলা কাটবো। বুঝতে পেরেছ?
সন্তাজি মাথা নাড়লো।
তবে যাওয়ার আগে আমি তোমাকে একটা শেষ সুযোগ দিতে চাই। তুমি যা বলেছ তা সব সত্যি?
হ্যাঁ, জনাব।’
“ঠিক আছে। আমরা যখন পথ খুঁজে প্রাসাদের দিকে যাব, তখন আমার চোখ আর কান হয়ে তুমি সারাক্ষণ আমার পাশে থাকবে। হাত বাড়াও। ছুরি বের করে কামরান বেগ ছেলেটির হাতের বাঁধন কেটে দিল। এটা করলাম, যাতে কারও দৃষ্টি আকর্ষণ না হয়। কোনো কিছু করার চেষ্টা কর না। এখন চল।
ষাটজন লোক নিঃশব্দে জঙ্গলের পথ দিয়ে এগিয়ে চললো। মাঝে মাঝে কেবল। মাটিতে পড়ে থাকা গাছের ডাল আর পাতা মাড়িয়ে চলার সময় মচ মচ শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। চাঁদ উঠতেই কিছু আলো পাওয়া গেল তবে একটু পরই গাছ কমে আসতেই কামরান বেগ খুশি হয়ে দেখলো এখন ভালভাবে পথ দেখা যাচ্ছে। একটা খোলা জায়গার কাছে পৌঁছার পর তার মনে হল সামনে পানির আভা দেখা যাচ্ছে। সোনভি নাকি শাস্ত্রি নদী? সে নিশ্চিত হতে পারলো না, তবে এতে কিছু যায় আসে না। সে নদীর তীরের দিক থেকে প্রাসাদে যেতে চাচ্ছে না। তার যে দুই চর সম্ভাজিকে খুঁজে বের করেছিল, তারা বলেছিল দুই নদী যেখানে এক হয়ে সাগরের দিকে চলে গেছে, সেই কোণে কবি-কুলেশ একটি উঁচু মার্বেল চত্বর নির্মাণ করেছিল। আর সেই চত্বরের পেছনেই প্রথমে প্রাসাদ আর তারপর প্রমোদ উদ্যান। আর এই পথ দিয়ে অতিথিরা ভেতরে ঢুকে, এ ধরনের কথাও সন্তাজি বলেছিল।
