ওয়াজিম খান বললো, আজকের দিনটি সত্যি আপনার জন্য এক বিশাল বিজয়ের দিন, জাহাপনা। আজ সন্ধ্যায় আমার জন্য কোনো কাজ আছে?”
না, আজ রাতে তোমাকে আমার প্রয়োজন নেই। সারাদিনের পরিশ্রমে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। আমার পরিচারকরা মূল তাবুতে আমার জন্য যে শোয়ার ব্যবস্থা করেছে সেখানে গিয়ে এখন বিশ্রাম নেব। তুমি বরং ঐ উৎসবে যোগ দাও।’
মাঝরাত পর্যন্ত ঘুম না আসায় আওরঙ্গজেব অবাক হলেন। তার দেহ ক্লান্ত হলেও মনের মধ্যে ভাবনা চলছিল কত দ্রুত সম্ভব আর জান-মালের তেমন ক্ষতি না করে কিভাবে গোলকুন্ডার বাকি এলাকা, বিশেষত হীরার খনিগুলো তার আয়ত্তে আনা যায়। আফগান সেনাপতির মতো বাকি গোলকুন্ডি সেনাপতিদের মধ্য থেকে কাউকে কি ঘুষ দিয়ে বশ করা যাবে? ওয়াজিম খান বলেছিল, রশিদ খানের একজন চাচাত ভাই হীরার খনির প্রতিরক্ষায় নিযুক্ত গোলকুন্ডা বাহিনীর একজন সেনানায়ক। তাকে কি বাগে আনার জন্য প্রস্তাব পাঠাবেন? লোকটির কী অবস্থান এখানে? কতটুকু ক্ষমতা সে ধরে? ওয়াজিম খান নিশ্চয়ই এসব জানে আর হয়তো কিভাবে এগোন যায় সে ব্যাপারে ভালো কোনো পরামর্শও দিতে পারে। এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনার এখনই ভালো সময়। বিছানা থেকে উঠে আওরঙ্গজেব তাবুর দরজার কাছে গিয়ে বাইরে যে দুজন দীর্ঘদেহী দেহরক্ষী পাহারায় নিযুক্ত ছিল, তাদের একজনকে ডেকে বললেন, ‘ওয়াজিম খানকে এখানে আসতে বল।
প্রায় আধঘণ্টা পর ওয়াজিম খান হাজির হল। তার চুল আর মুখ ঘামে ভেজা আর তাঁবুর ভেতরে নিচু হয়ে ঢোকার সময় একবার হোঁচট খেল আর কুর্নিশ করার সময় আরেকবার–সম্ভবত সে এখনও ঘুমের ঘোরে রয়েছে।
আওরঙ্গজেব বললেন, আমি আমাদের পরবর্তী অভিযানের কথা ভাবছিলাম আর তোমার পরামর্শ দরকার।
সে বললো, হ্যাঁ, জাঁহাপনা…আমি আমার যথাসাধ্য চেষ্টা করবো।’ তার কথা জড়িয়ে যাচ্ছিল আর একটু পর পর থেমে যাচ্ছিল। একহাত দিয়ে ভ্রূ থেকে ঘাম মুছলো।
‘গোলকুন্ডি সেনাবাহিনীর অন্যান্য সেনাপতিদের সম্পর্কে তুমি কতটুকু জান, বিশেষত রশিদ খানের চাচাত ভাইয়ের সম্পর্কে?
‘জাহাপনা…হা…জাহাপনা…ওদের সেনাপতি…’ ওয়াজিম খানের মনে হল মাথা ঘুরাচ্ছিল আর সে টলছিল। হঠাৎ আওরঙ্গজেব বিষয়টা বুঝতে পারলেন, তারপর তার কাছে একটু এগিয়ে গেলেন। হ্যাঁ সারা গায়ে মদের গন্ধ ভুর ভুর করছে।
‘ওয়াজিম খান, তুমি মদ খেয়েছ?”
ওয়াজিম খান প্রথমে বললো, না, জাঁহাপনা…’ তারপর যখন তার মাথায় একথাটা ঢুকলো এটা সে অস্বীকার করতে পারবে না, তখন সে বললো, আমি দুঃখিত…জাহাপনা…হ্যাঁ, আমাদের এই মহান বিজয় উৎসবে মেতে উঠে… আমি জাহাপনা, ক্ষমা করুন।
‘সত্যি করে বল তুমি কি প্রায়ই মদ খাও কি-না? আর কেউ না হলেও তুমি নিশ্চয়ই জান তথ্য পাওয়ার আমার কত উৎস আছে, কাজেই সত্যি কথাটা বল।’
মাঝে মাঝে জাঁহাপনা,…সপ্তাহে একবারের বেশি না, শপথ করে বলছি। যখন বেশি চিন্তা করি, তখন এটা মনের চাপ কমিয়ে দেয়। আমার কয়েকটা ভালো পরিকল্পনা…’ ওয়াজিম খানের কথা থেমে গেল।
‘কি করে তুমি এটা পারলে! মদ পান করার ব্যাপারে আমার কঠোর নিষেধ অমান্য করলে? তুমি কী সমস্ত ব্যাপারে আমার অনুগত নও?
‘আমি আপনার একান্ত অনুগত আর বিশ্বস্ত, জাঁহাপনা…আপনার মনে আছে ঐ আফগান লোকটিকে আমি খুঁজে বের করেছি…দয়া করে…’।
আওরঙ্গজেব অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে পেছন দিকে ঘুরলেন। ওয়াজিম খান যদি ব্যক্তিগত জীবনে তাঁর নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে থাকে তাহলে রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে কিভাবে তাকে বিশ্বাস করা যায়? দুষ্টক্ষতের মতো অবিশ্বস্ততা আর অবাধ্যতা একবার মানুষের মনে ঢুকলে এটা দ্রুত সবাঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে।
‘তোমার এই অসদাচরণের শাস্তি হিসেবে পুরো দরবারের সামনে তোমাকে পাঁচবার চাবুকের ঘা খেতে হবে। তারপর তুমি তোমার জায়গিরে তোমার পরিবারের কাছে ফিরে গিয়ে আমি আর না বলা পর্যন্ত সেখানেই থাকবে।
না, জাঁহাপনা…আমি মিনতি করছি দয়া করুন, না…! আমার মান সম্মানের কি হবে…?
‘আমার নিষেধ অমান্য করার আগে একথা তোমার ভাবা উচিত ছিল। তাবুর বাইরে পাহারারত যে দীর্ঘদেহী প্রহরীদেরকে তিনি ডেকে এনেছিলেন, মোটাসোটা টলমল করতে থাকা ওয়াজিম খানকে ওরা তবু থেকে বের করে নিয়ে যেতেই আওরঙ্গজেব তার শোয়ার ঘরের দিকে ফিরলেন। কেন তিনি কাউকে বিশ্বাস করতে পারছেন না? কেন তার অতি ঘনিষ্ঠরা কোনো প্রশ্ন না করে শুধু তার নির্দেশ মানছে না আর বুঝতে পারছে না যে, তাদেরসহ কোনটা তার সাম্রাজ্য, আর সমস্ত প্রজাদের জন্য ভাল তিনি তা ভাল করেই জানেন। এটা ওদের দায়িত্ব। কি পাপ তিনি করেছিলেন যে, মাঝে মাঝে এরকম খারাপ ব্যাপার তার সাথে হচ্ছে?
১৯. জল্লাদ
কামরান বেগ হাঁপাতে হাঁপাতে বললো, জাহাপনা, ক্ষমা করবেন অসময়ে আপনাকে ঘুম থেকে উঠাবার জন্য কোরচিকে বলেছি বলে। তবে আমার কাছে যে খবরটি আছে তার জন্য আর দেরি করা যায় না। আমার দুজন চর সম্ভাজিকে খুঁজে পেয়েছে–সে সংঘামেশ্বরে আছে!’ আওরঙ্গজেব তার গুপ্তচর প্রধানকে এরকম উত্তেজিত হতে কখনও দেখেন নি।
‘সংঘামেশ্বর? এটা কী? কোনো দুর্গ?
না জাহাপনা। শাস্ত্রি আর সোনভি নদী যেখানে মিশেছে, সেখানে একটি প্রমোদ উদ্যানের মাঝে এটি একটি প্রাসাদ। জায়গাটা বেশ ছোট আর তেমন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও নেই। আমার লোকেরা এটা ঘুরে দেখে এসেছে। জায়গাটির মালিক কবি-কুলেশ নামে সম্ভাজির একজন সেনাপতি। সে সম্ভাজিকে অতিথি হিসেবে সেখানে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। আমার লোকেরা চুড়িফিতার ফেরিওয়ালা হিসেবে সেখানে কয়েকদিন কাটিয়েছে। ওরা সেখান থেকে শুনে এসেছে, সম্ভাজি সেখানে কবি-কুলেশের সাথে আমোদ-ফুর্তি করছে। তার সাথে কয়েকজন মাত্র সেনা রয়েছে।’
