ওরা এখন গম ক্ষেতের মধ্য দিয়ে দ্রুত ছুটছিল। শেষ মাথায় প্রায় ছয় ফুট উঁচু একটা পাথরের দেয়ালের কাছে পৌঁছল। ছয়জনকে পেছনে পাহারায় রেখে কামরান বেগ বাকি লোকদেরকে দেয়াল টপকাতে নির্দেশ দিল। দেয়াল টপকে লাফ দিয়ে ওরা নিচে নরম ঘাসের জমিনে পড়তেই নাকে ফুলের সুঘ্রাণ পেল। কামরান বেগের নেতৃত্বে ওরা সতর্কভাবে চুপিসারে সামনেই একটি গোলাপবাগানের দিকে এগোল। কামরান সন্তাজির কনুই ধরে সামনে হাঁটছিল। গায়ে কাঁটার খোঁচা খেতে খেতে ওরা গোলাপ বাগান পার হয়ে একটি খোলা জায়গায় পৌঁছল। এখানে একটি বড় আর চারটি ছোট আকারের মার্বেল পাথরের ফোয়ারার পানিতে চাঁদের আলোয় রূপালি রঙ ছড়াচ্ছিল। ঘন গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে কামরান বেগ উঠেছে দেখতে পেল– সামনে অন্ধকার ভেদ করে ছোট ছোট আলোর ফোঁটা ফুটে রয়েছে। এখানে সেখানে একটা দুটো–খুব বেশি নয়। আস্তে শিস দিয়ে সে ওদেরকে থামতে বলে সন্তাজিকে জিজ্ঞেস করলো, ‘ঐ আলাগুলো কী? পাহারাদারদের বেড়ার আলো?’
না, তা মনে হয় না। জনাব। এই বাগানে কয়েকটি ঘর আছে যেখানে কবি কুলেশের লোকরা মাঝে মাঝে এসে নর্তকীদের নাচ-গান উপভোগ করে। রাতে চাকরেরা এখানে মশাল আর মোমবাতি জ্বালিয়ে দিয়ে যায়, যেরকম সমস্ত প্রাসাদে, মার্বেল চত্বরসহ সবজায়গায় ওরা জ্বালায়। এই আলোগুলো নদীর পানির উপর প্রতিফলিত হয়ে চিকচিক করে যেন, এর উপর হীরা। ভাসছে।
কামরান বেগ মুখে ভেংচি কাটলো। এই কবি-কুলেশ মনে হয় ভাবছে সে পৃথিবীতে একটি স্বর্গ বানিয়ে সেখানে থাকছে– যেরকম গোলকুন্ডার শাসকও ভেবেছিল। আর আল্লাহ চাহে তো তারও সে ভুল শীঘ্রই ভেঙ্গে যাবে। সন্তাজি তুমি আমাদেরকে বাগানের মধ্য দিয়ে দ্রুততম পথ দেখিয়ে প্রাসাদে নিয়ে চল, তবে ঐ প্রমোদ ঘরগুলো এড়িয়ে চল।
তরুণটি মাথা নেড়ে ডান দিকে ইঙ্গিত করলো। এরপর কামরান বেগ দুবার শিস দিয়ে ইঙ্গিত দিতেই মোগল দলটি আবার সামনে এগোল। ঠিকই ওদের বামদিকেই কোনো এক জায়গা থেকে গলার আওয়াজ পাওয়া গেল। মাথা ঘুরিয়ে কামরান বেগ এবার ঝোঁপের মাথার কিনারায় ছোট ছোট থামের মাথা দেখতে পেল। এর চারপাশে মাটিতে জ্বলন্ত মশাল পুঁতে রাখা হয়েছে। সে সেতারের টুং টাং আর তার সাথে তবলার ছন্দময় বোল শুনতে পেল। এই লোকগুলোর কোনো পরিকল্পনাই নেই। যদি এটা মোগল এলাকা হত, তাহলে কোনো অবাঞ্চিত প্রবেশকারী বিনাবাধায় কোনোভাবেই দেয়ালের কাছে পৌঁছতে পারতো না, আর দেয়াল টপকে প্রাসাদের আঙিনায় ঢোকা তো দূরের কথা।
তবে এত আত্মতুষ্টি লাভ করাটা একটা ভুল হবে। সম্ভাজি হয়তো ফুর্তি করতে ভালোবাসেন, তবে তিনি এত বোকা নন। আর কবি-কুলেশও নয়, একজন সেনাপতি হিসেবে চতুর্দিকে যার বেশ সুখ্যাতি রয়েছে। মোগলদের গোপন হামলার খবর ওদের কানেও পৌঁছতে পারে, কেননা শুধু আওরঙ্গজেবেরই যে গুপ্তচর আর খোঁজ-খবর নেওয়ার মতো লোক আছে তা নয়। এই নিস্তব্ধতা হয়তো একটা ফাঁদ হতে পারে, মোগলদেরকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে এখানে এনে তাদেরকে ধ্বংস করার একটা ফন্দি। সন্তাজিকে কাছাকাছি রেখে কামরান বেগ তার লোকদেরকে দ্রুত চলতে বললো আর একটু পরই সেতারের আওয়াজ মিলিয়ে যেতে শুরু করলো।
নিচু হয়ে চুপিসারে চলতে চলতে আরো কিছু সুগন্ধি ফুলগাছের জঙ্গলের মধ্য দিয়ে এগিয়ে ওরা ঠিক সামনেই একটি নিচু সাদা দালান দেখতে পেল। এটাই নিশ্চয়ই সংঘামেশ্বরের প্রাসাদ। এর ছাদে কয়েক ফুট পর পর পাত্রে আগুন জ্বেলে তার শিখায় রাতের আকাশ আলোকিত করে রাখা হয়েছে। এর দোতলার জানালাগুলো থেকে আরো আলো দেখা যাচ্ছে। এছাড়া মূল প্রবেশ পথের খোলা দরজার ভেতর থেকে আলো এসে দালানের বাইরের অর্ধবৃত্তকার উঠানেও কমলা রঙের আলোর আভা দেখা যাচ্ছে। কামরান বেগ আবার তার লোকদেরকে থামতে ইশারা করলো তারপর মাটিতে বসে পড়তে ইঙ্গিত করলো। চাঁদের অবস্থান দেখে আন্দাজ করা যায়, রাত বেশি হয়নি–বড় জোর রাত নয়টা। বেশি তাড়াহুড়া করার দরকার নেই। শীঘ্রই তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সে মূল ফটকের পাশে দুজন মারাঠি প্রহরী দেখতে পেল। গাদা বন্দুক দেয়ালে ঠেস দিয়ে রেখে ওরা মাটিতে আসনপেতে বসে কথা বলছিল। কয়েকমিনিট পর পরস্পরের কাঁধে হাত রেখে দুজন লোক প্রাসাদের ভেতর থেকে ধীরে ধীরে বের হয়ে এসে একজন প্রহরীকে কিছু একটা বলতেই লোকটি জোরে হেসে উঠলো। লোকদুটো আবার ভেতরে চলে গেল। কিছুক্ষণ আর কিছুই ঘটলো না। তারপর একজন প্রহরী উঠে তার সঙ্গীর দিকে পেছন ফিরে ছর ছর শব্দ করে প্রস্রাব করে আবার ফিরে গিয়ে আসনপিড়ি হয়ে বসে পড়লো।
তারপর অন্ধকারে কোথা থেকে প্রাসাদের পেছনের ডান দিক থেকে নুড়িপাথরের পথ দিয়ে লোহার চাকাওয়ালা গাড়ি আসার ঘর্ঘর শব্দ শোনা গেল। সেদিকে উঁকি দিয়ে কামরান বেগ দেখতে পেল, প্রাসাদের এক কোণ ঘুরে ছয়টি বলদ একটি বড় গরুর গাড়ি টেনে আনছে। দেখে মনে হচ্ছে গাড়িটি নদীর দিক থেকে এসেছে। গাড়োয়ান লম্বা চাবুক হাঁকাতেই, পিপা আর বস্তা বোঝাই গাড়িটি প্রহরীদের পাশ কাটিয়ে ফটক দিয়ে প্রাসাদের ভেতরে ঢুকে গেল। প্রহরীরা একবারও এর দিকে ফিরে তাকাল না। কয়েকমিনিট পর দ্বিতীয় আরেকটি মালবোঝাই গরুরগাড়ি অন্ধকার থেকে উদয় হল আর একইভাবে প্রথম গাড়িটিকে অনুসরণ করে ফটকের মধ্য দিয়ে প্রাসাদের ভেতরে চলে গেল।
