উমর আলি উপর থেকে নিচে তার লোকদের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বললো, দরজাগুলো খুলে দাও! যে গোলকন্ডিরা ফিরে আসছে তাদের উদ্দেশ্যে গুলি ছোঁড়। যেভাবে হোক আমাদের অশ্বারোহী সেনাদের এদিকে দৃষ্টি আকর্ষণ কর। বুরুজের মধ্য দিয়ে ওদেরকে ভেতরের উঠানে ঢোকার সুযোগ করে দাও। আর আমাদের পতাকাটা এনে দাও আমাকে। একজন সৈনিক তার কালো পোশাকের নিচে একটা পতাকা পেঁচিয়ে নিয়েছিল। সে সিঁড়ি বেয়ে উপরে ছুটে গেল তারপর সে আর উমর আলি মিলে দেয়ালের গাদা বন্দুক ছোঁড়ার ছিদ্র দিয়ে পতাকাটা দোলাতে লাগলো।
শীঘ্রই মোগল সেনারা ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফ দিয়ে নেমে বুরুজের দিকে ছুটলো। পেছন ফিরে বাইরের দেয়ালের ফাটলের দিকে তাকিয়ে উমর আলি দেখতে পেল লড়াই প্রায় থেমে গেছে। পদাতিক আর অরাহী মোগল সেনারা দলে দলে আসছিল। বেশিরভাগই ভেতরের বুরুজের দিকে চেপে এল। কেউ কেউ মাটিতে পড়ে থাকা তাদের সহযোদ্ধাদের দিকে তাকাল, কেউ বেঁচে আছে কি-না দেখে তার ক্ষতস্থানে পট্টি বেঁধে তাদেরকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করলো। তারপর আরেকদল অশ্বারোহী দেয়ালের ফাটলের কাছে এল। এতদূর থেকেও সে তাদের কয়েকজনকে চিনতে পারলো, ওরা তার অধীনস্থ সম্রাটের দেহরক্ষীদল। তাদের মাঝখানে স্বয়ং সম্রাটও রয়েছেন। তিনি একটি কালো ঘোড়ার পিঠে চড়ে এসেছেন, তার বুকের বর্ম চকচক করছিল। প্রায় সত্তর বছর বয়স হলেও তিনি যুদ্ধের এই মুহূর্তে তার বিজয়ের মুহূর্তে তার সৈন্যদের মাঝে আসতে অধীর ছিলেন। সম্রাটকে স্বাগত জানিয়ে দুর্গের ভেতরে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য উমর আলি দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে নেমে ছুটে এগোল।
আধঘণ্টা পর উমর আলি আর তার চারপাশে বাদবাকি দেহরক্ষীদলের সদস্যদের নিয়ে আওরঙ্গজেব একটি বড় পাথরের দালানে ঢুকলেন। সদ্য ধৃত বন্দীরা বলেছে এটা আদিল হাসানের ব্যক্তিগত আবাসস্থল আর লড়াই যখন তার সেনাদলের বিরুদ্ধে যেতে শুরু করেছে তখন তিনি সেখানে আশ্রয় নিয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে গোলকুন্ডি সেনারা প্রায় সবাই অস্ত্র ফেলে দিয়ে মোগলদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। মোগল সৈন্যরা তাদের হাত পিছমোরা করে বেঁধে দলে দলে ভাগ করে মাটিতে উবু করে বসিয়ে রাখছিল।
আওরঙ্গজেবের দেহরক্ষীদলের প্রথম সারিটি যখন একটি মার্বেল পাথরের স্তম্ভশোভিত উঠান পার হচ্ছিল তখন দুটি গাদা বন্দুকের গুলির আওয়াজ শোনা গেল। একজন দেহরক্ষী মাটিতে পড়ে গিয়ে তার পায়ের ডিম চেপে ধরলো, সেখানে একটি ক্ষত থেকে রক্ত ঝরে পড়তে লাগলো। তার সঙ্গীরা থামগুলোর পিছনে ছুটে গেল যেখান থেকে বন্দুকের গুলি ছোঁড়া হয়েছিল। থামের আড়াল থেকে ভালুকের মতো আকৃতির একজন গোলকুন্ডি হাতের গাদা বন্দুকটির নল ধরে একটি লাঠির মতো মাথার উপর ঘুরাতে ঘুরাতে ছুটে এল। তার প্রথম আঘাতে সামনের মোগল সেনাটির মাথা ভেঙ্গে চৌচির হয়ে যেত, যদি সে সময়মতো মাথা না সরাত। লোকটি আবার আঘাত করার আগেই আরেকজন দেহরক্ষী তার তরোয়ালের এক কোপে লোকটির মাথা কেটে ধর থেকে প্রায় আলাদা করে ফেললো।
ইতোমধ্যে দ্বিতীয় গোলকুন্ডি সেনাটি তার বন্দুক ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে পেছনের দিকে একটি পর্দায় ঢাকা দরজার ভেতর দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। পর্দার পেছন থেকে গানবাজনার আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল। ঐ লোকটিকে অনুসরণ করে ভেতরে ঢুকতেই আওরঙ্গজেব আর তার দেহরক্ষীরা একটি অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পেলেন। এমব্রয়ডারি করা দুধসাদা রঙের আলখাল্লা আর মাথায় ঝলমলে হীরকখচিত লাল পাগড়িপরা একজন লোক কামরার মাঝখানে একটি সোনার সিংহাসনে বসে একটি রূপার ট্রে থেকে মিষ্টি তুলে আয়েস করে খাচ্ছিলেন। তার চারপাশে ঘিরে বিশজন নর্তকি পেছনে দাঁড়ান পাঁচজনের একটি বাদকদলের সাথে তাল মিলিয়ে ঘুরে ঘুরে গান গাইছিল। ওদের চুলে উঁইফুল আর পরনে পাতলা মসলিনের পোশাক। সিংহাসনে বসা লোকটি আদিল হাসান ছাড়া আর কেউ নয়। আওরঙ্গজেব তার দেহরক্ষীদের মাঝ দিয়ে তার দিকে এগোলেন। তিনি কিছু বলার আগেই আদিল হাসান মুখে বাঁকা হাসি নিয়ে বললেন, “আমার ধারণা আপনি নিশ্চয়ই সম্রাট আওরঙ্গজেব। আসুন আমার সাথে একটু আমোদ ফুর্তিতে যোগ দিন। শেষ সময়টুকু পর্যন্ত আমি উপভোগ করে নিতে চাই আর তারপর সেই আনন্দময় স্মৃতি আমার মনে সংরক্ষণ করে রাখবো। তারপর আমার ভাগ্যে আপনি যা রেখেছেন তা সহ্য করার সময় যাতে তা আমার মনে সান্ত্বনা হিসেবে কাজ করে। একথা বলে তিনি তার আংটিপরা হাত দিয়ে ইশারা করতেই যন্ত্রীরা তাদের বাজনা দ্রুত লয়ে বাজাতে শুরু করলো। আর নতকীরা সেই তালে আরো জোরে ঘুরে ঘুরে নাচতে লাগলো, তাদের খাটো জামা দেহের চারদিকে উড়তে লাগলো।
আওরঙ্গজেব গর্জে উঠলেন, গ্রেপ্তার কর এই অধঃপতিতদের। মাটির নিচে সবচেয়ে গভীর কারাগারে এদের বন্দী করে রাখ।
সেদিন সন্ধ্যায় সূর্যাস্তের পর নামাজ শেষে আওরঙ্গজেব হেঁটে বেলকনিতে এসে ওয়াজিম খানের পাশে এসে দাঁড়িয়ে দেখলেন, সে নিচে মোগলদের বিজয় উৎসব দেখছে। তিনি বললেন, “আমরা এখন গর্ব করতে পারি ওয়াজিম খান, মোগল সাম্রাজ্য এখন সবচেয়ে বেশি বিস্তৃত হয়েছে। আর সামান্য কিছু গোলকুন্ডি সেনা আর মারাঠিদের দমন করতে হবে। তারপর আমি সেনাবাহিনী নিয়ে উত্তরে ফিরে যেতে পারি। তারপর ভূমি সংক্রান্ত প্রশাসনের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। আমার অবর্তমানে সেখানে যে দুর্নীতি হচ্ছে আর অর্থের জন্য অসৎ কাজ করার প্রবণতার কারণে কোষাগার শূন্য হচ্ছে আর কর্তৃত্ব বিনষ্ট হচ্ছে, তা সমূলে উপড়ে ফেলতে হবে।
