আফগান সেনাপতি জিজ্ঞেস করলো, খুব ভাল। তবে পলিতার রশিটি কি যথেষ্ট লম্বা, যাতে বিস্ফোরণের সাথে সাথে আমরা নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে পারি?
‘হ্যাঁ, তা আছে। তবে এখান থেকে আমরা কোনদিকে যাব সেটা আপনাকে দেখাতে হবে।
রশিদ খান মাথা নাড়তেই উমর আলি তার লোকদেরকে পলিতায় আগুন লাগাতে ইশারা করলো। চকমকি পাথরের বাক্স থেকে আগুনের স্ফুলিঙ্গ বের হতেই চারটা পলিতায় হিস হিস করে উঠলো, তবে পঞ্চম চকমকি পাথরের বাক্সটি যে লোকটি জ্বালাচ্ছিল সেটা তার হাত ফস্কে অন্ধকারে মেঝেতে পড়ে গেল। সে বাক্সটা খোঁজার জন্য অন্ধকার মেঝেতে হাতড়াতে লাগলো।
উমর আলি বললো, “তোমরা সবাই রশিদ খানকে অনুসরণ কর। আমি কাজটা শেষ করে আসছি। সাথে সাথে সেনাপতি অন্যদেরকে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরের দিকে নিয়ে চললো। উমর আলি নিচু হয়ে চকমকি পাথরের বাক্সটি খুঁজতে শুরু করতেই শুনতে পেল উপরের সিঁড়ির দরজার খিল টেনে খোলা হচ্ছে। সে চকমকির বাক্সটি খুঁজে পেয়েই পঞ্চম পলিতায় আগুন জ্বালিয়ে দিল। অন্য পলিতাগুলো পুড়তে পুড়তে বারুদের পিপাগুলোর কাছাকাছি পৌঁছে গেছে, পঞ্চমটি ঠিকমত জ্বলছে নিশ্চিত হয়ে সে সিঁড়ির দুটো করে ধাপ পার হয়ে উপরের দরজার দিকে ছুটলো। উপরে উঠে খোলা দরজার কাছে পৌঁছতেই তাজা বাতাস তার দিকে ভেসে এল। দরজা থেকে বের হয়ে সে দ্রুত দুই সারি গোলাকার পাথরের বাঁধের মাঝখানে সমতল জায়গায় এল। তারপর দেখলো কয়েকটি পাথরের আড়াল থেকে রশিদ খান লণ্ঠন দিয়ে তাকে ইশারা করছে, সে সেদিকে ছুটে গেল। সেখানে পৌঁছে ঝাঁপ দিয়ে মাটিতে শুয়ে পড়তেই বারুদের পিপায় বিস্ফোরণ ঘটলো। বুরুজটি প্রথমে একটা মাতালের মতো এদিক সেদিক টলতে টলতে তারপর প্রচণ্ড শব্দে ভেঙ্গে পড়লো। বালু আর পাথরের টুকরার একটা জঞ্জালে পরিণত হল। একটা বড় পাথরের টুকরা উমর আলির কাছেই ধপ করে মাটিতে পড়লো, তবে রশিদ খান ইতোমধ্যেই উঠে দাঁড়িয়ে মোগলদেরকে তার সাথে ভেতরের দেয়ালের বেষ্টনির দিকে যাওয়ার জন্য হাত নেড়ে ইশারা করলো।
উমর আলি আর তার লোকজন ছুটতে শুরু করতেই দুর্গের বাইরের আর ভেতরের দুইদিকের বুরুজের ছাদ থেকে গাদা বন্দুক আর কামানের গোলা বর্ষণ শুরু হল। তবে মনে হয় গোলাগুলি ওদের দিকে হচ্ছে না, বাইরে থেকে মোগল সৈন্যরা বুরুজের ফাটলের দিকে ছুটে আসছে দেখে ওরা সেদিকে গুলি বর্ষণ করছিল। উমর আলি তার দলনিয়ে নিরাপদে ভেতরের দেয়ালের কাছে পৌঁছে দেয়ালের সাথে গা ঘেসে দাঁড়াল। রশিদ খান ফিস ফিস করে উমর আলিকে বললো, দেয়ালে ঘুরলেই এখান থেকে বাম দিকে তিনশো ফুট সামনে একটা বুরুজের মধ্যে একটা প্রহরা কক্ষ আছে। আমি সেখানে একা যাব, তারপর যে রক্ষীরা সেখানে আছে তাদেরকে বলবো সেখান থেকে বের হয়ে বাইরের দেয়ালের প্রতিরক্ষার জন্য ছুটে যেতে। কেউ যদি যেতে অমান্য করে কিংবা বাইরে ঘোরাফেরা করে তাকে মেরে ফেলতে হবে। প্রহরীকক্ষে ঢোকার পর ভেতর থেকে ভালোভাবে সবদিক বন্ধ করে আপনাদের মূল বাহিনী আসা পর্যন্ত আপনাদেরকে অপেক্ষা করতে হবে।
উমর আলি মাথা নেড়ে বললো, ঠিক আছে বুঝেছি।’ রশিদ খান চলে যেতেই সে ভাবলো এই আফগান লোকটি কিভাবে পুরোপুরি তার আনুগত্য পাল্টে ফেললো। যে সেনাদের সে নেতৃত্ব দিয়েছে আর নিঃসন্দেহে যারা তাকে বিশ্বাস করে কিভাবে এত সহজভাবে তাকে মেরে ফেলার কথা বলতে পারলো। সে নিজে কখনও এটা করতে পারতো না…আফগান লোকটির কোনো বিবেক নেই আর সে অত্যন্ত স্বার্থপর। যাইহোক সে তার নতুন প্রভু-সম্রাটের জন্য যা যা করার জন্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তা সবই করছে, কাজেই সে আর তার লোকজন অবশ্যই তার নির্দেশ অনুযায়ীই কাজ করবে। কয়েকমিনিট পর উমর আলি দেখলো আফগান সেনাপতি আরেকটি লণ্ঠন হাতে নিয়ে ওদেরকে সেদিকে এগোতে ইশারা করছে। তখনও দেয়াল ঘেঁসে ওরা অস্ত্র হাতে নিয়ে বুরুজের বাঁক ঘুরে চুপিসারে এগোল। কেউ প্রতিরোধ করলো না আর দ্রুত ছোট পাহারা কক্ষে ঢুকে ওরা দেখলো রশিদ খান একা সেখানে রয়েছে। এখানে আগে যারা ছিল তাদের ব্যবহৃত কয়েকটি গুটিয়ে রাখা বিছানা, মোটা কম্বল আর একটা লম্বা লোহার টেবিলের উপর আধখাওয়া রুটির টুকরা পড়ে রয়েছে। রশিদ খানের নির্দেশে প্রহরীরা নিশ্চয়ই লড়াই করার জন্য সাথে সাথে ছুটে চলে গেছে।
উমর আলি তার লোকদেরকে বুরুজের কামরায় ঢোকার সমস্ত পথ বন্ধ করতে নির্দেশ দিল। ওরা সাথে সাথে কাজে লেগে পড়লো। টেবিল উল্টে বাইরের দরজায় ঠেস দিয়ে দাঁড় করিয়ে খিল আটকে দিল। তারপর সে উপরে ছাদে উঠে দেয়ালের গায়ে গাদা বন্দুক ছোঁড়ার জন্য বড় একটা ছিদ্রের ফাঁক দিয়ে বাইরের দেয়ালের ফাটলের দিকে তাকাল। ভোরের ফুটি ফুটি আলোয় সে দেখতে পেল মোগল পদাতিক সেনারা পতাকা উড়িয়ে জঞ্জালের উপর দিয়ে এদিকে আসছে। গোলকুন্ডিরা তখনও প্রাণপণে লড়ে চলেছে। তবে ধীরে ধীরে ওরা পিছু হটতে বাধ্য হচ্ছে।
তারপর মোগল অশ্বারোহীর একটি বড় দল দেয়ালের ফাটলের কাছে ছুটে এল। জঞ্জাল টপকে পার হতে গিয়ে একটা ঘোড়া আরোহীসহ ঘুরে পড়লো। আরেকটি ঘোড়া লাফ দিতে গিয়ে তার আরোহীকে পিঠ থেকে ফেলে দিল। তবে বেশ কিছু ক্ষয়ক্ষতি হলেও শীঘ্রই অনেক মোগল অশ্বারোহী জঞ্জাল পার হয়ে ভেতরে ঢুকলো। ভেতরে ঢুকে ওরা ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে পেছন দিক থেকে গোলকুন্ডিদের উপর হামলা করলো। ঘোড়ার পিঠ থেকে নিচু হয়ে ওরা তরোয়াল দিয়ে ওদের পেছন দিকে কোপাতে শুরু করলো। দুই দিক থেকে আক্রান্ত হয়ে গোলকুন্ডিরা কোনোরকমে পেছন দিকে ভেতরের বুরুজের দিকে ছুটতে শুরু করলো, যেখানে উমর আলি দাঁড়িয়ে ছিল। মোগল অশ্বারোহীরাও তাদেরকে অনুসরণ করলো। কয়েকজন অবশ্য গোলকুন্ডিদের বুরুজের ছাদ থেকে ছোঁড়া গাদা বন্দুকের গুলিতে আহত হয়ে ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে গেল।
