*
ভোরের একটু আগে যখন বাদুড়েরা নিচে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তখন আওরঙ্গজেবের দেহরক্ষী দলের ত্রিশজন সদস্য, তাদের দলপতি উমর আলির নেতৃত্বে কালো পোশাক পরে আর মুখে কালি মেখে মোগল সীমানা থেকে বের হয়ে গোলকুন্ডা দুর্গের দিকে চুপিসারে রওয়ানা দিল। কেউ কোনো ধাতব বর্ম কিংবা শিকলের বর্মও পরলো না এই ভয়ে যে, এর টুংটাং আওয়াজে ওদের অস্তিত্ব প্রকাশ হয়ে যেতে পারে, বিশেষত কেউ যদি মাটিতে পড়ে যায়। ছোট ছোট বারুদের পিপার ওজনে পাঁচজন নিচু হয়ে হাঁটছিল। গোলকুন্ডা দুর্গের মূল ফটকের দিকে গিয়ে ওরা পূর্বদিকের একটি বুরুজের দিকে চলছিল। আফগান সেনাপতি সেখানে মাটির কাছে গোড়ায় লোহার শিকের ছোট দরজা দিয়ে ওদেরকে ভেতরে ঢোকার ব্যবস্থা করার কথা বলেছিলেন। সবকিছু প্রস্তুত হওয়ার পর সে দরজাটি সামান্য খুলে একটি লণ্ঠন দিয়ে ওদেরকে পথ দেখাবে।
ত্রিশজন লোক এক সারিতে নিঃশব্দে হেঁটে চললো। কেবল মাঝে মাঝে অন্ধকারে একটা পাথর কিংবা মরা গাছের গুঁড়িতে হোঁচট খাচ্ছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওরা পূর্বদিকের বুরুজের কাছাকাছি পৌঁছল। এখানে পাঁচ-ছয়জন মোগল শ্রমিকের মৃতদেহ পচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছিল। গত সপ্তাহে বুরুজের প্রাকার থেকে গোলকুন্ডি বরকন্দাজরা গুলি ছুঁড়ে এদেরকে মেরেছিল। ওরা মাটি খুঁড়ে একটি সুরঙ্গ খুঁজে বের করার ব্যর্থ চেষ্টা করছিল। গুজব ছিল যে এখান দিয়েই গোলকুন্ডা দুর্গে রসদ সরবরাহ করা হত। অন্ধকারে শবদেহ থেকে মাংস ছিঁড়ে খাচ্ছিল একটি নেড়ি কুকুর। ওদেরকে দেখে হঠাৎ কুকুরটি দাঁত খিঁচিয়ে তেড়ে এসে একজন সৈনিকের ঊরুতে দাঁত বসিয়ে দিল। অতিকষ্টে চিৎকার দমন করে সে একটা ছুরি বের করে কুকুরটির ঘাড়ে দুইবার আঘাত করতেই কুকুরটি সাথে সাথে মারা গেল। তারপর অন্যান্য প্রহরীর মতো সেও মাটিতে শুয়ে পড়লো। যদি কেউ দুর্গের দেয়াল থেকে কুকুরটার গর্জন কিংবা মরণ আর্তনাদ শুনে থাকে সে ভয়ে। তবে ওরা এখনও দুর্গ থেকে বেশ দূরে রয়েছে।
উমর আলি সাবধানে উঠে দাঁড়াল, তারপর তার লোকদেরকে অনুসরণ করতে ইশারা করে আবার চুপিসারে সামনে এগোতে লাগলো। দিগন্তে ভোরের বেগুনি আলোর ছোঁয়া দেখা যাচ্ছে। ওরা এবার রুক্ষ আর কঠিন গ্র্যানাইট পাথরের উপর উঠে এসেছে, যার উপর দুর্গটি নির্মাণ করা হয়েছিল। উমর আলি দুর্গের দিকে তাকাল যদি কোনো লণ্ঠনের ম্লান আলো দেখা যায়, যা ওদেরকে দুর্গে ঢোকার পথ দেখাবে। কিন্তু কিছুই দেখা গেল না। হয়তো সম্রাট ঠিকই বলেছিলেন যে, ওদেরকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে একটা ফাঁদে ফেলার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে ওদের উপর আক্রমণ করার আগে গোলকুন্ডিরা কি ওদেরকে ভেতরে ঢুকতে দেবে না?
তারপর প্রায় একশো গজ দূরে সবচেয়ে উঁচু বুরুজের নিচে একটা আলো দেখা গেল। বাকি লোকদেরকে সাবধান হতে বলে উমর আলি বেশ দ্রুত পাথরের উপর দিয়ে আলোটার দিকে ছুটলো। দেয়ালের ছায়ার কাছে পৌঁছতেই তার নাকে একটা প্রচণ্ড দুর্গন্ধ এল, আর পা ডুবে গেল নরম আঠাল পদার্থে– সম্ভবত এর উপরে একটি পায়খানা রয়েছে। পা উঠিয়ে সে আবার দ্রুত আলোর কাছে অর্ধেক খোলা দরজাটির কাছে গেল, চার ফুটের বেশি উঁচু হবে না। সে কাছে পৌঁছতেই দরজাটা পুরোপুরি খুলে গেল। তরোয়ালের বাটে হাত রেখে সে মাথা নিচু করে ভেতরে ঢুকে দেখলো ছোট একটি ভূগর্ভস্থ কামরার মতো জায়গায় একজন লোক দাঁড়িয়ে রয়েছে। বাজপাখির মতো বাকা নাকের লোকটির হাতে একটি বড় লণ্ঠন।
লোকটি বললো, আমি রশিদ খান।
আর আমি উমর আলি, সম্রাট আওরঙ্গজেবের দেহরক্ষী দলের প্রধান। আপনি একা?’
‘হ্যাঁ। আর আপনিও তাই। আপনার বাকি লোক কোথায়?
‘ওরা কাছেই আছে। আমি দেখতে এসেছি যে এটা একটা ফাঁদ কি-না।
‘আমি নিশ্চয়তা দিচ্ছি সেরকম কিছু নেই। তবে আমার কথা না শুনে আপনি নিজে লণ্ঠন নিয়ে ভালোমতো দেখে আসুন।
একহাতে লণ্ঠনটা উঁচু করে ধরে অন্য হাত তরোয়ালের বাটে রেখে, উমর আলি দ্রুত জানালাহীন গোলাকার কামরাটির চতুর্দিক অন্ধকারে উঁকি দিয়ে ঘুরে দেখলো। একবার একটা ইঁদুর তার সামনে দিয়ে ছুটে যেতেই সে চমকে উঠলো, তবে কামরাটি খালি, কিছুই নেই, এমনকি একটা আসবাবও নেই যার পেছন থেকে কোনো হামলাকারী লুকিয়ে থাকতে পারে। সে কামরার ভেতর থেকে বের হবার সময় পাথরের সিঁড়ির কয়েকটি ধাপ বেয়ে উঠে দেখলো উপরে একটি শক্ত দরজা ভেতরের দিক থেকে খিল আটকে রাখা আছে, তার মানে বাইরে থেকে কেউ ভেতরে আসতে পারবে না। পেছন ফিরে রশিদ খানের দিকে তাকিয়ে সে বললো, আমি সন্তুষ্ট। আমি আমার লোকদেরকে এখানে আসার জন্য সংকেত দেব। ওদের সাথে আমার কথা হয়েছে, আমি দ্রুত তিনবার দরজাটা খুলবো আর বন্ধ করবো যাতে আলোটা তিনবার সংকেত দেয়।
একটু পরই উমর আলির সঙ্গীরা চলে এল। উমর আলি জিজ্ঞেস করলো, বারুদের পিপাগুলো কোথায় স্থাপন করলে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যাবে? বাইরের দেয়াল ঘেঁসে দরজার কাছে।
উমর আলির লোকজন যথারীতি ভারী পিপাগুলো টেনে নিয়ে যথাস্থানে রেখে বারুদ বিস্ফোরিত করার জন্য স্ফুলিঙ্গবহ দড়ি লাগাতে লাগলো। জায়গামতো বারুদ স্থাপন করার পর উমর আলি বললো, বারুদ বিস্ফোরিত হওয়ার সাথে সাথে আমাদের কয়েকটি পল্টনের চৌকশ সৈন্যরা ফাটলের দিকে ছুটে আসবে।’
