আওরঙ্গজেব তার পুরোনো দেহরক্ষীদলের প্রধান উমর আলিকে বললেন, ‘একজন প্রকৌশলীকে ডেকে আন, যে কথা বলার অবস্থায় আছে। কয়েক মিনিট পর মুখ, মাথায় আর পোশাকে কাদামাখা একজন লোককে তার কাছে। নিয়ে আসা হল।
সুরঙ্গে বয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় কী তোমাদের বারুদ ফেটে গিয়েছিল?
‘না, জাঁহাপনা, এটা গোলকুন্ডিদের বারুদের বিস্ফোরণ।
কী বলতে চাও? কী ভাবে হল?
‘ওরা হয়তো কোনোভাবে আমাদের সুরঙ্গ খুঁড়া টের পেয়েছিল। আমাদের শ্রমিকরা সুরঙ্গ দিয়ে আসা যাওয়ার শব্দ কিংবা নড়াচড়ার কারণে হয়তো ওরা টের পেয়েছিল। তাছাড়া সুরঙ্গের উপরের মাটিও একটু দেবে গিয়েছিল। বুরুজর নিচে আমরা বারুদ পেতে ফাটাবার প্রস্তুতি নেবার আগেই ওরাও একটা সুরঙ্গ কেটে আমাদের সুরঙ্গ বারুদ দিয়ে উড়িয়ে দেয়।
আওরঙ্গজেব মাথা নেড়ে বললেন, “আচ্ছা তাই বল।’ গোলকুন্ডিরা নিশ্চয়ই এখনও অনেক সুসংগঠিত আর সুশৃঙ্খল। আর একই সাথে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ আর সতর্ক। আমাদের সুরঙ্গ খুঁড়া টের পাওয়ার জন্য ওরা চর বসিয়েছিল। যে আফগান লোকটির কথা ওয়াজিম খান বলেছিল, এখন তার গুরুত্ব অনেক বেড়ে গেল। তার সম্পর্কে আরো কিছু জানতে হবে। তবে তাকে আগে সুরঙ্গ খুঁড়ার কাজে নিযুক্ত লোকজনদের প্রতি কৃতজ্ঞতা আর সমর্থন জানতে হবে। তিনি কল্পনাও করতে পারলেন না মাটিতে পেট লাগিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে একটি সরু সুরঙ্গের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাওয়া কি কষ্টকর হতে পারে। ছাদ ঠেকা দেবার উপযুক্ত কোনো জিনিসপত্র নেই। আর বারুদের থলে টেনে নিয়ে যাওয়া কি বিপজ্জনক, সর্বক্ষণ আতঙ্কের মধ্যে থাকা, যেকোনো মুহূর্তে একটি স্ফুলিঙ্গ বারুদে আগুন ধরিয়ে দেবে কিংবা উপর থেকে মাটি পড়ে ফিরে যাওয়ার একমাত্র পথ বন্ধ হয়ে ধীরে ধীরে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে করুণ মৃত্যু।
‘তোমরা সবাই বীরের মতো কাজ করেছ। আমাদের উদ্দেশ্যের প্রতি একান্ত আনুগত্য দেখিয়েছ। আমি কথা দিলাম যারা বেঁচে রয়েছে তাদের সবাইকে যথোপযুক্ত পুরস্কৃত করা হবে আর যারা হতাহত তাদের পরিবারকে সহায়তা দেওয়া হবে।’
লোকটি মাথা ঝুঁকিয়ে বললো, ‘ধন্যবাদ জাহাপনা।’
আওরঙ্গজেব পেছনে ঘুরে ওয়াজিম খানকে সাথে নিয়ে দ্রুত তাবুর দিকে ফিরে চললেন। সেখানে পৌঁছে বসার আগেই তিনি ওয়াজিম খানকে বললেন, “তুমি বললে, এই আফগান লোকটি গোলকুন্ডি সেনাবাহিনীর সহকারী প্রধান সেনাপতি। তারপরও সে বিশ্বাসঘাতকতা করে আমাদের জন্য দুর্গে ঢোকার পথ করে দেবে?
‘হা, জাঁহাপনা। এই লোকটির নাম রশিদ খান। আপনার মনে আছে এক বার্তাবাহককে আমরা ধরেছিলাম যখন সে গোপনে রাতে দুর্গ থেকে বের হয়ে এল? তার কাছ থেকে বার্তাগুলো কেড়ে না নিয়ে, তাকে মেরে না ফেলে কিংবা বন্দী না করে আমরা তাকে ঘুষ দিয়ে বললাম সে তার কাজ চালিয়ে যেতে পারবে, তবে সমস্ত বার্তা আমাদেরকে দেখাতে হবে। এই বার্তাগুলোর মধ্যে একটা বার্তা রশিদ খান তার চাচাত ভাইকে লিখেছিল। সে একটি হীরার খনিতে সৈন্যদের নেতৃত্বে রয়েছে। আফগান লোকটি তার বার্তায় আদিল খানের চাকরিতে ঢোকার জন্য এখন আফসোস করছিল। যদিও সে অনেক উঁচু পদে উঠতে পেরেছে আর তার অনেক সম্পদ লাভ হয়েছে। তবে তার আশঙ্কা বাইরে থেকে দুর্গে কোনো সাহায্য আসবে না। গোলকুন্ডার কোনো সেনাদল তেমন শক্তিশালী নয়। কাজেই কোনো সেনাপতি এই ঝুঁকি নেবে না। যদিও দীর্ঘদিন তারা প্রতিরোধ করতে পারবে তবে পরিশেষে ঠিকই এর পতন হবে। সে নিজেও মারা যেতে পারে, আর যে সম্পদ এতদিন জমিয়েছিল তা সমস্ত হারাবে। আমি তার চাচাত ভাইয়ের হয়ে তাকে একটা উত্তর লিখলাম, তাতে তাকে সমবেদনা জানালাম আর বললাম যে, এখানে বন্দীরা বলাবলি করছে, যদি কেউ মোগলদের দুর্গে ঢোকার পথের খোঁজ দিতে পারে তবে তাকে পুরস্কৃত করা হবে। আর সে যদি এতে আগ্রহী হয় তবে যেন একই বার্তাবাহকের মাধ্যমে তার উত্তর পাঠায়। তারপর তার ভাই আমাদের কাছে প্রস্তাব পাঠাবে। এই বার্তাটি সেই বার্তাবাহকের হাতে দিয়ে তার কাছে পাঠালাম। সে সাথে সাথে উৎসাহিত হয়ে উত্তর দিল, সেটা পাওয়ার সাথে সাথেই আমি আপনার কাছে এলাম যাতে আপনি নিজে তাকে একটা ক্ষমা আর পুরস্কারের প্রস্তাব দিয়ে চিঠি লিখতে পারেন।’
‘আমি চিঠি লিখতে রাজি আছি, কিন্তু এখানে কী নিশ্চয়তা আছে যে, সে আমাদেরকে একটা ফাঁদে ফেলবে না? তার সম্পর্কে আর তার চরিত্র সম্পর্কে আমরা কতদূর জানি?
‘সে সারাজীবন একজন ভাড়াটে সেনা হিসেবে কাটিয়েছে। কোনো অস্থায়ী প্রভুর চেয়ে ভাড়াটে সেনাদের নিজের আর নিজেদের সম্পদের প্রতি যথেষ্ট মায়া আছে। আমার বিশ্বাস সে এর আগে অন্তত একবার হলেও তার আনুগত্য বদল করেছে। দুর্গের ভেতরে তার কোনো পরিবার নেই। নিজেকে ছাড়া আর কারও জন্য ভাবার মতো তার কেউ নেই। আর তার প্রথম চিঠি থেকে আমরা জানতে পেরেছি চূড়ান্ত পর্যায়ে তাদের পরাজয় অবধারিত।
‘সে সব ঠিক আছে। তবে সে যদি আমাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে বসে, সেজন্য দুৰ্গটা তাকে আমাদের হাতে তুলে দেবার জন্য, আমাদেরকে এমন একটা পথ খুঁজে বের করতে হবে, যাতে আমাদের খুব বেশি লোকবল প্রয়োজন না পড়ে। এটা বলার পর আমি একটা চিঠি লিখে তাকে ক্ষমার প্রস্তাব দেব আর সেই সাথে উত্তরে পাঞ্জাবের বিদ্রাহী শিখদের কাছ থেকে আমরা যে জায়গা দখল করেছি, সেখান থেকে তাকে বড় একটা জায়গির দেব।’
