*
দুই ঘণ্টা পর অন্ধকার হতেই আওরঙ্গজেব দুই সারি প্রহরীর মধ্য দিয়ে হেঁটে তার তাঁবুর সামনে স্থাপন করা একটি মঞ্চের দিকে দ্রুত এগিয়ে চললেন। সেখানে তার ত্রিশজন উচ্চপদস্থ সেনাপতিকে ডেকে আনা হয়েছিল। কঠিন চেহারা নিয়ে তিনি বললেন, আমি তোমাদেরকে ডেকেছি দেখার জন্য, এখানে একজন বিশ্বাসঘাতকের বিচার করা হবে। নিয়ে এস তাকে!
দুজন বলিষ্ঠ প্রহরী মুয়াজ্জমের হাত-পা বাঁধা অবস্থায় টানতে টানতে নিয়ে এল, তাকে দেখেই সমবেত সেনাপতিরা আঁতকে উঠলো। মঞ্চের কাছে পৌঁছে প্রহরীর তাকে মাটিতে ফেলে দিল। সারাদিনের বৃষ্টিতে মাটিতে কাদাভরা ছিল। মুয়াজ্জম উঠে দাঁড়াতে পারছিলেন না। তার চোয়ালে রক্ত জমে কালো হয়ে রয়েছে।
আওরঙ্গজেব তাকে দেখিয়ে বললেন, এই বাই-দওলত, এই জঘন্য নীচ আমার কাছে প্রায় গর্ব করে স্বীকার করেছে যে, সে গোলকুন্ডি শত্রুদের সাথে গোপনে যোগাযোগ করেছে। ঠিক কি-না বল?
তার ছেলে বিড় বিড় করে বললেন, হ্যাঁ করেছি। তারপর সাহস সঞ্চয় করে মাথা তুলে বললেন, কিন্তু যখন আমি ভাবলাম এটা আমাদের সাম্রাজ্য আর আমাদের বংশের জন্য মঙ্গলজনক হবে।
‘এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কিসে আমাদের সাম্রাজ্যের স্বার্থ রক্ষা হবে, তা তুমি কি করে ভাবতে পারলে! এই সিদ্ধান্ত একমাত্র আমি নিতে পারি–তুমি কিংবা আমার সভাসদ আর সেনাপতিদের কেউ নয়…’
‘আমি সত্যি দুঃখিত বাবা। আমার উদ্দেশ্য মহৎ ছিল।’
‘তোমার দুঃখ আর তোমার উদ্দেশ্য কোনোটারই আমার কাছে মূল্য নেই। আর সেই সাথে আমার সাথে তোমার সম্পর্কও–যা আমি এই মুহূর্তে অস্বীকার করছি। তোমার সাজা ঘোষণা করার আগে তোমার আর কিছু বলার আছে? তুমি জান যে, একজন বিশ্বাসঘাতকের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।’
মুয়াজ্জম শান্তকণ্ঠে বললেন, হ্যাঁ জানি। আর তাই যদি আমার কপালে লেখা থাকে তবে আমি তা মেনে নেব। আমি আপনার প্রতি আর সাম্রাজ্যের প্রতি অনুগত থেকে মৃত্যুবরণ করবো।’
আওরঙ্গজব একটু ইতস্তত করলেন। প্রথমে রাগের বশে তিনি তার মৃত্যুদণ্ড দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এখন জনসমক্ষে রায় দিতে গিয়ে তিনি ততটা নিশ্চিত হতে পারছেন না। গৃহযুদ্ধের সময় তার ছেলে মোহাম্মদ সুলতান যখন তাঁর বিরুদ্ধে তাঁর চাচা শাহ সুজার সাথে যোগ দিয়ে তার বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল, তখন তিনি তার মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে তাকে কারাগারে বন্দী করে। রেখেছিলেন। আর সেই যুদ্ধের পরিণতিতে তিনি সিংহাসনে আরোহণ করতে পেরেছিলেন। তার ছেলে আকবর পালিয়ে প্রথমে সম্ভাজির কাছে তারপর, তার গুপ্তচরদের খবর অনুযায়ী পারস্যে চলে যাওয়ায় তার ভাগ্য নির্ধারণ করার সুযোগ তিনি পান নি। মোহাম্মদ সুলতান আর আকবর, উভয়ের অপরাধই ছিল সম্পূর্ণ বিশ্বাসঘাতকতা, অথচ মুয়াজ্জম কেবল তার বাবার স্বার্থে এই দুঃসাহস দেখিয়েছিল, তারপরও সে এ কাজটি করতে গিয়ে অযৌক্তিকভাবে তার ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে। অন্যদিকে মোহাম্মদ সুলতান আর আকবর যখন অপরাধ করে তখন তাদের বয়স কম ছিল। অথচ মুয়াজ্জমের বয়স বেশি–চল্লিশের উপরে, আর সে ওদের চেয়ে অনেক পরিপকৃতা দেখিয়েছে। পরস্পরবিরোধী এসব যুক্তিতর্ক তাকে কোথায় নিচ্ছে? হঠাৎ জাহানারার কথা তার মনে পড়লো, তিনি আকবরের পক্ষে অনুরোধ করেছিলেন। তিনি জানেন, যদি এখন জাহানা জীবিত থাকতেন তবে তিনি মুয়াজ্জমের জন্যও করুণা ভিক্ষা করতেন।
মুয়াজ্জম, মৃত্যুই তোমার জন্য উপযুক্ত শাস্তি, তবে আমি ক্ষমাশীল হব। তোমাকে গোয়ালিয়রে কারাগারে বন্দী করে রাখা হবে। প্রহরী তাকে আমার চোখের সামনে থেকে নিয়ে যাও। কথাটা বলতেই আবার এক পশলা বৃষ্টি পড়তে শুরু করলো, চোখের পানির মতো বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে আওরঙ্গজেবের গাল ভিজিয়ে দিল।
১৮. এক থালা মিষ্টান্ন
‘ওয়াজিম খান, এটা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটা তথ্য। যদি এটা নিশ্চিত করতে পার, তাহলে গত আটমাস ধরে আমরা যে অবরোধ করছি তার অবসান ঘটাবার একটা চমৎকার সুযোগ পাওয়া যাবে। এই আফগান লোকটির সম্পর্কে আরো কিছু তথ্য বল…’
হঠাৎ একটা কান ফাটানো বিস্ফোরণের শব্দ আওরঙ্গজেবের তাবুর বাইরে শোনা গেল। তাবুর ছাউনিতে কতগুলো জিনিস পড়তেই তার পায়ের নিচের মাটি কেঁপে উঠতেই তিনি তাঁবুর একটা খুঁটি ধরে নিজেকে সামলালেন। এটা আবার কি? ভূমিকম্প তো এরকম বস্তু ছুঁড়ে ফেলে না। কাঁপুনিটি কমে যেতেই কি হয়েছে দেখার জন্য আওরঙ্গজেব তাবুর বাইরে ছুটে গেলেন। হাতিগুলো যেখানে দাঁড়িয়েছিল সেখান থেকে হাতির ডাক শোনা গেল। কয়েকজন সেনাপতি তাদের তাবু থেকে বের হয়ে হতভম্ব হয়ে চারদিকে তাকাল। সর্বত্র বড় বড় পাথরের টুকরা আর মাটি ছড়িয়ে রয়েছে। তারপর তিনি এর কারণটি দেখলেন।
তার চারশো গজ সামনে মাটিতে একটি বিরাট ফাটল দেখা গেল। গোলকুন্ডা দুর্গের সবচেয়ে বুরুজের দিকে যাওয়ার জন্য তার অর্ধেক দূরত্বে একদল মোগল প্রকৌশলী মাটিতে একটি সুরঙ্গ খুঁড়ছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল সুরঙ্গ দিয়ে এর নিচে পৌঁছে যতবেশি সম্ভব বারুদ চেপে এটাকে ভেঙ্গে ফেলা, যাতে গোলকুন্ডিদের প্রতিরক্ষায় একটা ফাটল ধরান যায়, যা মোগলদের সফলতার জন্য প্রয়োজনীয় ছিল। এখন সেই সুরঙ্গের সরু আর নিচু মুখ থেকে রক্তাক্ত আর কাদামাখা দেহে কয়েকজন প্রকৌশলী কোনোমতে বের হয়ে এল। নিশ্চয়ই কোথাও কোনো একটা গোলমাল হয়েছে, কিন্তু কী সেটা?
