তাদের এত চেষ্টা সত্ত্বেও গোলকুন্ডি কামান আর গাদা বন্দুক গুলি ছুঁড়েই চললো। একটা গোলা এসে একটি গরুর গাড়ির উপর আঘাত হানলো। এর পেছনে দশজন গাদা বন্দুকধারী গুঁড়ি মেরে বসে অবস্থান নিয়েছিল। গোলার আঘাতে কাঠের টুকরার সাথে একজন সৈন্যের দেহ উড়ে গেল। ইতোমধ্যে গোলকুন্ডি বরকন্দাজরা তাদের নিকটস্থ লক্ষ্যবস্তু ছুটে যাওয়া অশ্বারোহীদলের উপর গাদা বন্দুকের গুলি ছুঁড়তে শুরু করেছে। কয়েকটি ঘোড়া আরোহীসহ হুমড়ি খেয়ে পড়তেই আরোহীরা ঘোড়ার পিঠ থেকে মাটিতে ছিটকে পড়লো। বৃষ্টি আর ধোঁয়ার মধ্য দিয়ে আওরঙ্গজেব দেখলেন একজন পতাকাবাহী মাটিতে পড়ার সময় তার হাতে ধরা বড় সবুজ পতাকার ডাণ্ডা তার হাতছাড়া হয়ে গেল। ডাণ্ডাটি তার পাশের ঘোড়ার সামনের পায়ে ছিটকে পড়তেই ঘোড়াটিও মাটিতে পড়ে গেল। পেছনে যারা অনুসরণ করছিল তারা পাশ কেটে মাটিতে পড়া দেহগুলো এড়াতে চেষ্টা করলো। তারপরও আরোহীসহ অনেক ঘোড়া পড়ে গেল। কেবল ছোট একটি দল ফটক-ভবনের দিকে পাক খেয়ে উঠে যাওয়া ঢালু পথের গোড়ায় পৌঁছে মাথা নিচু করে ঘোড়া ছুটিয়ে চলতে লাগলো। আওরঙ্গজেব আর মুয়াজ্জমকে দেখতে পাচ্ছেন না। তার ছেলে কি পড়ে গেছে? না, ঐ যে তাকে দেখা যাচ্ছে। আক্রমণকারী সেনাদের প্রথম সারির সাথে উদ্যত তরোয়াল হাতে সে ছুটছে। চতুর্দিক থেকে কয়েকজন দেহরক্ষী তাকে ঘিরে রয়েছে।
কয়েকমুহূর্ত পর মুয়াজ্জমের পাশের একজন শিঙ্গাবাদক তার ঠোঁটে শিঙ্গাটা তুললো। এত দূর থেকে আওরঙ্গজেব শিঙ্গার আওয়াজ শুনতে পেলেন না। তবে তার অর্থ বুঝা গেল যখন সাথে সাথে সমস্ত জীবিত অশ্বারোহী সেনা পেছন ফিরে ঘোড়া ছুটিয়ে নিজেদের শিবিরের দিকে রওয়ানা দিল। শিঙ্গাবাদকের হাত থেকে শিঙা পড়ে গেল, সে দুই হাত শূন্যে তুলে ঘোড়ার পিঠ থেকে পেছনে পড়ে গেল। আরোহীহীন একটি ঘোড়া ছুটে যাওয়ার সময় একজন পতাকাবাহীর ঘোড়াকে ধাক্কা মারতেই সে মাটিতে পড়ে গেল। পেছনে মোগল শিবিরে পৌঁছতে হলে তার ছেলে আর অন্যান্য সৈন্যকে খোলা ময়দানটি পার হতে হবে। বৃষ্টির ছাঁট কমে যেতেই ধোঁয়া আবার তার দৃষ্টি পথ। ঢেকে দিল। তিনি প্রার্থনা করলেন মুয়াজ্জম যেন বেঁচে থাকে। আক্রমণ সফল না হলেও সে একজন সত্যিকার মোগল শাহজাদার মতো যুদ্ধ করেছে।
*
দুই ঘণ্টা পর নিরাপদে নিজেদের শিবিরে ফিরে এসে, মুয়াজ্জম তার হাঁটু আর বাহুতে সামান্য যে চোট লেগেছিল, তাতে পট্টি লাগিয়ে তার বাবার লাল তাবুতে এসে সম্রাটের সামনে দাঁড়ালেন।
আওরঙ্গজেব তাকে বললেন, তুমি সত্যি আজ সাহস দেখিয়েছ মুয়াজ্জম। আক্রমণ সফল না হওয়ার জন্য তোমাকে কেউ দোষারোপ করতে পারবে না।’ বাবার কথার উত্তরে তিনি বললেন, ‘ধন্যবাদ, বাবা। তারপর তার ডান হাতে ধরা শরবতের গ্লাসে একটি চুমুক দিয়ে আবার বললেন, আমি আমার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি, আর সৈন্যরাও জানপ্রাণ দিয়ে লড়েছে। ওদের অনেককে হারিয়ে আমি খুবই দুঃখ পেয়েছি, বিশেষত আমার দুধ-ভাই উমরখানকে। ঢাল বেয়ে উপরে উঠার সময় বুরুজের কিনারা থেকে গোলকুন্ডিরা তার উপর গরম তেল ঢেলে দেয়। তার সারা গা পুড়ে যায়, ফিরে আসার সময় সে যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে মারা যায়। কি ভয়ঙ্কর–তার গায়ের সমস্ত চামড়া আর চুল পুড়ে গিয়েছিল।
‘তার আত্মা আজ রাতে বেহেশতে শান্তিলাভ করবে। আর যে বিশ্বাসীরা আজ আমাদের জন্য প্রাণ দিয়েছে তারাও। আমি তার স্ত্রী আর পরিবার পরিজনদের ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করবো। তারপর এক মুহূর্ত থেমে আওরঙ্গজেব আবার বলা শুরু করলেন, আবার তোমার অভিযানের কথায় আসছি, দ্রুত সফলতা পেতে হলে মুখোমুখি হামলার বদলে আমাদেরকে অন্য কোনো উপায় বের করতে হবে। আমি ওয়াজিম খানকে আমাদের সাথে যোগ দিতে ডাকছি। অনেক সময় সে খুব ভাল পরামর্শ দিতে পারে।
‘এটা করার আগে ব্যক্তিগতভাবে আমি কি আপনার সাথে কিছু কথা বলতে পারি?
‘অবশ্যই।
‘গোলকুন্ডিদের সাথে কোনো ধরনের আলাপ-আলোচনা চালালে কেমন হয়?
‘তারা যদি তাদের দুর্গ আর জমি আমার কাছে ছেড়ে দিতে চায় তবে আমি তাদের কথা শুনবো। তবে সেরকম কোনো আলামত তো দেখছি না।’
মুয়াজ্জম একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে গলা নামিয়ে প্রায় ফিস ফিস করে বললেন, না, আমি বলছি সমানে সমানে কোনো আলোচনা। আপনি জানেন আদিল হাসানের উজিরের স্ত্রী আমার স্ত্রীর আত্মীয়? ঐ দুই মহিলার মাধ্যমে তিনি আমার সাথে যোগাযোগ করে জিজ্ঞেস করেছেন, “কেন বিশ্বাসীরা অন্য বিশ্বাসীদের হত্যা করবে? কেন এত বিশ্বাসী আত্মা বেহেশতে যাবে? কেন এত বিধবা আর ছেলেমেয়ে কাঁদবে? আমরা কী কোনো আপস মীমাংসায় আসার জন্য আলোচনা করতে পারি না?” আমি উত্তরে জানিয়েছিলাম বিনা প্রয়োজনে এত প্রাণ বিসর্জন দেওয়া হোক তা আমিও চাই না। যদি আমরা রাজি হই তখন আপস মীমাংসায় আসার জন্য শর্তের বিষয়গুলো আমি আপনাকে জানাতাম। এমনকি শর্তগুলোর কিছু ধারণাও তাকে দিয়েছিলাম। তবে আলোচনা আরো কিছুদূর এগোবার আগে আপনাকে জানাতে চাইনি। তবে উমর খানের মৃত্যু আর আজ আপনি আমার সাহসের প্রশংসা করায় আমি কথাটা বলার সাহস পেয়েছি।
প্রচণ্ড রাগে আওরঙ্গজেবের মুখ কুঁচকে গেল, তিনি হাত মুঠো করে তাঁর ছেলের মুখে একটা ঘুষি মেরে তাকে মেঝেতে ফেলে দিলেন। তার বাবার আঙুলে পরা তৈমুরের আংটিতে তার চিবুক কেটে গিয়ে ইরানি গালিচায় ফোঁটায় ফোঁটায় লাল টকটকে রক্ত পড়তে লাগলো। আওরঙ্গজেব গর্জে উঠলেন, ‘প্রহরী! এখুনি এখানে এস! এখান থেকে এই বিশ্বাসঘাতককে সরিয়ে নিয়ে যাও।
