‘ওয়াজিম খান, আমার যুদ্ধ হস্তী আনতে বল। এ অবস্থায় আমি আর লড়াইয়ের ময়দান থেকে দূরে থাকতে পারি না। যদিও আমি আমার ছেলেকে কথা দিয়েছিলাম নেতৃত্ব তার হাতেই থাকবে।’
কয়েকমিনিট পর আওরঙ্গজেবের হাতি মোগল সৈন্যরূহ্যের কাছাকাছি পৌঁছল। ধোয়ার ফাঁক দিয়ে সামনে লড়াই দেখার জন্য তিনি তাকিয়ে দেখলেন, আহত সেনারা সেখান থেকে বের হয়ে তাঁকে পাশ কাটিয়ে পেছনের দিকে যাচ্ছে। কেউ কেউ আরেকজনের কাঁধে হাতে ভর দিয়ে চলছিল। অন্যরা হাতে বানানো ক্রাচে ভর দিয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে যাচ্ছে। যারা বেশি আহত হয়েছে তাদেরকে গাছের ডাল কেটে বানানো খাটিয়ায় শুইয়ে বেহারারা বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। একটি দাড়িওয়ালা লোক তার পেটের বড় একটি ক্ষত থেকে বের হয়ে আসা লাল-নীল নাড়িভূড়ি চেপে ধরে যন্ত্রণায় তারস্বরে চিৎকার করতে করতে যাচ্ছিল।
আওরঙ্গজেব বিড়বিড় করলেন, আল্লাহ যেন তাকে শীঘ্রই পরকালে নিয়ে যান। এ অবস্থায় কোনো হেকিমই কিছু করতে পারবে না।
কয়েকমিনিটের মধ্যে আওরঙ্গজেব তাঁর কামানের সারির কাছে পৌঁছতেই চিৎকার করে গোলন্দাজ সেনাদের উদ্দেশ্যে বললেন, যত দ্রুত পার গোলা ভর। সেনাবাহিনীর বাকি সবার জীবন তোমাদের উপর নির্ভর করছে!’ খালি গায়ে বারুদের ছিটা নিয়ে ওরা নিচু হয়ে গোলা ভরার কাজ করতে করতে না থেমে তার কথার জবাবে বলে উঠলো, ‘সম্রাট দীর্ঘজীবী হোন! আওরঙ্গজেব দেখলেন গোলন্দাজ সারি পেরিয়ে একটু সামনে একটি উঁচু ঢিবির উপর একজন তরুণ মোগল সেনা কর্মকর্তা পিঠ খাড়া করে একটি ধূসর ঘোড়ার পিঠে বসে রয়েছে। তার পাশে তার চেয়েও বয়সে ছোট তরুণ কোরচিও নিজের চঞ্চল হয়ে ওঠা ঘোড়াকে বশ করতে হিমশিম খাচ্ছিল। আওরঙ্গজেব তার মাহুতকে সেনা কর্মকর্তারটি পাশে হাতি থামাতে বললেন। তারপর তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, এখানে কী হচ্ছে?
‘জাহাপনা, আপনার ছেলে আমাকে এখানে অপেক্ষা করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি গোলকুন্ডার মূল ফটকের উপর একটি আক্রমণে নেতৃত্ব দিতে গেছেন। হামলা সফল হলে তিনি আমাকে খবর পাঠাবেন। সবকিছু ঠিকঠাক মতো চললে, আশা করি তাই হবে, আমি বরকন্দাজ আর আপনার বাঙ্গালি পল্টন থেকে আরো পদাতিক সেনা নিয়ে এগোব, যাতে উনি–’
কথা শেষ না হতেই প্রচণ্ড একটি শব্দে তার কথা থেমে গেল। আওরঙ্গজেবের হাওদা কেঁপে উঠলো আর তার হাতিটি মাথা পেছনে হেলিয়ে শূড় তুলে বৃংহণ করে উঠলো। আওরঙ্গজেব নিজের অজান্তে চোখ বুজতেই উষ্ণ তরল কিছু একটা তার মুখে থপ করে এসে পড়লো আর এর সাথে নরম স্পঞ্জের মতো কিছু ঝুলে রইল। চোখ খুলে তিনি হাতের পিঠে মুখ মুছলেন। তরলটি ছিল রক্ত আর নরম পদার্থটি ছিল তার সেনা কর্মকর্তা কিংবা তার ঘোড়ার মাংস। উভয়ের দেহই মাটিতে ছিন্নভিন্ন হয়ে ছড়িয়ে পড়ে রয়েছে। আওরঙ্গজেবের হাতির দুজন মাহুতের মধ্যে একজন হাতির পিঠ থেকে মাটিতে পড়ে স্থির হয়ে রয়েছে। তবে তার শরীরে কোনো যখম দেখা যাচ্ছে না। তরুণ কোরচির ঘোড়াটি আরোহীসহ ভেগে গেছে। কামানের অন্তত কয়েকটা গোলার আঘাতে এটা হয়েছে। তার নিজের সেনাদের মতো গোলকুন্ডি গোলন্দাজ সেনারাও দক্ষ হাতে কামান চালিয়েছে।
দ্বিতীয় মাহুতটি দ্রুত আওরঙ্গজেবের হাতিটিকে শান্ত করলো। আওরঙ্গজেব ভাবলেন, তিনি কি তার দেহরক্ষী দলসহ মৃত সেনা কর্মকর্তার কাছে অপেক্ষা করবেন, নাকি আরো সামনে এগিয়ে যাবেন। তারপর ছুটন্ত ঘোড়ার খুরের শব্দ পেছনে আসতেই দেখলেন আরো দুজন সেনা কর্মকর্তা ছুটে এসেছে। প্রথম লোকটি একটু বয়স্ক আর তার এক চোখে পট্টি বাঁধা। সে বললো, জাহাপনা, আমরা দেখেছি আমাদের সহযোদ্ধা পড়ে গেছেন, তার বদলি হিসেবে আমরা এসেছি।’
‘তোমরা তোমাদের নির্দেশ জান?
“জ্বী, জানি জাহাপনা।
আওরঙ্গজেব মাথা নাড়লেন। যে মাহুতটি নিচে পড়েছিল, তার জ্ঞান ফিরে এসেছে, শুধু ধাক্কার কারণে সে জ্ঞান হারিয়েছিল। এবার সে টলমল পায়ে উঠে দাঁড়াল, তারপর এক হাত বাড়িয়ে অপর মাহুতের বাড়িয়ে ধরা হাত ধরে আবার হাতির কানের কাছে তার জায়গায় উঠে বসলো। আওরঙ্গজেব আবার সামনে এগোবার নির্দেশ দিতেই হঠাৎ দমকা হাওয়া বয়ে গেল। কয়েক মুহূর্ত পর তার মাথার উপর আবার কানফাটা গর্জন শোনা গেল, আর তার মুখে তরল পড়লো। তবে রক্ত নয় বৃষ্টির ফোঁটা পড়লো আর গর্জনটি ছিল বজ্রপাতের। বৃষ্টি আর বাতাসে ধোঁয়া অনেকটা কমে এলে আওরঙ্গজেব সামনের দৃশ্য দেখতে পেলেন।
প্রথমে তার মনে হল তার ছেলের সৈন্যরা মূল ফটক-ভবনের দিকে চলে যাওয়া ঢালু পথের দিকে না এগিয়ে থেমে পড়েছে। আসলে ওরা ছোট ছোট দলে ছড়িয়ে পড়ে রুক্ষ জমির উপর যে কোনো ধরনের আড়াল খুঁজে তার পেছনে লুকিয়ে দুর্গের দিকে এগোতে চেষ্টা করছিল। তারপর তিনি দেখলেন তাদের একটু পেছনে একসারি ছোট ছোট পাহাড়ের পেছনে সবুজ মোগল পতাকা ছুটছে। হঠাৎ মুয়াজ্জম আর বড় একটি অশ্বারোহী দল উদয় হল। ওরা চড়াই বেয়ে ঢালু পথটির দিকে ছুটছিল। পতাকাগুলো হাওয়ায় পেছন দিকে উড়ছে। ওরা সামনে ছুটতেই বাকি সৈন্যরাও রণহুঙ্কার দিয়ে তাদেরকে অনুসরণ করলো। কেবল বরকন্দাজরা কয়েকটি উল্টানো গরুর গাড়ির পেছনে তাদের অবস্থান নিল। ধোঁয়ার আড়ালে গরুর গাড়িগুলো এনে উল্টো করে ফেলা হয়েছিল। ওরা একনাগাড়ে গুলি করে বুরুজের উপরে গোলকুন্ডি প্রতিরক্ষা সেনাদের মাথা তুলতে দিচ্ছিল না।
