মুয়াজ্জম মৃদু হেসে বললেন, ‘ধন্যবাদ, বাবা। হায়দ্রাবাদের তেমন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা না থাকায় আমার কাজ সহজ হয়ে পড়ে। প্রকৃতপক্ষে আমার সেনাবাহিনীর শক্তি আর দৃঢ়তা বুঝতে পেরে আদিল হাসান তার সেনাবাহিনীসহ তাদের অস্ত্রশস্ত্র আর কোষাগারের সমস্ত সম্পদ নিয়ে সুশৃঙ্খলভাবে পিছু হটে যান। শহরের অনেক বাসিন্দা তাদের সম্পদ নিয়ে তাকে অনুসরণ করেছে। তিন সপ্তাহ আগে যখন আমি এখানে ঢুকি তখন দেখি প্রায় নির্জন একটি শহরে কেবল কিছু গরিব মানুষ রয়ে গেছে। তারপর শহরের চারমিনার মসজিদে শহরের নতুন শাসক হিসেবে মোল্লাকে দিয়ে আপনার নামে খোতবা পড়াই।’
‘তোমার অর্জন সম্পর্কে তুমি যে বিনয় দেখিয়েছ তা তোমাকে মহৎ করে তুলেছে। তাছাড়া তুমি শহরটিও নিজের আয়ত্তে আনতে সফল হয়েছ। আমি লক্ষ করেছি তুমি প্রত্যাঘাত প্রতিরোধ করতে মুসি নদীর তীরে আর অন্যান্য জায়গায় মাটির বাঁধ নির্মাণ করছে।’ বাবার এই ধরনের বিরল প্রশংসায় মুয়াজ্জমের মন চেহারা খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। তারপর আওরঙ্গজেব বললেন, “তবে এখানে বেশিদিন থাকা যাবে না। আমার মূল সেনাবাহিনী এখানে পৌঁছার পর তুমি যে সফলতা পেয়েছ তার ফায়দা উঠাতে হবে। আদিল হাসান তার সৈন্যসামন্ত নিয়ে কোথায় গেছে?
‘তিনি তার অধিকাংশ সেনা, পত্নী আর উপ-পত্নীদের নিয়ে এখান থেকে পাঁচমাইল দূরে গোলকুন্ডা দুর্গে আশ্রয় নিয়েছেন। এটাই আমি শুনেছি। আর কিছু সৈন্য পাঠিয়েছেন হীরার খনিগুলো পাহারা দিতে।
‘হীরার খনির দিকে আমাদের মনোযোগ দিলে চলবে না। গোলাকুন্ডা দুর্গ দখল করা আর আদিল হাসানকে পাকড়াও করার কাজটিকে আমাদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। দুর্গটি সম্পর্কে কী জানতে পেরেছ?
‘এটি একটি চারশো ফুট উঁচু কৌণিক আকৃতির দুর্গ যা পাহাড়ের চারধার ঘিরে নির্মাণ করা হয়েছে। এর চতুর্দিক ঘিরে দুটি চক্রাকার শক্তিশালী পাথরের বাঁধ রয়েছে। আর এই বাঁধে ছয়ফুট উঁচু কয়েকটি মজবুত বুরুজ রয়েছে। এগুলো এমন অবস্থানে নির্মাণ করা হয়েছে যে, বাইরে থেকে দেয়ালের উপর কোনো আক্রমণ এলে দুপাশ থেকে গোলাবর্ষণ করা যাবে। একমাত্র প্রবেশ পথটি একটি আঁকাবাকা পেঁচানো ঢালু পথ যা একটির সাথে আরেকটি সংযুক্ত এক সারি ফটকের ভেতর দিয়ে চলে গেছে।’
‘পানি আর খাবার সরবরাহ কেমন করে হয়?
‘দুর্গে যথেষ্ট পানি মজুত আছে। তবে এখন মানুষের ভিড় বেড়ে যাওয়ায় পানি আর যথেষ্ট বলা যাবে না। ওরা কয়েক মাসের জন্য খাদ্য মজুত করার সময় পেয়েছে। খাদ্য নিয়ন্ত্রণ করে চললে এতে কয়েক মাস চলার কথা।
‘আমাদেরকে যত শীঘ্র সম্ভব দুর্গটি চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলতে হবে। তারপর আমার মনে হয় প্রাথমিকভাবে কিছু আক্রমণ চালিয়ে প্রতিপক্ষের মনোবল যাচাই করে দেখতে হবে দীর্ঘকালব্যাপী অবরোধ এড়ানো যায় কি-না। আদিল হাসানের লাম্পট্য চরিত্রের যে খবর আমি পেয়েছি, তাতে আমার বিশ্বাস হয় না যে, সে একজন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ নেতা হবে কিংবা তার লোকজনও একান্তভাবে তাকে অনুসরণ করবে না। এ যাবৎ তোমার দৃঢ়সংকল্প দেখিয়ে তুমি আমাকে অবাক করেছ মুয়াজ্জম। তাই আমি তোমাকেই এই অভিযানের প্রথম অংশের নেতৃত্ব দিতে চাই। যাতে তুমি তোমার যোগ্যতা আরো প্রমাণ করতে পার।
*
ছয় সপ্তাহ পর আওরঙ্গজেব ওয়াজিম খানকে পাশে নিয়ে লক্ষ করছিলেন সীসার মতো রঙের আকাশের নিচে ঘোড়ায় চড়ে মুয়াজ্জম এগিয়ে গিয়ে গোলকুন্ডার দেয়ালে গোলাবর্ষণ করার জন্য মোগল গোলন্দাজ সৈনিকদের নির্দেশ দিচ্ছিলেন। তাঁর ছেলে অত্যন্ত কুশলতার সাথে আক্রমণ পরিচালনা করছিলেন। তিনি বাইরের সাথে দুর্গটির যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দিলেন। তারপর এমন ভান করতে লাগলেন যেন এখুনি মুখোমুখি আক্রমণ করবেন। এরপর গোলকুন্ডিরা কার্যকর কোনো প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেওয়ার আগেই শক্তিশালী ও দ্রুতগামী দুই দল সৈন্য পাঠিয়ে বলদের মাথার শিংয়ের মতো দুদিক থেকে দুর্গটি ঘিরে ফেললেন। তার লোকেরা মাটির তলে একটি মাটির নল আবিষ্কার করে নলটি কেটে ফেললো। এই নলটির মাধ্যমে পাহাড়ের পানির জলাধারের সাথে দুর্গের সংযোগ ছিল। গ্রীষ্মের তাপমাত্রা চরমে উঠলে দুর্গের ভেতরে গাদাগাদি করে থাকা লোকদের জীবন কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। আর খাবার পানির পরিমাণ কমে যেতেই কিভাবে তা ভাগাভাগি করা হবে তা নিয়ে নিশ্চয়ই তাদের মধ্যে তর্কবিতর্ক লেগে যাবে।
আওরঙ্গজেব ওয়াজিম খানের দিকে ঘুরে বললেন, ‘দিনের পর দিন অভিজ্ঞতা লাভ করে মনে হচ্ছে মুয়াজ্জম একজন পরিপক্ক সেনাপতি হয়ে উঠছে, সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে কিরকম শান্তভাব আর কতৃত্ব দেখাচ্ছে। বিশেষত কঠিন পরিস্থিতিতে তাই না, কি বল? ওয়াজিম খান মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বললো, সম্প্রতি আপনি তাকে যে ধরনের সমর্থন দিয়েছেন, তাতে উনি বিকশিত হয়ে উঠছেন, জঁহাপনা। প্রশংসা করলে মানুষের মনোবল বেড়ে যায়। এটা সবার ক্ষেত্রে ভাল কাজ দেয় কেবল যারা অতিমাত্রায় আত্মগর্ব করে আর অপরিণামদর্শী ছাড়া।
গুম গুম করে মোগল কামানের গুরুগম্ভীর গজনে আর আলোচনা করা গেল না। প্রায় একইসাথে সত্তরটি কামান গর্জে উঠেছে। সাদা ধোঁয়ার বিরাট ঢেউ পুরো যুদ্ধক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়লো, গোলকুন্ডার দুটি দেয়াল আর মোগল শিবিরের অবস্থানও ধোঁয়ায় ঢাকা পড়ে গেল। প্রত্যুত্তরে গোলকুন্ডার কামানের প্রচণ্ড গর্জনও আওরঙ্গজেবের কানে এল। ধোঁয়া সরে যেতেই ধীরে ধীরে একটা ফাঁক বের হয়ে এল, আওরঙ্গজেব দেখলেন, গোলকুন্ডার দেয়াল প্রায় অক্ষত দেখা যাচ্ছে, কেবল প্রধান ফটক-দালানের কছে বুরুজের উপর থেকে কয়েকটা পাথরের টুকরা নিচে মাটিতে খসে পড়েছে। গোলকুন্ডিরাও কিছু সফলতা লাভ করেছে। গোলকুন্ডার গোলার আঘাতে মোগলদের সবচেয়ে বড় কামানগুলোর একটি ব্রোঞ্জের নল এর বারো-চাকার কাঠের কাঠামো থেকে খুলে পড়ে গেছে। মাটিতে পড়ার সময় ভারী নলটির নিচে দুজন গোলন্দাজ সৈনিক চাপা পড়েছে। তাদের একদল সহযোদ্ধা কামানের ভারী নলটি তাদের পায়ের উপর থেকে টেনে সরাতে আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলো, তবে আবার ধোয়ার চাদরে ঢাকা পড়ার আগে তিনি দেখতে পেলেন ওরা সফল হতে পারে নি।
