খাওয়ার টেবিল থেকে উঠে তিনি তাঁবুর ভেতরে পায়চারি শুরু করলেন। সূর্য মাথার উপরে উঠে যাওয়ায় তাবুর ভেতরে একেবারে হাওয়া নেই। পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে? এই মুহূর্তে ধৈর্য ধরে ক্ষুধা আর তৃষ্ণায় প্রতিপক্ষদের দেহ আর মন দুর্বল হয়ে পড়ার জন্য অপেক্ষা করে দেখতে হবে আর পথে গুপ্তচর বসাতে হবে যাতে সাহায্যকারী সেনা এগিয়ে আসার সাথে সাথে শিবিরে খবর দিতে পারে। এছাড়া আর কিছুই করার নেই।
একজন কোরচি ঢুকে মাথা ঝুঁকিয়ে বললো, “ওয়াজিম খান আপনার সাথে দেখা করতে এসেছেন, জাহাপনা।
প্রায় সাথে সাথেই ওয়াজিম খান ঢুকলো। এক টুকরা সাদা কাপড় দিয়ে মুখের ঘাম মুছতে মুছতে সে বললো, ‘জাহাপনা, বিজাপুরের প্রধান ফটকের চারপাশে একটু উত্তেজনা দেখা যাচ্ছে।
কি ধরনের উত্তেজনা?”
‘দুই-তিনজন বিজাপুরি পরিখার পাশে তাদের তীরে বের হয়ে এসেছে। আর মনে হচ্ছে পরিখা পার হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ওরা একটা ভেলা বয়ে এনেছে।
আওরঙ্গজেব ওয়াজিম খানকে পাশ কাটিয়ে তাঁবুর বাইরে বের হতে হতে বললেন, ‘আমাদের লোকদের গোলাগুলি করতে নিষেধ কর।
দুজন লোক ভেলায় চড়ে পরিখা পার হয়ে আসছে। এত দূর থেকে দেখেও তাদেরকে দূত মনে হচ্ছে। এর একমাত্র অর্থ বিজাপুরিরা কোনো শর্ত নিয়ে আলোচনা করতে আসছে। দূত পাঠানো মানেই তাদের মনোবলের উপর একটা প্রচণ্ড আঘাত আর বিজাপুরবাসীরা দেখছে যে তাদের শাসকের চরম বিজয়ের প্রতি কত কম আস্থা রয়েছে। আওরঙ্গজেব বললেন, যদি ওরা সত্যিই দৃত হয়ে থাকে তবে ওদেরকে জানাও আমি কোনো শর্ত নিয়ে আলোচনা করবো না, তবে বিজাপুর আত্মসমর্পণ করলে ওদের প্রতি দয়াশীল হব। কোনো হত্যাযজ্ঞ হবে না, কোনো ভাল মেয়েকে ধর্ষণ করা হবে না, কোনো ঘরবাড়ি লুট করা হবে না।’ ওয়াজিম খান তার নির্দেশ জানাতে মোগল শিবিরের সামনের দিকে চলে গেল। আওরঙ্গজেব ঘুরে তাবুর দিকে চললেন, তিনি তাঁর মনের খুশি চেপে রাখতে পারছিলেন না। তবে অতি কষ্টে চেপে রাখলেন, কেননা বিজাপুরিদের আসল উদ্দেশ্য না জানা পর্যন্ত তাকে বাইরে উল্লাস প্রকাশ করা চলবে না। এতে তাঁর লোকজন তাকে বোকা আর। অপরিপক্ক মনে করবে।
দুপুরের দিকে তাঁবুর ছাউনির ভেতর থেকে আওরঙ্গজেব দেখলেন দুই জন লোক বিজাপুরের প্রতিরক্ষা বেষ্টনীর ভেতর থেকে বের হল। ওদেরকে অনুসরণ করে দশজন তোক একটি নৌকা বয়ে নিয়ে এল। নৌকাটি ওরা দুর্গন্ধময়, জঞ্জাল আর রক্ত ভরা পরিখার পানিতে নামাল। তারপর সাদা পোশাকপরা একজন হালকা-পাতলা লোক বের হয়ে নৌকার মাঝখানে একটি নিচু টুলে বসলেন। এরপর দশজন লোক লগি ঠেলে নৌকাটি মোগলদের দিকে ঠেলে নিয়ে চললো। তীরে পৌঁছে পাতলা লোকটি মরা হাতির ফুলে ওঠা দেহের কাছে এসে পা পিছলে পড়ে যাচ্ছি, তবে সাথে সাথে সামলে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। এ নিশ্চয়ই সিকান্দার। সবুজ পাগড়িপরা দুইজন মোগল সেনা তার দুই পাশে অবস্থান নিল। তারপর তাকে পথ দেখিয়ে গলেপচে যাওয়া লাশের পাশ কাটিয়ে এগিয়ে নিয়ে এল। শকুনের দল বাঁকা ঠোঁট দিয়ে লাশের মাংস ছিঁড়ে ভোজে ব্যস্ত ছিল। দশ মিনিট পর সিকান্দার আওরঙ্গজেবের তাবুর কাছে এলেন। আওরঙ্গজেব যেখানে দাঁড়িয়েছিলেন, তার পাঁচগজ দূরত্বে এসে তিনি থামলেন, তারপর দুহাতে একটি রত্নখচিত সোনার লাঠি ধরে তার দিকে হাত বাড়িয়ে মিহি তবে পরিষ্কার কণ্ঠে বললেন, ‘বিজাপুর এবং এর সমস্ত এলাকা আপনার হাতে সমর্পণ করে দেবার প্রমাণ হিসেবে আমি এই লাঠিটি, যা আমার পূর্বপুরুষের শাসকদণ্ড ছিল তা আপনার হাতে তুলে দিচ্ছি।’ কথাগুলো বলার সময় তিনি মাথা নিচু করলেন।
আওরঙ্গজেব লক্ষ করলেন, সিকান্দারের ডান হাতে ভারী পট্টি লাগানো রয়েছে, আর সেখান থেকে রক্ত চুঁইয়ে পড়ে পট্টির কাপড় লাল হয়ে যাচ্ছে। তিনি বললেন, ‘আমাদের গাদা বন্দুকের গুলি কি আপনাকে আত্মসমর্পণ করার জন্য শিক্ষা দিয়েছে?
না, গতরাতে আমার একজন চাচা, ইকবাল খান আমাকে ছুরি মেরে হত্যা করার চেষ্টা করেছিলেন। আমার দেহরক্ষীদের সাহায্যে আমি তার সাথে লড়াই করে তাকে থামাই। তিনি এখন মৃত। তবে আমার হেকিম যখন ক্ষতটি পরিষ্কার করে পট্টি লাগাচ্ছিলেন তখন আমি বুঝলাম তিনিই শেষ লোক নন যে এই ধরনের চেষ্টা করবে। ঈর্ষা আর উচ্চাকাঙ্ক্ষার কারণে যে বিভক্তি করার প্রচেষ্টা চলছে, তাতে বিজাপুরের পতন হবেই। আপনার শুনতে খারাপ লাগতে পারে, তবে আমি আমার জীবনকে নিজের কাছে অনেক প্রিয় মনে করি সিংহাসনের চেয়েও মধুর–আমি অনেকদিন এই জীবন উপভোগ করতে চাই। সেজন্য আমি বুঝতে পেরেছি যে, প্রকৃতির নিয়মবিরোধী আর নিকট আত্মীয়দের হাত থেকে আমার জীবন নিরাপদ হবে, যদি আমি নিজেকে আর আমার রাজ্য এখুনি আপনার হাতে তুলে দেই। যদিও আপনি একজন আগন্তুক এবং আমার দেশের মানুষের শত্রু, তারপরও আমি আমার অবিশ্বস্ত পরিবার আর যুদ্ধরত আত্মীয়দের চেয়ে এখানে নিরাপদ থাকবো। আওরঙ্গজেব তার পেছনে দাঁড়ান ওয়াজিম খানের দিকে তাকালেন। বিজাপুরি রাজপরিবারের যেসব সদস্যদের কাছে বার্তা পাঠান হয়েছিল ইকবাল খান তাদের একজন। ওদের কাছে প্রস্তাব করা হয়েছিল, যারা মোগলদের সহায়তা করবে তাদেরকে যথেষ্ট পুরস্কারসহ ভাল পদ দেওয়া হবে। কেউ উত্তর দেয় নি, তবে ইকবাল খান মনে হয় তার কথা শুনেছিল। তার কার্যকলাপ আর এর ফলশ্রুতিতে পরবর্তীতে তার মৃত্যুর কারণে মোগলরা তাদের বিজয় নিশ্চিত করতে পারলো, প্রতিশ্রুতি মোতাবেক কোনো পারিতোষিক দিতে হল না।
১৭. বাই-দওলত
হায়দ্রাবাদে আদিল হাসানের মার্বেল-প্রাসাদের একটি শীতল কামরায় পাশাপাশি বসে আওরঙ্গজেব আর মুয়াজ্জম কথা বলছিলেন। তিনি তাকে বললেন, “এই শহর থেকে আদিল হাসান আর গোলকুন্ডা বাহিনীকে তাড়িয়ে দিয়ে তুমি খুব ভাল কাজ করেছ মুয়াজ্জম। সিকান্দারকে পরাজিত করে বিজাপুরকে মোগল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করার পর আওরঙ্গজেব সেদিন সকালেই তার অগ্রবর্তী সেনাদল নিয়ে মুয়াজ্জমের সাথে যোগ দিয়েছিলেন।
