অবশ্যই। আর ওদেরকে দেয়াল থেকে কেউ দেখে ফেললে, সেক্ষত্রে তাদেরকে গোলন্দাজ আর বরকন্দাজদের সহায়তা দিতে হবে। অবশ্য দেখা তো যাবেই।
‘একবার চেষ্টা করেই দেখা যাক। আগামীকাল মধ্যরাতের পরপরই এই অভিযান শুরু করবো। এই সময়ের মধ্যে ওরা যথেষ্ট পরিমাণে মাটি কেটে জোগাড় করে রাখতে পারবে।
ছত্রিশ ঘণ্টা পর অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আওরঙ্গজেব ভাবলেন, ওয়াজিম খান ঠিকই বলেছে। টাকার লোভে কয়েক হাজার শ্রমিক ঝুড়িভর্তি মাটি নিয়ে সমবেত হয়েছে। এদের সাথে কিছু স্থানীয় বাসিন্দাও যোগ দিয়েছে। অনেকেই কেবল নেংটি পরে খালি পায়ে এসেছে। আর সবার মুখ শুকনো। কয়েকজন লোক একটু সামনেই রাখা সিন্দুকভর্তি মুদ্রাগুলোর দিকে তাকাচ্ছিল। সফল হলে যে ওরা পুরস্কার পাবে তার প্রমাণ হিসেবে কড়া পাহারায় খোলা সিন্দুকগুলো সমবেত শ্রমিকদের একটু সামনেই সাজিয়ে রাখা হয়েছিল।
তার পরিকল্পনাটি ঘোষণা করার পর তিনি সেনা-নায়কদের সাথে বিষয়টি একটু ভালো করে সাজিয়ে নিয়েছিলেন। প্রথম সারির মজুররা পরিখা থেকে অর্ধেক দূরত্বে খোলা মাঠে মাটি ফেললে অর্থ পাবে। এতে বরকন্দাজরা আত্মরক্ষার জন্য মাটির নিচু দেয়াল পেয়ে ছুটে গিয়ে সেখান থেকে শত্রুর উদ্দেশ্যে গুলি ছোঁড়ে ওদেরকে সহায়তা দেবে। সেই সাথে কামান থেকেও গোলা ছোঁড়া হবে। পরবর্তী সারির মজুররা পরিখা পর্যন্ত তিন-চতুর্থাংশ দূরত্ব পার হয়ে মাটি ফেলবে, যাতে বরকন্দাজরা আরো সামনে এগোতে পারে। এরপর তৃতীয় এবং এর পরের সারির মজুরেরা সরাসরি পরিখাতে মাটি ফেলবে। এর পর প্রতি সারিতে দুইশোজন করে মোট বারোটি সারির মজুর বাকি থাকছে, যারা সবাই পরিখাতেই মাটি ফেলতে পারবে।
আওরঙ্গজেব তাঁর এক সেনাপতির দিকে তাকিয়ে বললেন, কাজ শুরু করার নির্দেশ দাও।’ কয়েকমিনিট পর লম্বা সরু পায়ে প্রথম সারির মজুররা মোগল শিবির এলাকা থেকে ছুটে বের হল। বেশিরভাগই মাথায় মাটিভর্তি ঝুড়ি নিয়ে ছুটছিল আবার অনেকেই দুজন করে বড় একটা বেতের ঝুড়িতে মাটি নিয়ে ধরাধরি করে ছুটছিল। অন্ধকারে যত দূর দেখা যায়, তিনি দেখতে পেলেন প্রথম সারির লোকগুলো পরিখার প্রায় একচতুর্থাংশ দূরত্ব পার হয়েছে। এমন সময় বিজাপুরের দেয়ালে মশাল জ্বলে উঠলো। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই গাদা বন্দুকের ফট ফট শব্দের সাথে বিজাপুরি কামানের গোলা বর্ষণ শুরু হল। সাথে সাথে তাঁর নিজের গাদা বন্দুকধারী আর কামান থেকেও প্রত্যুত্তর দেওয়া শুরু হল।
ঘন ঘন কামানের গোলার আলোয় তিনি দেখলেন কিছু শ্রমিক মাটিসুদ্ধ ঝুড়ি মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ে গেছে। দু-একজন আবার উঠে মোগল শিবিরের দিকে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ফেরার চেষ্টা করলো। বাকিরা মাটিতে স্থির হয়ে পড়েছিল কিংবা মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফট করছিল। যারা অক্ষত ছিল তাদের মধ্যে কয়েকজন মাথার ঝুড়ি ফেলেই ঘুরে ছুটে পালাল। তারপরও অনেকে পুরস্কারের লোভে মাটির ঝুড়ি নিয়ে ধোয়া আর অন্ধকারের মধ্য দিয়ে ছুটছিল। ওরা ঠিকই অধের্ক পথ পর্যন্ত গিয়ে মাটি ফেলে পেছন দিকে ঘুরলো। অন্ধকারে ছোট ছোট দলে মোগল বরকন্দাজরা কালো পোশাক পরে নিচু হয়ে মজুররা ঝুড়ির মাটি ফেলে যে, ছোট ছোট মাটির স্তূপ তৈরি করেছিল তার পেছনে অবস্থান নেবার জন্য ছুটতে শুরু করলো। কালো পোশাকের দরুন অন্ধকারে ওদেরকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল না। মাটিবহনকারী দ্বিতীয় দলটি দ্রুত ছুটলো। কয়েকজন শ্রমিক মাটিতে পড়ে থাকা প্রথম সারির শ্রমিকদের শরীরের সাথে ধাক্কা খেয়ে হোঁচট খেয়ে পড়লো। তবে বেশিরভাগই কামানের গোলা কিংবা গাদা বন্দুকের গুলির আঘাতে পড়ে গেল। তৃতীয় আর চতুর্থ সারিটি প্রচণ্ডবেগে ছুটতে শুরু করলো। আরো অনেকে পড়ে গেল, তারপরও বেশ কয়েকজন সামনের দিকে ছুটে গেল। মাত্র কয়েকজন সামনে যেতে রাজি হল না। পরিখার কিছুদূর পর্যন্ত ওরা এগোতে পারলো, অন্ধকার আর ধোঁয়ার কারণে আওরঙ্গজেবের দেখতে কষ্ট হচ্ছিল, তবে ভালই অগ্রগতি হচ্ছিল।
*
চারদিন পর আওরঙ্গজেব একা তার লাল তাবুতে বসে প্রাতরাশ করছিলেন। তার পরিকল্পনা আংশিক সফল হয়েছে। সেই প্রথম রাতে প্রায় একশো শ্রমিক পরিখায় মাটি ফেলতে পেরেছিল। কথামতো তিনি তাদের সকলকে পুরস্কারের মুদ্রা দিয়েছিলেন আর সেই সাথে প্রথম দুই সারির শ্রমিকেরাও মাটি ফেলার জন্য পুরস্কার পেল। ওদের প্রচেষ্টায় পরিখার গেঁজলা উঠা পানিতে একটি ছোট ঢিবির মতো দ্বীপ তৈরি হল। পরবর্তী রাতে তিনি পুরস্কার দ্বিগুণ করে আবার মাটি নিয়ে শ্রমিক পাঠিয়েছিলেন। এদের সাথে কয়েকটি হাতি কাঠের গুঁড়ি টেনে নিয়ে গিয়েছিল পরিখায় ফেলার জন্য। তবে এবার বিজাপুরিরা তৈরি ছিল। এবার খুব কম শ্রমিক পরিখা পর্যন্ত পৌঁছতে পেরেছিল। আর একটি ছাড়া আর সমস্ত হাতি কামানের গোলার আঘাতে মরে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিল। এই হাতিগুলোর মৃতদেহ এখন পরিখার কিনারায় মাটিতে পড়ে রয়েছে। যে হাতিটি পরিখা পর্যন্ত পৌঁছতে পেরেছিল, সেটা পেটে কামানের গোলার আঘাতে আহত হয়ে উল্টে পরিখার পানিতে পড়ে গিয়েছিল। সর্বত্র মানুষ আর হাতির লাশের দুর্গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে এসেছে। তবে আহতদের গোঙানিও কমে এসেছিল। তিনি কাউকে উদ্ধার করতেও নিষেধ করতে বাধ্য হয়েছিলেন, কেননা উদ্ধার প্রচেষ্টায় আরো প্রাণহানি হতে পারে।
