তারপর ছেলের দিকে কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আবার বললেন, প্রথমে বিজাপুরের বিরুদ্ধে আক্রমণ করবে যে মূল সেনাবাহিনী, তার নেতৃত্ব থাকবে কেবল আমার হাতে। তবে আমি তোমাকে একটা সুযোগ দেব, যাতে তুমি নিজেকে আবার যোগ্য প্রমাণ করতে পার। তুমি একটি প্রাথমিক অভিযানে নেতৃত্ব দিয়ে গোলকুন্ডা দুর্গ, তাদের সেনাবাহিনীর শক্তি আর তাদের মনোবল পরীক্ষা করে দেখবে।’
*
কামান টেনে আনার সময় তার ধাতব তীক্ষ্ণ শব্দ আওরঙ্গজেবের মাথার চারপাশে প্রতিধ্বনি করতে লাগলো। মাটির যে প্রতিরক্ষা বাঁধ গড়ে তোলা হয়েছিল, সেখান থেকে কেবল কামানের নলগুলো বের হয়ে রয়েছে। তারপর ওরা বিজাপুর দুর্গের পাথরের বুরুজের দিকে কামান দাগার জন্য প্রস্তুত হল। একবার গোলা ছোঁড়ার পর কামানের পেছন দিকের যে ধাক্কা হয়, তা সামাল দিতে গোলন্দাজ সেপাইরা মোটা রশি দিয়ে বেঁধে রাখার ব্যবস্থা করলো। ঘামে ভেজা শরীরের কোমর পর্যন্ত জামা খুলে ওরা কঠোর পরিশ্রম করছিল। তারপর বারুদ আর গোলা লম্বা নলের ভেতরে ভরলো। এরপর ওরা ধরাধরি করে কামানটি তুলে নিয়ে এর ভারী সামনের অংশটি গোলা ছোঁড়ার অবস্থানে রাখলো।
বিজাপুর দুর্গ অবরোধ করা শুরু করার পর গত ছয় সপ্তাহে বেশি গরম হয়ে যাওয়ার কারণে কিংবা এর ঢালাইয়ের কোনো সমস্যা থাকায় কয়েকবার কামানের নল ফেঁটে গিয়েছিল। গোলন্দাজ সৈনিক আর ঢালাই কারখানার কারিগরদেরকে তাদের কাজ সঠিকভাবে জানতে হবে। তারপরও কামানের সামনের অংশ নতুন করে তৈরি করে, অতিরিক্ত লোকজনদের প্রশিক্ষণ দিয়ে, তারপর বর্ষার পর ভারী ভারী কামান আর অন্যান্য জিনিসপত্র দাক্ষিণাত্যের পাহাড়ি এলাকা দিয়ে টেনে আনা মানে বিজাপুর আর গোলকুন্ডা বিজয় করে তার সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করতে করতে প্রায় একবছর লেগে যাবে। এরপরই তিনি আকবর আর সম্ভাজির দিকে মনোযোগ ফেরাতে পারবেন।
একবার কামানের গোলা ছোঁড়ার পর হাওয়ায় ধোঁয়ার কুণ্ডলি সরে যেতেই তিনি কামান ছোঁড়ার ছিদ্রসহ বিজাপুরের দেয়াল আর তার উপরে উঁচু প্রাসাদের বিখ্যাত সাদা মার্বেল পাথরের তৈরি গম্বুজগুলো দেখতে পেলেন। শহরের দেয়ালের বিভিন্ন জায়গায় কামানের গোলার আঘাতে গর্তের মত দাগ দেখা গেলেও দেয়ালটি প্রায় অক্ষতই রয়ে গেছে। মূল ফটকের দালান যেস্থানে রয়েছে সেই জায়গার দেয়ালটিতে অনেক গোলা ছোড়লেও কোনো হেরফের হয় নি। এখান থেকেই এঁকেবেঁকে একটি ঢালু পথ শহরের দিকে চলে গেছে। শক্তিশালী দেয়াল ছাড়াও বিজাপুরের চারপাশ ঘিরে একটি দুর্গপরিখা রয়েছে। পরিখাঁটি অর্ধেক গভীরতা পর্যন্ত পানি ভরা। এছাড়া মোগলদের হামলার কথা শুনে পরিখার সামনে বেশকিছু জায়গার ঘাস আর ঝোঁপঝাড় পুড়িয়ে পরিষ্কার করা হয়েছে। এর ফলে কোনো হামলাকারী এগোলে দেয়াল থেকে কামানের গোলা আর গাদা বন্দুকের গুলিও সহজে ছোঁড়া যাবে। অগত্যা গাদা বন্দুকের পাল্লা এড়াতে তাকে তার কামানগুলো আরো পেছনে বেশ দূরে স্থাপন করতে হয়েছিল। এর ফলে সবচেয়ে বড় কামান থেকে গোলা ঘোড়লেও দূরত্বের কারণে পাথরের দেয়ালে আঘাত করার আগে এর শক্তি কমে যাচ্ছিল। বিজাপুরিরা শহরে খাদ্য আর অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ ইত্যাদি প্রচুর পরিমাণে মজুদ করার যথেষ্ট সময় পেয়েছিল। আর বৃষ্টির পানি থেকেও যথেষ্ট পরিমাণে পানি ধরে রাখতে পেরেছিল। ওরা কেবল মাঝে মাঝে আওরঙ্গজেবের সৈন্যদের দিকে গোলা ছোঁড়তো,যখন নিশ্চিত হত যে লক্ষভেদ করতে পারবে। আর এতে ওদের গোলাবারুদেরও অপচয় হচ্ছিল না। গোলকুন্ডা কিংবা মারাঠিরা সাহায্য পাঠাবার আগে তাকে বিজয় লাভ করতে হলে একমাত্র সামনাসামনি আক্রমণ ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
তিনি ঘুরে ওয়াজিম খানের দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমার কোনো ধারণা আছে ফটকের সামনে যে পরিখাঁটি আছে সেটা কিভাবে ভরাট করে আমরা একবার ফটকের দিকে আক্রমণ চালাতে পারি?
‘আমার প্রথম ভাবনা হল জাহাপনা, এ ধরনের কোনো প্রচেষ্টা করতে হলে আমাদেরকে অন্ধকার কিংবা ধোঁয়ার আড়ালে কাজ করতে হবে।
ধোয়া যথেষ্ট নয়, আর এটা বাতাসের মর্জির উপর নির্ভর করে। তবে অন্ধকার তো হবেই।’
কয়েকদিন পরই পূর্ণিমা। আমাদের মনে রাখতে হবে পূর্ণিমার আলো আমাদের জন্য সমস্যা সৃষ্টি করবে।’
‘আমিও তাই ভাবছি। আশা করি এর আগেই কাজ শুরু করতে পারবো।
ওয়াজিম খান কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বললো, জাহাপনা, পরিখাঁটি একটা কঠিন বাধা, তবে আমার কাছে একটা ফন্দি আছে। একসাথে কাজ করে আমরা অনেকবার পুরস্কারের শক্তির প্রমাণ পেয়েছি। ধনী-গরিব সকলেই অর্থের জন্য লালায়িত। শিবির স্থাপন আর মাটির কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার পর আমাদের সাথে অনেক বেকার মজুর রয়ে গেছে। ওরা গরিব আর প্রায় অনাহারেই রয়েছে। আমরা ওদেরকে আর কোনো কাজই দিতে পারছি না। ওদেরকে যদি বলি এক ঝুড়ি মাটি পরিখার পানিতে ফেললে কয়েকটি মুদ্রা। পাবে তাহলে কেমন হয়?
চমৎকার বলেছ! তুমি যেরকম বলেছ, ওদেরকে দেওয়ার মতো কোনো কাজ আমাদের হাতে নেই সেক্ষেত্রে এ প্রস্তাবটি দিতে ক্ষতি কী? আর আমার মনে হয় তোমার কথাই ঠিক, ওদেরকে আমাদের শিবির থেকে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে দেওয়ার দরকার নেই। তার চেয়ে বরং অর্থপুরস্কার দিলে ওরা খুশি মনেই জীবন বাজি রেখে কাজটা করবে। তবে একাজে সফলতা পেতে গেলে একসাথে অনেক জনকে অন্ধকারে এগিয়ে যেতে হবে।’
