আওরঙ্গজেব তার চেয়ারের হাতলে একটা ঘুষি মেরে বললেন, ইসলামের অনুসারীদের মধ্যে কী কোনো সংহতি নেই?
‘দুই শাসকই মনে করেন সম্ভাজির চেয়ে আপনি ওদের বড় ভীতি। এছাড়া ওরা ওদের নিজেদের জীবন কিংবা প্রতিবেশীদের প্রতি তাদের রাজ্যের নীতি আমাদের ধর্মের রীতি অনুযায়ী পরিচালিত করে না। ওরা অন্য বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে।
‘তার মানে কী বলতে চাচ্ছ তুমি?
তার পূর্ববর্তী অনেক শাসকের মতো গোলকুন্ডার শাসক আদিল হাসান ধর্মীয় অনুশাসন মানার বিষয়ে অত্যন্ত শিথিল। তিনি লাম্পট্য ব্যবহারের সুযোগ দেন আর নিজের প্রতিটি কামনা-বাসনা মেটাতে গিয়ে তার সম্পদ উড়িয়ে হৈচৈ করে আনন্দোপভোগ করে দেশকে উচ্ছন্নের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। দূতিয়ালির কাজে হায়দারাবাদে একবার গিয়ে আমি নিজের চোখে যা দেখেছি তার একটা উদাহরণ দিতে পারি। শুক্রবার পবিত্র দিন হলেও আদিল হোসেন তার বেলকনি থেকে একটি অনুষ্ঠান উপভোগ করছিলেন। সংক্ষিপ্ত আর আঁটোসাটো স্বচ্ছ চোলি আর গায়ে সেঁটে থাকা পায়জামা পরা প্রায় এক হাজার নর্তকী উঠানে ঢুকলো। গোলকুন্ডি ঢোলকের তালে তালে ওরা যখন নিতম্ব ঠেলে চক্রাকারে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নাচতে শুরু করলো, তখন আদিল হাসানের নির্দেশে বড় বড় পিপায় তাড়ি এনে মাঠের প্রত্যেক কোণে রাখা হল। সেখান থেকে তাড়ি জগে ঢেলে মাঠের চতুর্দিকে বসা তার কিছু প্রিয় সেনাপতি আর সভাসদদের পরিবেশন করা হল। ওরা সাথে সাথে সেই কড়া তাড়ি খেতে ঝাঁপিয়ে পড়লো।
‘অন্ধকার হতেই পরিচারকরা লম্বা লম্বা মোমবাতি জ্বেলে দিল আর ঢোলকের বাজনা আরো উত্তাল হয়ে উঠলো। আর এদিকে মেয়েরা গান অন্যান্যরাও গাইতে শুরু করলো, আর কিছু কিছু মেয়ে বুকে হাত রেখে উচ্ছঙ্খল ভঙ্গি করতে লাগলো। কামনায় উত্তেজিত হয়ে কিছু পুরুষ মাঠে নেমে পড়তেই মেয়েরা চোলি পুরোপুরি খুলে ঘামে ভিজে চকচক করা বুক উন্মুক্ত করে দিল। একটু পরই কিছু নারী-পুরুষ নির্লজ্জভাবে সবার সামনে দেহমিলন করতে লাগলো। আর অন্যরা উঠানের মাঝখানে যে ফোয়ারা ছিল সেখানে লাফাতে শুরু করলো। ফোয়ারাতেও তাড়ির বন্যা ফেলে সয়লাব করা হয়েছিল। এরকম লালসাপূর্ণ দৃশ্য আমি আর কখনও দেখিনি, জাহাপনা। এমনকি আদিল হাসানও ওদের সাথে যোগ দিলেন। তিনি আর তার এক পত্নী বেলকনিতে দাঁড়িয়ে জড়াজড়ি করা শুরু করলেন–’
যথেষ্ট হয়েছে গোলকুন্ডার কেচ্ছা! এ ধরনের অধার্মিক অনৈতিক ঘটনার বিশদ বর্ণনা দেওয়ার আর দরকার নেই। এখন বল বিজাপুরিরা কেন সম্ভাজি আর আকবরকে সাহায্য করছে?
‘ওদের রাজা সিকান্দার একজন দুর্বলচিত্তের যুবক আর ওদের কোষাগার প্রায় শূন্য হয়ে যাওয়ায় শাসক পরিবারের নিজেদের মধ্যে বিভেদ দিন দিন গুরুতর হতে শুরু করেছে। বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন দলের বেশিরভাগই তাদের অভ্যন্তরীণ বিবাদে মারাঠিদেরকে সম্ভাব্য মিত্র এবং সেই সাথে আপনার বিরুদ্ধে একটি প্রতিরক্ষা শক্তি হিসেবে বিবেচনা করে। আপনার বিরুদ্ধে আকবর আর মারাঠিদের লড়াইয়ে সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার জন্য ওরা নিজেদের মধ্যে প্রতযোগিতা করছে, যাতে এর বিনিময়ে তাদের সমর্থন লাভ করে। সিকান্দার নিজে বিশ্বাস করেন তার ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য মারাঠিদের সহায়তাই তার জন্য শ্রেষ্ঠ উপায়।
আওরঙ্গজেব এবার উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “এই শাসকরা এখন শিখবে হঠাৎ গজিয়ে উঠা এক বিশ্বাসঘাতকের সঙ্গী হওয়াটা ঠিক নয়। আমি ঠিক করেছি আমরা বিজাপুর আর গোলকুন্ডা বিজয় করবো। এর ফলে বিধর্মী পাহাড়ি ইঁদুর সম্ভাজি আর আমার বিশ্বাসঘাতক ছেলে তাদের সহায়তা হারাবে আর সেই সাথে আমাদের সাম্রাজ্যের পরিধিও বেড়ে যাবে।
সাথে সাথে আওরঙ্গজেবের কয়েকজন সেনাপতি সমস্বরে চিৎকার করে উঠলো, ‘আল্লাহু আকবর। আওরঙ্গজেব জিন্দাবাদ। সম্রাট দীর্ঘজীবী হোন! অন্যরাও তাদের সাথে সুর মিলিয়ে মুষ্টিবদ্ধ হাত উঁচু করে তার সিদ্ধান্তকে অকুণ্ঠ সমর্থন জানাল।
পুরো আলোচনার সময় মুয়াজ্জম তার বাবার চেয়ারের পাশে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলেন। শোরগোল থেমে যাবার পর তিনি ধীরে ধীরে বললেন, ‘বাবা, আপনার নিশ্চয়ই মনে আছে দক্ষিণে আমার অভিযানের অগ্রগতি কিরকম ধীরগতির ছিল। যদিও আপনি মনে করেন এর বেশিরভাগ আমার দোষে হয়েছে, তবে আমি তা সত্যিকার বিশ্বাস করি না। ঐ এলাকাটি অত্যন্ত রুক্ষ। আর সম্ভাজির প্রতি বিশ্বস্ততার ব্যাপারে মারাঠিরা সবাই প্রচণ্ডভাবে ঐক্যবদ্ধ। আর ওরা বেশ কয়েকবার প্রমাণ করেছে যে, ওরা দুর্ধর্ষ যোদ্ধা। আর সে হিসেবে ওরা বিজাপুর এবং বিশেষত গোলকুন্ডারও যোদ্ধা। আমার মনে হয় বিজয় নিশ্চিত করতে হলে আমাদেরকে একটি বড় ধরনের সেনাবাহিনীর ব্যবস্থা করতে হবে–এমনকি সম্ভাজির বিরুদ্ধে অভিযানে যে সেনাদল এখন রয়েছে তার চেয়েও বড়। এ ধরনের একটি সৈন্যবাহিনী গড়ে তুলতে বেশ সময়ের প্রয়োজন আর হয়তো খাজনার পরিমাণ আরো বাড়িয়ে দিতে হবে। আর এতে প্রজাদের কষ্ট বেড়ে যাবে আর ওদের মধ্যে আরো অসন্তুষ্টি দেখা দিতে পারে।
‘মুয়াজ্জম, তুমি সবসময় কেন এরকম ভয়ে ভয়ে থাক? তুমি নিশ্চয়ই আমাকে ভাল করেই জান, সুতরাং বুঝতেই পেরেছ, বিজাপুর আর গোলকুন্ডার শাসকদের বিরুদ্ধে আমার এই ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ আর ওদেরকে হটিয়ে দিয়ে সাম্রাজ্যের পরিধি বাড়ানোর সিদ্ধান্তটি যেরকম হঠাৎ করে নেওয়া মনে হচ্ছে, আসলেই তা নয়। বেশ কিছুদিন থেকেই আমি ওয়াজিম খানের গুপ্তচরদের কাছ থেকে যেসব খবর পাচ্ছিলাম, তার সাহায্যে ওদের বিরুদ্ধে আমাদের সেনাবাহিনীর তুলনামূলক শক্তি যাচাই করেছি। কাজেই আমি তোমাকে আশ্বস্ত করছি বর্তমানে আমাদের যে সেনা আছে তা এরজন্য যথেষ্ট।
