‘আমি তোমার কথা বিশ্বাস করি।’ কথাটি বলে আওরঙ্গজেব তার চারপাশে বসা সেনাপতিদের দিকে তাকালেন, কিন্তু মাত্র কয়েকজন তার চোখে চোখে তাকাতে পারলো। তারপর তিনি আবার ফিরোজ বেগের দিকে ঘুরে বললেন, ‘এখন আকবরের শিবিরের খবর কী বল?
‘আপনি অগ্রসর হতেই ওরা দাক্ষিণাত্যের পাহাড়ি এলাকার আরো ভেতরে ঢুকে যেতে বাধ্য হচ্ছে, আর এতে গত কয়েক মাসে আকবর আর সম্ভাজি, একে অপরের উপর অসন্তুষ্ট হয়ে উঠছেন। বিশেষত সম্ভাজির অতিসর্তকতা দেখে আকবর ধৈর্য হারিয়ে ফেলছিলেন…’
‘তুমি কী করে তা জানলে?
এবার আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়ে ফিরোজ বেগ বেশ জোরালো গলায় বললো, ‘মাত্র ছয় সপ্তাহ আগে আমি একটি গোপন সমরসভায় উপস্থিত ছিলাম। সেখানে আকবর আর সম্ভাজিসহ মোট বারোজন উপস্থিত ছিল। সেখানে আকবর প্রস্তাব করলেন, দাক্ষিণাত্যের পাহাড়ি এলাকা থেকে বের হয়ে আপনার এলাকায় গিয়ে আপনার সেনাবাহিনীর মুখোমুখি হতে। এছাড়া তিনি আরো মিত্র খোঁজার জন্য ওদেরকে আহ্বান করলেন। এমনকি তিনি আমার নাম উল্লেখ করে বললেন, রাজপুতদেরকে আবার তার সাথে যোগ দেবার জন্য উৎসাহিত করতে আমাকে সেখানে পাঠানো যেতে পারে। তিনি প্রবল উৎসাহ দেখিয়ে ওদের সামনে একটি চিত্র তুলে ধরলেন, দ্রুত এগিয়ে ওদের সম্মিলিত আক্রমণের মুখে আপনার বাহিনী ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে আর এভাবে সহজ জয় পাওয়া যাবে। তবে এ প্রস্তাবে সম্ভাজি একটু সন্দিহান ছিলেন। তিনি আকবরকে প্রশ্ন করলেন যে, কতজন মিত্র তিনি নিশ্চিত করতে পেরেছেন, আর তিনি যুদ্ধ বিজয়ের ব্যাপারেও নিশ্চয়তা চাইলেন, কারণ তার সৈন্যদেরকে যদি অতিপরিচিত পাহাড়ি এলাকার আশ্রয় ছেড়ে উষ্ণ সমতলভূমি আর মরু এলাকায় যেতে হয়, সেক্ষেত্রে যুদ্ধে জয়লাভের নিশ্চয়তা কতটুকু আছে। তাছাড়া সেখানে তারা শক্তিশালী আর ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত মোগল সেনাবাহিনীর সামনে অরক্ষিত হয়ে পড়বে। আকবর তাকে উত্তরে বললেন, হিন্দুস্তানের সকল মানুষের স্বার্থে আপনার কাছ থেকে মোগল সিংহাসন কেড়ে নেওয়ার মিশনের প্রতি তার বিশ্বাস থাকতে হবে।
‘সম্ভাজি হেসে বললেন, “আপনার এই মহান ব্রতের কারণে আপনি সামনে এগোতে চাচ্ছেন কিন্তু এতে কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না, আমি কেন যাব। কেন আমি একটি মাত্র ঝুঁকির কারণে আমার বাবার সকল অর্জন নষ্ট করবো? তিনি বাস্তবতার কথা চিন্তা করে সবকিছু পরিকল্পনা করেছিলেন। আমার হয়তো আমার বাবার মতো সামরিক কুশলতা নেই, তবে আমি জানি তিনি কখনও আপনার এধরনের প্রস্তাবে রাজি হতেন না, আর আমিও হবো না। আমাদেরকে ছোট ছোট নিশ্চিত পদক্ষেপ নিতে হবে।”
আকবর প্রতিবাদ করলেন, কিন্তু এতে তো অনেক সময় লেগে যাবে।’
সম্বাজি উত্তরে বললেন, ‘সময় আমাদের অনুকূলে আছে। আমরা আপনার বাবার চেয়ে বয়সে অনেক ছোট। যতই দিন যাবে ততই তিনি জনগণের কাছ। থেকে দূরে সরে যাবেন আর এতে আমাদের কাজও সহজ হয়ে আসবে। আমরা যদি তার সেনাবাহিনীকে বেশিদিন এখানে আটকে রাখতে পারি, তাহলে তাদের মনোবল দুর্বল হয়ে পড়বে আর এর খরচ চালাতে গিয়ে তাঁকে খাজনার বোঝা বাড়িয়ে দিতে হবে।
এভাবে তর্কাতর্কি করতে করতে এক পর্যায়ে উত্তেজিত হয়ে সম্ভাজি আকবরকে তার বোকামি আর অপরিণামদর্শী আশাবাদের জন্য দোষারোপ করলেন। তখন আপনার শান্তস্বভাবের ছেলে গর্জে উঠলেন, “আমি তো লড়াই না করবার স্বপক্ষে যুক্তি না দেখিয়ে অন্তত লড়াই করতে তো চাচ্ছি। এতে রেগে গিয়ে সম্ভাজি আকবরের দিকে ছুটে গিয়ে তাকে একটা ঘুষি মারলেন। আকবর একপাশে সরে গিয়ে তার ঘুষি এড়িয়ে তাকে জাপটে ধরে মাটিতে ফেলে মল্লযুদ্ধ শুরু করলেন। তারপর ওরা সেখানে ছোট ছেলেদের মতো মাটিতে গড়াগড়ি খেয়ে লড়ে যেতে লাগলেন। শেষ পর্যন্ত আমরা সবাই মিলে তাদেরকে আলাদা করলাম। পরে ওরা নিজেদের মধ্যে মিটমাট করলেন। তবে সেটা আনুষ্ঠানিকভাবে করলেন, কেননা ওরা বুঝতে পেরেছিলেন, ওদের পরস্পরের সহায়তার প্রয়োজন আছে। তবে সম্ভাজি শক্তিক্ষয়ের যুদ্ধ এড়িয়ে চলার নীতি অনুসরণ করে চললেন আর দাক্ষিণাত্য থেকে বের হয়ে মাঝে মাঝে সংক্ষিপ্ত হামলা ছাড়া অন্যকোনো কিছু করার ব্যাপারে অনীহা দেখালেন। আকবর এতে আরো হতোদ্যম আর নিরাশ হয়ে পড়লেন। প্রকৃতপক্ষে তার মন এত খারাপ হয়ে গেল যে, তিনি পারস্যে গিয়ে শাহের সহায়তা কামনা করার কথা বলতে শুরু করলেন, যেরকম আপনার পর্বপুরুষ হুমায়ুন করেছিলেন। এমনকি তিনি প্রস্তাব করলেন, আমাকেই দূত হিসেবে পাঠাবেন।
আওরঙ্গজেব উত্তরে বললেন, যদি আমার ছেলে পারস্যে যায় তবে সে নিজেকে আরো বিশ্বাসঘাতক হিসেবে প্রমাণ করবে। তবে একথাটা শুনে ভেতরে ভেতরে একটু আশ্বস্ত হলেন যে, আকবর হয়তো হিন্দুস্তান থেকে পালিয়ে যাবে। এতে তিনি একটা উভয়-সঙ্কটে পড়ে গিয়েছিলেন যে, ধরা পড়লে তাকে কোতল করা হবে কি-না। তবে সে যদি দাক্ষিণাত্যে রয়ে যায় তবে অবশ্যই করবেন। তবে আরেকদিকে হিসেব করছিলেন, শাহ আর আকবরের মৃত মায়ের শক্তিশালী পারসিক সম্পর্ক কতটা কাজ দেবে আর ওরা একসাথে মিলে তার সদা অশান্ত উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে অসন্তোষ সৃষ্টিতে কতটুকু ইন্ধন জোগাতে পারবে। যাইহোক এসব চিন্তা একপাশে সরিয়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “আমার সেনাবাহিনী এড়িয়ে আকবর আর সম্ভাজি কিভাবে অর্থ আর সেনাবাহিনীর অস্ত্রশস্ত্র আর রসদ জোগাড় করছে? ‘ওরা বিজাপুর আর গোলকুন্ডার সাহায্য পাচ্ছে, জাঁহাপনা। বিজাপুরিরা মারাঠি সৈন্যদেরকে তাদের এলাকা দিয়ে আসা-যাওয়ার নিরাপদ পথ দিচ্ছে আর আপনার সেনাবাহিনী ওদের পিছু নিলে ওদেরকে আশ্রয় দিচ্ছে। এর বিনিময়ে ওরা আপনার এলাকা থেকে লুটপাট করে যা পায়, তার একটি অংশ বিজাপুরিরা পেয়ে থাকে। আর গোলকুন্ডিরা তাদের কয়েকটি হীরার খনি থেকে হীরা পাঠিয়ে স্থানীয় বে ঘোড়া কেনার অর্থ জোগাড় করছে। আর উপকূলের নতুন একটি বন্দর স্থাপনা–বোম্বে (মুম্বাই) হতে ইংরেজদের কাছ থেকে সর্বাধুনিক কামান আর গাদা বন্দুক কিনছে। গোলকুন্ডিরা মারাঠিদেরকে আপনার বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষার প্রথম ব্যুহ মনে করে।
