তিনি বললেন, একটা ছোট্ট জয়ের পর আকবর একটা মুরগির বাচ্চার মতো খুশিতে চেঁচাচ্ছে। আর বিজয়স্মারক হিসেবে কয়েকটা পতাকা দখল করে সেগুলো আমার কাছে পাঠাবার মতো ধৃষ্টতা দেখিয়েছে। সে যেরকম বোকা সেরকম উদ্ধত আর নিজের সম্পর্কে অতিমাত্রায় উচ্চ ধারণা পোষণ করে।
‘আমি জানি সে সীমালঙ্ঘন করেছে আর আমি কখনও তার স্বপক্ষে কিছু বলবো না। তবে নিজের রক্তমাংসের সন্তান সম্পর্কে এভাবে আপনার কথা বলাটা আমার পছন্দ হচ্ছে না। এতে আমার ভয় হচ্ছে যদি আমাদের ছেলে কমবক্স কখনও আপনাকে অসন্তুষ্ট করে, তাহলে তার কী হবে।’
‘তুমি জান আমি কমবক্সকে ভালোবাসি। তবে বড় হলে তাকে শিক্ষা নিতে হবে, যা আকবর নেয় নি; আর সেটা হল আমাকে মান্য করা আর কর্তব্যপরায়ণ হওয়া। আশা করি বড় হওয়ার পর কমবক্স আমাকে নিরাশ করবে না। তবে তার ভাগ্য তার হাতেই রয়েছে, সে কি করতে চাইবে তার উপর। তাকে এটা বুঝিয়ে আর এটা করে মা হিসেবে তুমি একজন সন্তানের জন্য সবচেয়ে ভালো কাজই করবে–বিশেষত যে ছেলে একজন শাহজাদা।
উদিপুরী গ্লাস থেকে আরেক চুমুক শরবত খেলেন। আওরঙ্গজেব তার সুন্দর চেহারা এরকম বিষণ্ণ হতে খুব একটা দেখেন নি, তবে তাকে বাস্তবতা বুঝতে হবে–তিনি একজন সম্রাট। লক্ষ লক্ষ মানুষের নিয়তি তাঁর হাতে। দয়া এবং সমবেদনা–এসব হচ্ছে দুর্বলতা এবং নারীসুলভ ভাবাবেগ–যা জাহানারা কখনও স্বীকার করেন নি। এমনকি নিজ পরিবারের প্রতিও দেখানো যাবে না। উদিপুরী জিজ্ঞেস করলেন, এখন আপনি কী করবেন? মানে আকবরের কথা বলছি।’
‘এখানে যা করতে এসেছি তাই করবো। মূল সেনাবাহিনী নিয়ে অগ্রবর্তী বাহিনীর সাথে মিলিত হব। তারপর তাদের নেতৃত্ব দিয়ে তাকে পরাজিত করে চিরদিনের জন্য তার ঔদ্ধত্য সেখানেই শেষ করে দেব। তিনদিনের মধ্যে বোরহানপুর ছেড়ে চলে যাব।
১৬. ইসলামের মাঝে শত্রু
আওরঙ্গজেব মৃদু হেসে তাঁর বিশ্বস্ত গুপ্তচরবাহিনী প্রধান ওয়াজিম খানকে বললেন, ‘ওয়াজিম খান, ওদের সেনাবাহিনী ছেড়ে যে লোকটি পালিয়ে এসেছে, তাকে এখানে নিয়ে এস। আর তাকে আশ্বস্ত কর তার কোনো ভয় নেই। তুমি তাকে যে কথা দিয়েছ তা আমি অবশ্যই রাখবো।’ সে যত দ্রুত সম্ভব সর্বাধিনায়কের লাল তাঁবু থেকে বের হয়ে গেল। ওয়াজিম খান তাঁকে ইতোমধ্যে তার বিশ্বাসঘাতক ছেলের সাথে সম্ভাজির সুবিধাজনক মিত্রতার কথা জানিয়েছে। এখন সে কথা তিনি এবং তাঁর সেনাপতিরাও আবার শুনবেন।
ছয়মাস আগে বোরহানপুর থেকে বের হয়ে তিনি তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে কোনো বাধা ছাড়াই দাক্ষিণাত্যের ভেতরে গোদাবরি নদীর তীর পর্যন্ত পৌঁছেছেন। এখন সেখানেই সেনাবাহিনীসহ তাঁবু গেড়েছেন। কিন্তু আসলে কি অর্জন করেছেন? কেবল তার লোকজনের চরম পরিশ্রান্তি আর কোষাগার খালি হয়েছে। আকবর, সম্ভাজি আর তার সৈন্যরা রুক্ষ পাহাড়ি এলাকায় লুকিয়ে রয়েছে আর সরাসরি যুদ্ধ না করে মাঝে মাঝে চোরাগোপ্তা হামলা করে পালিয়ে যাচ্ছে। এমনকি তার গুপ্তচরেরাও কোনো কিছু খুঁজে আনতে পারে নি। তবে এবার মনে হচ্ছে ওয়াজিম খান ভয় দেখিয়ে আর প্রতিশ্রুতি মিলিয়ে যে ধরনের কাজ করে থাকে, তা কাজে লেগেছে। ঠিক এরকম করা হয়েছিল তাহাব্বুর খানের সাথে। সে এখন উত্তর কাশ্মিরে একটি অখ্যাত চৌকিতে অপরাধবোধে পীড়িত বিবেক নিয়ে ক্রমশ নির্জীব আর ক্ষীণ হয়ে দিন কাটাচ্ছে।
একটু পরই সুন্দর করে দাড়ি ছাঁটা হালকা-পাতলা গড়নের একজন যুবককে নিয়ে ওয়াজিম খান হাজির হল। সে আওরঙ্গজেবকে কুর্নিশ করতেই ওয়াজিম খান বললো, “জাঁহাপনা, এ হচ্ছে ফিরোজ বেগ। কয়েকদিন আগেই সে আপনার ছেলের সাথে ছিল।
‘ওঠ ফিরোজ বেগ। এখানে সবাই তোমার পরিচয় জানে না। সবাইকে জানাও তুমি কে আর বিশ্বাসঘাতক আর নীচ আকবরের কাছে তোমার কী অবস্থান ছিল।’
‘আমি আপনার পুরোনো সহকারী কোষাধক্ষ্য মোহাম্মদ বেগের একমাত্র পুত্র। আমাদের পরিবার আপনার পূর্বপুরুষ বাবরের সাথে ফারগানা থেকে এদেশে এসেছে।
আওরঙ্গজেব মাথা নাড়লেন। মোহাম্মদ বেগের জীবনের শেষ বছরগুলো নিশ্চয়ই খুবই কষ্টকর হত, যদি তার ছেলে সহযোগিতা না করতো। এব্যাপারে ওয়াজিম খানের চালাকির চাবিকাঠি এখানেই ছিল। তারপর তিনি বললেন, ‘বিদ্রোহী শিবিরে তোমার কী ভূমিকা ছিল।
‘আমি একজন উপদেষ্টা ছিলাম। সম্ভাব্য মিত্র খোঁজার জন্য আকবর মাঝে মাঝে আমাকে তার দূত হিসেবে বিদেশিদের কাছে পাঠাতেন।’ কথাটা বলার সময় ফিরোজ বেগের গলার স্বর একটু ইতস্তত করছিল, তার কথা ঠিকমতো শোনা যাচ্ছিল না।
বল, আর কোন দায়িত্ব ছিল তোমার? আওরঙ্গজেব জানতেন, ফিরোজ বেগের ব্যাপারে ওয়াজিম খান প্রথমে তখনই খোঁজখবর নিতে শুরু করে, যখন জানা গিয়েছিল যে, সে আওরঙ্গজেবের একজন সেনাপতিকে ঘুষ দিয়ে হাত করার চেষ্টা করছিল। কারও আনুগত্য দোদুল্যমান হয়ে যেতে পারে ভেবে, তিনি তাদেরকে বুঝতে দিয়েছিলেন যে, আকবর যে কারও সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছে এ সম্পর্কে তিনি সজাগ। ফিরোজ বেগ বললো, অনেক সময় আমি আপনার রাজদরবারের কারও কারও সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু পরবর্তীতে ওয়াজিম খানকে সাহায্য করেছিলাম তাদের নাম প্রকাশ করতে, যারা আপনার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করতে যাচ্ছে। এটা আমি শপথ করে বলতে পারি, জাঁহাপনা।’
