নিজেকে সামলে নিয়ে আকবর দেখলেন আধো-অন্ধকারে কয়েক ফুট সামনে সবুজ পোশাকপরা একজন বরকন্দাজ একটি ভাঙ্গা ইটের দেয়ালের আড়ালে অর্ধেক লুকিয়ে রয়েছে। দ্বিতীয়বার গোলার জন্য লোকটি মনোযোগ দিয়ে তার গাদা বন্দুকের লম্বা নলে বারুদ আর গোলা ভরছিল। আকবর ছুরি বের করে সামনে ছোঁড়ার জন্য হাত পেছনে নিতেই লোকটি মুখ তুলে তাকাল। পাকা চুলের লোকটিকে দেখে চিনতে পেরে আকবরের দম বন্ধ হয়ে এল। যুবক বয়সে করিম খান আওরঙ্গজেবের বিশ্বস্ত দেহরক্ষীদলের একজন সদস্য ছিল। আকবর একটু ইতস্তত করলেন, প্রায় হাত নামিয়ে ফেলতে যাচ্ছিলেন। তারপর দেখলেন করিম তাকে দেখেই পরিষ্কার চিনতে পেরে গম্ভীর মুখে দ্রুতহাতে বন্দুকে গোলা ভরার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। আকবর আর দেরি না করে ছুরিটা ছুঁড়ে মারলেন। ছুরির ডগাটি করিম খানের গলায় বিধলো, সে তখন বন্দুক খাড়া করে আকবরের দিকে তাক করছিল। ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হতেই প্রবীণ লোকটি সামনে পড়ে গেল, আর তার হাত থেকে গাদা বন্দুকটি ছিটকে আকবরের পায়ের কাছে পড়ে গেল।
যন্ত্রণায় ছটফট করা করিম খানের দেহের উপর দিয়ে লাফ দিয়ে আকবর কয়েকগজ সামনে তার লোকজনের দিকে ছুটলেন। ওরা তখন দুর্গের আরো ভেতরে ঢোকার জন্য লড়াই করে যাচ্ছিল। একজন তরুণ সেনা কর্মকর্তা তরোয়াল হাতে নিয়ে ওদের আগে আগে ছুটে ভেতরের একটি ফটকের দিকে যাচ্ছিল। তারপর সে হঠাৎ চিৎকার করে ঘুরে পড়ে গেল। তরোয়াল ফেলে দিয়ে একহাতে নিজের গলা চেপে ধরলো। শত্রুপক্ষের বরকন্দাজদের গাদা বন্দুকের গোলা লক্ষভ্রষ্ট করার জন্য আকবর তার লোকদের সাথে মিলে এলোপাতাড়ি মোগল সেনাদের দিকে তরোয়াল চালাতে শুরু করলেন। ওরা ওদের আবাস থেকে বের হয়ে অস্ত্র হাতে নিয়ে তৈরি হওয়ার জন্য চেষ্টা করছিল। রক্তে পিচ্ছিল পাথরের মেঝেতে কয়েকবার তার পা পিছলে গেল। তাসত্ত্বেও আকবর তার লোকদের সাহায্যে এগিয়ে গেলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় ওরা তখন দৃঢ়সংকল্প অল্প সংখ্যক মোগলদেরকে ধীরে ধীরে পিছু হটতে বাধ্য করছিল। তারপর ওরা একটি খিলানে ঢাকা চওড়া তোরণের মধ্য দিয়ে দুর্গের অভ্যন্তরস্থ উঠানের দিকে ছুটে গেল। দেহ শক্ত করে তিনি আরো শত্রুর খোঁজে চারপাশে তাকালেন, তবে অধিকাংশই দুর্গের দালানের ভেতরে পালিয়ে গেছে, আর কয়েকজন অস্ত্র মাটিতে ফেলে আত্মসমর্পণ করলো।
দুর্গের ছাদে তখনও প্রচণ্ড লড়াই চলছিল। আকবর মুখ তুলতেই দেখলেন একজন লোক উপর থেকে মাথা নিচের দিকে করে কঠিন পাথরের মেঝেতে পড়তেই তার মগজ বের হয়ে ছড়িয়ে পড়লো। চাঁদের আলোয় শত্রু না মিত্র তিনি বুঝতে পারলো না। তার নিজের সৈন্য আর সম্ভাজির সৈন্যরা মনে হল ভালোই লড়াই করছে। শিরস্ত্রাণের সাদা পালক দেখে সম্ভাজিকে সহজেই চেনা যাচ্ছিল। তিনি সবার সমনে দাঁড়িয়ে তার চেয়ে আকারে দ্বিগুণ ভালুকের মতো একজন লোকের সাথে লড়ে যাচ্ছিলেন। ক্ষিপ্রগতিতে লোকটির তরোয়ালের কোপ এড়িয়ে তিনি হঠাৎ সামনে লাফ দিয়ে লোকটির উপরে উঠান হাতের নিচে দিয়ে এগিয়ে তার চওড়া বুকে তরোয়াল বিধিয়ে দিলেন। তার শত্রু কয়েকমুহূর্ত টলমল করতে করতে দুই হাত শূন্যে তুলে নিচে উঠানে পড়ে গেল।
আকবর দেখতে পেলেন তার একজন সেনা কর্মকর্তা ছাদের খাড়া সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে তার দিকে ছুটে আসছে। সে এসে বললো, ‘জাহাপনা, দুর্গের সুবেদার কয়েকজন সেনাসহ উপরের একটি কামরায় নিজেকে আবদ্ধ করেছে। তবে সে সেখান থেকে চিৎকার করে বলেছে, আপনি যদি তার সৈন্যদেরসহ তার প্রাণ বাঁচাবার অঙ্গীকার করেন, তবে সে দুর্গ খুলে দিয়ে সমস্ত রসদ আপনার হাতে তুলে দেবে। তবে সে বলেছে সম্ভাজি নয় আপনাকে কথা দিতে হবে।
‘তাকে বল আমি আর সম্ভাজি এক, তবে আমি তার কথায় রাজি হতে পারি। একটি শর্তে। সে দুর্গে যত মোগল পতাকা আছে সেগুলো আমার হাতে তুলে দেবে। আমি সম্রাট। এটা আমার জন্য উপযুক্ত।
*
আমি আপনার দুর্গ আর এই পতাকাগুলো দখল করেছি। ঠিক সেভাবে আপনার সিংহাসন দখল করবো। আমার মিত্রদের সাথে আপনি অন্যায় আচরণ করেছেন, যেমন করেছেন আমার সাথে। আমি লড়াই চালিয়েই যাব যতদিন না নিজের জন্য আর আমার অত্যাচারিত জনগণের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারবো।–আকবর।
*
আওরঙ্গজেবের হাসি পেল। তিনি বললেন, ‘আকবর যে একটা বোকা আর সাদাসিধা তা এই চিঠিতেই প্রমাণিত হচ্ছে। সে কি আসলেই ভেবেছে যে, এরকম একটা ছোট্ট গুরুত্বহীন, অরক্ষিত দুর্গ দখল করলেই আমার হাঁটু কাঁপতে থাকবে?
শরবতের গ্লাসে একটু চুমুক দিয়ে উদিপুরী বললেন, কী এটা? কী লেখা আছে এতে? আওরঙ্গজেব জানেন উদিপুরী শরবত নামে যা পান করছেন, তাতে সম্ভবত শরাব মেশানো আছে। কঠোর ধর্মীয় বিশ্বাস পালন করলেও তিনি এবিষয়ে এখনও আপত্তি করতে পারেন নি। একবার তাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করায় তিনি বলেছিলেন যে, তার দেশ জর্জিয়ায়, যেখানে তিনি জন্ম গ্রহণ করেছেন সেখানেই মদ আবিষ্কৃত হয়েছে। আর এর স্বাদ তাকে তার নিজের দেশের কথা মনে করিয়ে দেয় আর তার পেটের শূল বেদনার যে প্রবণতা আছে তার বিরুদ্ধে কাজ করে। বোরহানপুরে তার সাথে আসার জন্য তিনি আবদার শুরু করলে তিনি তাকে আসতে নিষেধ করেন নি। যে রাতে তিনি তার মায়ের ঘরগুলো উন্মুক্ত করেছিলেন, তখন থেকে অনুভব করছিলেন যে, এই স্থানটিতে যে বিষণ্ণ স্মৃতি আর অশুভসূচক লক্ষণ ছিল তার কিছুটা তিনি ছড়িয়ে দিয়ে অদৃশ্য করেছেন। এর ফলে জাহানারার মৃত্যুর পর বিষণ্ণতার কারণে তার মনে যে অসাড়ভাব হয়েছিল তা ঝেড়ে ফেলতে পেরেছিলেন।
