তারপর আকবর বললেন, ‘নিচে বেশ চুপচাপ মনে হচ্ছে। তবে আমার বাবার চোখ কান সবদিকে আছে, তাই আমি আমার নিরস্ত্র দুজন চর পাঠিয়েছি গ্রামবাসীর পোশাকে। ওরা দেখে নিশ্চিত হবে যে, আমরা কোনো ফাঁদে পা দিচ্ছি কি-না।
সম্ভাজি বললেন, আপনি কী তাকে ভয় পান?
আকবর এতক্ষণ পেটের উপর উপুড় হয়ে শুয়েছিলেন, প্রশ্নটি শুনে উঠে বসে। বললেন, কী?
মাঝে মাঝে যখন আপনি আপনার বাবার কথা বলেন, তখন আপনাকে বেশ আতঙ্কিত মনে হয়।
‘আমি তাকে ভয় পাই না, তবে আমি জানি তিনি কী করতে সক্ষম। তাঁর ক্ষমতাকে আমাদের ছোট করে দেখা ঠিক হবে না।’
‘তা করি না। তবে আমি কখনও সে কথা ভুলিনি যে, আমার বাবা কিভাবে তাকে বোকা বানিয়ে মিষ্টির ঝুড়িতে লুকিয়ে আগ্রা দুর্গ থেকে আমাকে নিয়ে পালিয়েছিলেন!’ কথাটা বলে সম্ভাজি জিহ্বা দিয়ে চুক চুক শব্দ করলেও আকবর তাতে সুর মেলালেন না। তিনি কি করে বুঝবেন–তিনি তার বাবার সম্পর্কে কি অনুভব করেন, যেখানে সম্ভাজি তার নিজের বাবার সাথে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন। এক মুহূর্ত তিনি কী একটু ঈর্ষা অনুভব করলেন? না তা খুব বেশি হয়ে যায়, এটাকে অনুতাপ বলা চলে। আওরঙ্গজেব যদি অন্য ধরনের বাবা হতেন, তবে আজ তিনি এই পাহাড়ের চূড়ায় থাকতেন না। পরিবার আর তাহাব্বুর খানের মতো বন্ধুদের থেকে অনেক দূরে এমন লোকদের উপর নির্ভর করে থাকতেন না, ভিন্ন পরিস্থিতে যারা তার শত্রু বলে গণ্য হতেন। তবে এখন এ ধরনের চিন্তার অবকাশ নেই। আকবর আকাশের দিকে তাকিয়ে আবার সময়টা বুঝার চেষ্টা করলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে তার পেছনে একটু শব্দ শোনা গেল। পেছন ফিরে দেখলেন অশোক এসেছে। যে কয়েকজন চরকে দুর্গে পাঠান হয়েছিল ‘অশোক তাদের একজন।
‘নিচে কি আবিষ্কার করলে অশোক?”
‘সবকিছু চুপচাপ আর শান্ত মনে হচ্ছে, জাহাপনা। ওরা রাতের জন্য প্রধান ফটক বন্ধ করে দিয়েছে, তবে বাইরে কোনো প্রহরী রাখেনি। মনে হয় ওরা কিছু সন্দেহ করেনি। নদীতে গিয়ে আবার দেখলাম খুব বেশি হলে কোমর পর্যন্ত পানি হবে।
আকবর সম্ভাজির সাথে দৃষ্টি বিনিময় করে বললেন, তাহলে চলুন, আমরা যাই!’
ফিস ফিস করে নির্দেশ চলে গেল অপেক্ষমাণ লোকের সারির শেষ পর্যন্ত। প্রথম দলটি পাহাড়ের কিনারা দিয়ে ঢাল বেয়ে নিচে দুর্গের দিকে নামতে শুরু করলো। আকবর তার লোকজনসহ প্রথমে গেলেন। প্রথমে ভেবেছিলেন দ্রুত দৌড়ে নামেন, কিন্তু তিনি বেশ সাবধানে নামতে লাগলেন যেন কোনো আলগা পাথর গড়িয়ে না পড়ে। হঠাৎ রাতের নৈঃশব্দ ভেদ করে প্যাচার ডাক আর পরপরই এর শিকারের তীব্র আর্তচিৎকার শুনে তিনি চমকে গেলেন। অন্ধকারে শব্দগুলো খুব জোড়ালো শোনাল।
আধঘণ্টা পর আকবর নদীর তীরে পৌঁছলেন। লোকজন তার চারপাশে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন। আশঙ্কা করছিলেন, যে কোনো মুহূর্তে হয়তো কেউ সতর্ক করে চিৎকার করবে আর দুর্গের ছাদ থেকে মশালের আলো দেখা যাবে, এমনকি যখন দুজন লোকের হাত থেকে লোহার আঁকশিভরা একটি ধাতুর টিন পড়ে গেল, তারপরও কিছু হল না। এরপর অশোককে অনুসরণ করে আকবর তার লোকজনসহ তপতি নদীর উষ্ণ পানিতে নেমে পড়লেন। অশোক ঠিকই বলেছিল। নদী পারাপারের স্থানটিতে পানি বেশ কম ছিল। পানির উপর গাদা বন্দুক আর বারুদের শিং হাতে নিয়ে যেতে খুব একটা কষ্টকর ছিল না। তাছাড়া নদীর তলদেশে বালুময় আর কোনো স্রোত না থাকায় পা পিছলে পড়ে যাবার কিংবা পানি ছলকে উঠে শত্রুপক্ষকে সতর্ক করে দেওয়ারও ভয় নেই। দ্বীপে পৌঁছে আকবর তার লোকজন নিয়ে আমগাছের ছড়ানো ডালপালার ঘন পাতার ছাউনির নিচে গেলেন, সেখানেই সবার মিলিত হওয়ার কথা। একটুপরই মারাঠি আর রাজপুত সৈন্যরা এসে ওদের সাথে মিলিত হল। তারপর সম্ভাজির দুই লোক বারুদের বস্তা, লম্বা পলিতা আর চকমকির বাক্সের ওজনের ভারে নিচু হয়ে মূল ফটকের দিকে নিঃশব্দে এগোল। আর একই ধরনের জিনিসপত্র নিয়ে আরো দুজন অপেক্ষা করছিল, যদি কোনো কারণে আগের দুই লোকের কোনো ধরনের অঘটন ঘটে। তারপরও সবদিক নিশ্চুপ।
ইতোমধ্যে দড়ি আর মই নিয়ে দশজন করে এক একটি দল দুর্গের দেয়ালের নিচে অবস্থান নেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ওরাও নিঃশব্দে এগিয়ে দেয়ালের নিচে পৌঁছল। এবার ফটকে বারুদ বসাবার লোক দুজনের কাছ থেকে একটি সাংকেতিক নিচু ডাক শোনা গেল, অর্থাৎ ওদের কাজ হয়েছে, বারুদের বস্তাগুলো জায়গামত বসান হয়েছে। আকবরের দিকে একবার তাকিয়ে মাথা নেড়ে সম্ভাজি ফিস ফিস করে ‘শুভকামনা জানিয়ে দুর্গের দেয়ালের নিচে একটি আক্রমণকারী দলের কাছে চলে গেলেন। এবার আকবর সঙ্কেত করতেই একবার শিঙ্গা কুঁকা হল। প্রায় সাথে সাথে দুর্গের ভেতর থেকে চিৎকার চেঁচামেচি শোনা গেল। কয়েক মুহূর্তপর দুর্গের ছাদে মশাল জ্বলে উঠলো। তারপর একটি প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেল। আকবরের কানে ঘণ্টার মতো বাজতে লাগলো আর প্রচণ্ড ধুলায় তিনি কাশতে শুরু করলেন। বারুদ নিয়ে যারা গিয়েছিল ওরা ওদের কাজ সফলভাবে করেছে।
তরোয়াল হাতে নিয়ে আকবর ধুলা আর ধোয়ার মধ্য দিয়ে প্রধান ফটকের দিতে ছুটে চলতে চলতে চিৎকার করে উঠলেন, “এসো আমার সাথে! বিস্ফোরণের ধাক্কায় ফটক দালানের একপাশের মাটির দেয়াল ভেঙ্গে পড়েছে আর লোহার ফটকের একটি পাল্লা মাটিতে পড়ে গিয়েছিল। ছুটতে ছুটতে তিনি তার অন্যদলের লোকজনের চিৎকার শুনতে পেলেন। ওরা দেয়ালের উপর দিয়ে দড়ি আর আকশি ছুঁড়ে দ্রুত মই বেয়ে দেয়ালে উঠতে শুরু করেছে। তারপর একজায়গায় জমাকরা আবর্জনার উপর পা লেগে হোঁচট খেয়ে সামনে হুমড়ি খেয়ে পড়তেই তার মাথার উপর দিয়ে একটি গোলা শিষ দিয়ে উড়ে চলে গেল।
