আকবর পেটের উপর শুয়ে মোচড়ানোর ভঙ্গিতে ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে উঁচু পাহাড়টির চূড়ার কিনারা থেকে একহাজার ফুট নিচে কাদা-মাটির ইটের তৈরি দুর্গটির দিকে তাকালেন। আরেকটু ভালোভাবে দেখার জন্য বুকে হেঁটে সামনে আরেকটু এগোলেন। তিনি আর সম্ভাজি একটি পাহাড়ের চূড়ায় উঠে পাহাড়ের পাদদেশ থেকে এক মাইল দূরে তপতি নদীর মাঝখানে একটি নিচু দ্বীপে অবস্থিত দুর্গটির উপর নজর রাখছিলেন। দেখতে পুরোনো মনে হলেও এখনও বেশ শক্তিশালী। তবে সম্ভাজির দুইজন চর ফেরিওয়ালার ছদ্মবেশে দুর্গে ঢুকে জায়গাটিতে ঘুরেফিরে দেখে এসে জানিয়েছে, দুর্গ রক্ষার জন্য একটি সেনাদল একমাস আগে থেকে এখানে অবস্থান করছে আর মূল যে সেনাবাহিনীটি আরো দক্ষিণ দিকে অনুসন্ধান করতে এগিয়েছে সেটিও খুব বেশি বড় নয়–বড় জোর একপঞ্চাশ জন সৈন্য হবে। নদীটি চওড়া হলেও, পানি খুব কম, সহজেই পার হওয়া যাবে। আর গোলন্দাজ বাহিনী থেকেও আক্রমণের ভয় নেই। দুর্গের পুরোনো দেয়ালে যে সরু ছিদ্রগুলো রয়েছে সেগুলো তীর ধনুকের উপযোগী করে করা হয়েছিল, কামানের গোলার জন্য নয়। একমাত্র প্রধান ফটকের চেপ্টা ছাদে কামান স্থাপন করা যেত, কিন্তু সেরকম কোনো চিহ্ন সেখানে দেখা যাচ্ছে না।
আকবর জিজ্ঞেস করলেন, “আমরা কখন আক্রমণ করবো?
‘এখন হলে ক্ষতি কি? আমরা ওদের একজনের জায়গায় দুইজন রয়েছি। আর নতুন চাঁদের আলোও খুব কম, কাজেই অতর্কিতে আক্রমণ করে আমরা ওদেরকে চমকে দিতে পারি।’
অবশেষে আক্রমণ শুরু হল। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে আকবর ভাবতেন সম্ভাজি এত অতিথিপরায়ণ আর তাকে স্বাগত জানালেও, যত দ্রুত সম্ভব মোগলদের মোকাবেলা করার ব্যাপারে তিনি নিজে যেরকম দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়েছেন, তার সাথে তিনিও অংশীদার হবেন কি-না। তবে সেটা ঠিক নয়…সম্ভাজি কেবল সঠিক মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। কাজেই যখন তার গুপ্তচরেরা খবর দিল মোগলরা এই দুর্গ দখল করে এখানে প্রচুর রসদ জমা করেছে, তখন তিনি আর ইতস্তত করলেন না। তার বাবার সেনাদলের বিরুদ্ধে প্রথম যুদ্ধে জয়লাভ করলে কি চমৎকার অনুভূতি হবে। আওরঙ্গজেব কখনও ভাবতে পারতেন না যে, তার ছেলের এমন সাহস হবে আর কল্পনা করতে পারবে যে, অগ্রবর্তী মূল মোগল বাহিনীকে পাশ কাটিয়ে এমন একটি দুর্গ আক্রমণ করবেন, যা তার সেনাপতিরা পেছনে সুরক্ষিত করে রেখে এসেছে…
তারপরও পাহাড়ের কাছে পৌঁছতে পৌঁছতে দুপুর হয়ে গেল। তারপর পাহাড়ের নিচে গাছের আড়ালে আকবরের নিজের সেনাদল আর মারাঠিরা অস্থায়ী শিবির গেড়ে সেখানে প্রস্তুতি নিতে যে সময় নিচ্ছিল, আকবরের তখন মনে হচ্ছিল সময় যেন কাটছেই না। যখনই আকবর আকাশের দিকে তাকাতেন তখনই তার মনে হত সূর্য যেন একই জায়গায় রয়েছে। নিজের মনোযোগ অন্যদিকে ফেরাতে তিনি সম্ভাজি আর তার সেনানায়কদের সাথে আক্রমণের ছকটি নিয়ে বারবার আলোচনা করতে লাগলেন। ওরা সবাই এতে একমত হয়েছিল। পরিকল্পনাটি বেশ সহজ ছিল। অন্ধকার নামলেই ওরা প্রস্তুতি নিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় উঠবে। তারপর একটু পরই যখন দুর্গের অধিকাংশ লোক খওয়া-দাওয়া আর ঘুমাবার কথা চিন্তা করবে তখন ওরা ছোট ছোট দলে হেঁটে পাহাড় থেকে নামতে শুরু করবে। ঘোড়া নিলে বেশি শব্দ হবে–হেঁটে নদী পার হয়ে যে দ্বীপে দুর্গটি অবস্থিত সেখানে যাবে। সেখানে পৌঁছে দুর্গের প্রধান ফটকের দুইশো গজ দূরে একটি আমগাছের জঙ্গলের আড়ালে সবাই একত্রিত হবে। তারপর যখন মোটামুটি নিশ্চিত হবে যে, ওদেরকে কেউ দেখছে না তখন দুজন লোক চুপি চুপি ফটকের যতদূর সম্ভব কাছাকাছি গিয়ে একটি বড় বস্তা ভর্তি বারুদ রেখে আসবে। একইসাথে অন্যরা দশজন করে দলে বিভক্ত হয়ে দুর্গের সীমানার চতুর্দিকে দেয়াল ঘেঁসে অবস্থান নেবে, যাতে সময় মতো দেয়াল বেয়ে উঠতে পারে। প্রয়োজন বোধে গুলিবর্ষণ করে ওদেরকে সহায়তা করার জন্য প্রতি দলে দুজন বরকন্দাজ থাকবে। তারপর সিদ্ধান্ত মোতাবেক একবার শিঙ্গা বেজে উঠলেই বারুদের বস্তা নিয়ে যে দুজন ফটকের কাছে থাকার কথা ওরা দ্রুত বারুদের বস্তার পলিতায় আগুন লাগিয়ে দেবে। এর বিস্ফোরণের ফলে ফটকের পাল্লাগুলো কজা খুলে উড়ে যাবে আশা করা যায়। কয়েকজন কুশলী যোদ্ধা নিয়ে আকবর কোনো বাধা এলে তা সামলাবে আর সম্ভাজির নির্দেশে অন্যরা দেয়াল দিয়ে আক্রমণ করবে।
পশ্চিম আকাশে কমলা রঙ মুছে যেতেই আকবর পাহাড়ের খাড়া গা বেয়ে চূড়ায় আরোহণ করতে শুরু করলেন। তার কোরচি তার লম্বা তরোয়ালটি নিয়ে তার পাশাপাশি উঠছিল আর পেছন পেছন আসছিল তার দেহরক্ষী দল। সামান্য যে আলো ছিল তাতে সে দেখছিল জগিন্দরের রাজপুত সৈন্যরা লম্বা লম্বা পা ফেলে আসছে। ওরা পিঠে অস্ত্রশস্ত্র বেঁধে নিয়েছিল। সম্ভাজির মারাঠিদের মধ্যে কেউ কেউ কাঁধে কুণ্ডলী করা দড়ি নিয়ে উঠছিল, অন্যরা মই, বারুদের বস্তা আর গাদা বন্দুকের গুলি বহন করছিল।
পাহাড়ের চূড়া থেকে সরু এক ফালি চাঁদের মান আলোয় তপতি নদীর পানি হালকা চিকচিক করে উঠলো। আর দুর্গের অন্ধকার আকৃতিটি প্রায় দেখাই যাচ্ছিল না, শুধু ফটকের দালান আর সৈনিকদের আবাসস্থল থেকে মাঝে মাঝে কমলা রঙের আলোর ফোঁটা দেখা যাচ্ছে। কেবল দূর থেকে রাখাল গরুর পাল নিয়ে রাতের জন্য গোয়ালে ফিরতেই গরুর গলার ঘণ্টার টুংটাং আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল। আকবর একটি লম্বা শ্বাস নিলেন। একটু পরই সম্ভাজি হাজির হলেন। একটি রুপার পানের বাক্স ধরে মারাঠি নেতা বললেন, ‘পান চলবে? আকবর মাথা নাড়লেন, তার চোখ তখন নিচের দিকে।
