সম্ভাজি তাকে বললেন, আমার মন্ত্রী আপনার জন্য বিশেষ একটি অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করেছেন…এটা আপনার পছন্দ হবে। তার শত্রুহীন তরুণ মুখে দুষ্টুমির হাসি খেলে গেল। কথাটা বলতেই পরিচারকরা দেয়ালের চারদিকের জ্বলন্ত মশালগুলো নিভিয়ে দিতেই আলোকিত কামরাটি নিকষ কালো অন্ধকারে ছেয়ে গেল। তার মনে হচ্ছিল যে কোনো মুহূর্তে তিনি অনুভব করবেন একটি ধারালো ছুরির ফলা তার গলা কেটে ফেলবে কিংবা বুকে বিঁধবে। এখানে বিশ্বাসঘাতকতা হচ্ছে না তো? কিংবা তার বাবার কোনো গুপ্তঘাতক? সম্রাটের চর তো সর্বত্র রয়েছে। তিনি উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করতেই অন্ধকারে সম্ভাজির সাথে তার ধাক্কা লাগলো। মারাঠারাজ বললেন, ‘একটু ধৈর্য ধরুন!’ তারপর দুইবার হাততালি দিয়ে চিৎকার করলেন, এবার শুরু কর!
ধীরে ধীরে একটি দরজা খুলতেই একটি ছায়ামূর্তি ভেতরে হাজির হল। তার পেছনে আরো দুটি ছায়ামূর্তি পাঁচটি উঁটিসহ একটি বাতিদানে পাঁচটি মোমবাতি নিয়ে ঢুকলো। ওরা কাছে এগিয়ে আসতেই মোমবাতির আলো আরো জোরালো হতেই আকবর দেখেলন, সবার আগে ছায়ামূর্তিটি একজন নারী। তার চুল কাঁধে লুটিয়ে পড়েছে, পরনের পোশাকটি শরীরের সাথে সেঁটে থাকায় দেহের রেখাগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পোশাকটি এমন একটি উপাদানে তৈরি যে এর উপর আলো পড়তেই ঝিকমিক করে উঠছে। এবার দেখা গেল দুটি বালক বাতিদানগুলো বয়ে নিয়ে আসছে। আকবরের বুকের ধুকপুকানি এবার স্বাভাবিক হয়ে এল।
যে মঞ্চে আকবর আর সম্ভাজি দাঁড়িয়েছিলেন, তার কাছে এসে নারীটি মাথা নুইয়ে অভিবাদন করলো। সম্ভাজি বললেন, স্বাগতম লায়লা।’ রুপালি সুতা দিয়ে তৈরি লায়লার পোশাকটি এতই স্বচ্ছ ছিল যে, এর মধ্য দিয়ে তার সুডৌল স্তন, ক্রমাগত সরু হয়ে যাওয়া কোমর আর নিতম্ব পরিষ্কার ফুটে উঠেছে। সম্ভাজি ইশারা করতেই সে মোমবাতির আলোয় কোনো বাদ্যযন্ত্র ছাড়াই নাচতে শুরু করলো।
দুপায়ের উপর দাঁড়িয়ে সে এমনভাবে পুরো দেহ বাঁকাচ্ছিল যেন, হাওয়ায় কোনো গাছ দুলছে। তারপর সে ঘুরতে শুরু করলো। মোমবাতির মৃদু আলোয় আকবর দেখলেন সে বিভিন্ন ভঙ্গিমায় তার হাত পুরো দেহের উপর বুলাচ্ছে। মেয়েটি জানে তার কি ক্ষমতা আর এতে সে আনন্দ উপভোগ করছে। আকবরের হৃৎস্পন্দন দ্রুততর হল। কামরায় গভীর নীরবতা…এমন কোনো মানুষ হতে পারে না যে তাকে পেতে না চাইবে। আকবর বুঝলেন, এবার লায়লা তার কাছে এগিয়ে আসছে। তার কাছে এসে সে হাঁটু গেড়ে বসলো, মাথা পেছনে হেলিয়ে দুই হাত তুলে মেহেদি লাগানো চুলে বুলালো। সে এখন তার এত কাছে যে, তিনি তার বুকের উঠানামা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলেন। সম্ভাজি ফিস ফিস করে বললেন, ‘একে আপনার পছন্দ হয়েছে, তাই না? আকবর মাথা নেড়ে সায় দিলেন। তাহলে এর সাথে যান, আর দুজনে মিলে আমাদের মৈত্রিবন্ধন আর সামনে যে সুমধুর দিনগুলো আমাদের সবার জন্য রয়েছে তা উদযাপন করুন। আপনি দেখবেন সে মোটেই আপত্তি করবে না। লায়লা দাঁড়িয়ে আকবরের দিকে একহাত বাড়িয়ে বললো, “জাহাপনা। তারপর পুরুষ্টু লাল ঠোঁট সামান্য ফাঁক করে মৃদু হাসলো। সম্ভাজির লোকেরা চিৎকার করে তাকে উৎসাহিত করতেই তিনি তার হাত ধরে কাছেই সম্ভাজি তার থাকার জন্য যে ঘরের ব্যবস্থা করেছেন সেদিকে এগিয়ে চললেন। চাঁপাফুলের সুগন্ধের সাথে তার ঘাম মিশ্রিত মাতাল করা সৌরভ নাকে নিয়ে তিনি তার সাথে চললেন। দরজা বন্ধ হতে না হতেই তিনি তাকে দুই হাতে কাছে টেনে নিলেন। লায়লা ফিস ফিষ করে বললো, ধৈর্য ধরুন জাহাপনা। তারপর এক পা পিছিয়ে এক টানে ঝিকমিক করা পোশাকটি মাথার উপর দিয়ে নিয়ে খুলে মাটিতে ফেলে দিল।
এমন নিখুঁত আর সুন্দর দেহ আকবর কখনও দেখেন নি। তিনি সব ভুলে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। তারপর হাসি শুনে তিনি বুঝতে পারলেন যে, তিনি একটি বাচ্চা ছেলের মত হতবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলেন। তিনি আবার তাকে কাছে টেনে নিয়ে তার সারা দেহে হাত বুলাতে লাগলেন। লায়লাও তার ঠোঁটে গভীর চুম্বন করলো।
লায়লা তাকে ধৈর্য ধরতে বলেছিল, কিন্তু তা অসম্ভব ছিল। তিনি তাকে কোলে উঠিয়ে কাছেই নিচু বিছানায় নিয়ে গিয়ে শোয়ালেন। লায়লা তাকে কাছে টেনে নিল। এরপর পরিপূর্ণ মিলনের যে আনন্দ তিনি পেলেন তাতে খুশিতে হেসে উঠলেন। এখান থেকেই নতুন জীবনের শুরু–তার বাবার ছায়ার বাইরে একটি জীবন, যেখানে তিনি যা ইচ্ছা করেন তা অর্জন করতে পারবেন।
*
আকবর সম্ভাজির দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনার কী মনে হয়? এখন আমরা আক্রমণ করতে পারি?
‘কেন নয়? আমার বাবা হলে মোটেই ইতস্তত করতেন না…’
আকবর বিড়বিড় করে বললেন, ‘আমার বাবাও করতেন না। চক্রান্ত করার। সময় তার বাবা সাপের মতো সর্পিল আর পিচ্ছিল হলেও যুদ্ধক্ষেত্রে আওরঙ্গজেবের সাহস কিংবা সামরিক কোনো সুযোগ খুঁজে বের করার ধীশক্তি নিয়ে কেউ সন্দেহ প্রকাশ করতে পারবে না। সম্ভাজির সাথে যোগ দেওয়ার পর আকবর গত কয়েক মাসে এ ধরনের একটা সুযোগ খুঁজছিলেন। বোরহানপুরে আওরঙ্গজেবের ঘাঁটি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যে অগ্রবর্তী সেনাদলটি সামনে এগিয়ে এসেছে, তার উপর একটি অতর্কিত হামলা করা যায়। শীঘ্র তিনি তার বাবাকে তার শক্তি দেখিয়ে দেবেন।
