তিনি আর কখনও মায়ের কামরায় ঢুকেন নি। তাঁর মৃতদেহ তপতি নদীর অপর তীরে অস্থায়ী সমাধিতে নিয়ে যাবার পর, শাহজাহান সেই বাড়িতে ঢোকার মূল দরজা বন্ধ করে দেবার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তখন থেকে এত বছর তপতি নদীর দিকে মুখ করা দুর্গ-প্রাসাদের স্মৃতি বিজড়িত তিনতলার সেই ঘরগুলো ভূতুড়ে পরিবেশ নিয়ে নীরব হয়ে রয়েছে। তখন থেকে আজ পর্যন্ত এই স্থানটি কেউ দেখতেও আসেনি।
আজ প্রথম মনে হল সেটা ঠিক হয় নি। তিনি প্রায়ই তাজমহলের একফোঁটা নয়নার প্রতিকৃতির মতো গম্বুজের নিচে তাঁর মায়ের জন্য মোনাজাত করতেন। তবে কখনও এখানে প্রার্থনা করেন নি, যে জায়গায় তার মায়ের আত্মা দেহ ছেড়ে চলে গিয়েছিল। তিনি এখুনি কামরাগুলো খোলার ব্যবস্থা করবেন। ঘোড়া থেকে নেমে তিনি বোরহানপুরের নায়েবকে খবর দিলেন।
দুই ঘণ্টা পর শোকের ধবধবে সাদা পোশাকে হাওয়ায় উড়তে থাকা লাল ধুলা আর ঝুলকালি মেখে আওরঙ্গজেব তাঁর মায়ের সেই ঘরটিতে হাঁটুগেড়ে বসে মোনাজাত করতে লাগলেন। প্রায় পঁচিশ বছরে পর্দাগুলো রোদে জ্বলে ন্যাকড়ার মতো রংচটা হয়ে পত পত করে জানালায় উড়ছিল। গালিচা আর আসবাবগুলো অনেক আগেই ইঁদুরে আর ঘুণপোকায় কেটে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। আর বাদুড়ের মলের ছাতা পড়া দুর্গন্ধে ভেতরের বাতাস দূষিত হয়ে রয়েছে। তাসত্ত্বেও তিনি এক ধরনের বিস্ময় নিয়ে চারপাশে তাকালেন–এখন কামরাগুলো যে অবস্থায় আছে সেটা নয়, তিনি দেখছিলেন একসময় কীরকম ছিল, সুন্দর রুচিশীল আসবাব আর সুগন্ধি মোমবাতি দিয়ে সাজান ছিল। মেঝেতে পড়ে থাকা কিছু একটা তার চোখে পড়তেই নিচু হয়ে তিনি জিনিসটা তুলে ধুলো ঝেড়ে দেখলেন, জিনিসটা একটি হাতির দাঁতের চিরুনি। জিনিসটা তার মায়ের? তিনি অনেক সময় দেখেছেন তাঁর মায়ের পরিচারিকা সাতি আল নিসা তার গোলাপ আতরের সুগন্ধিমাখা লম্বা রেশমের মতো চুল আঁচড়াচ্ছেন। এই সুগন্ধিটি তার মায়ের খুব প্রিয় ছিল।
হঠাৎ তিনি অনুভব করলেন তাঁর দম বন্ধ হয়ে আসছে। হাঁটু ভেঙ্গে সামনে নিচু হয়ে সাতলাপড়া বেলেপাথরের মেঝেতে কপাল ঠেকিয়ে তিনি দোয়া করতে শুরু করলেন প্রথমে তার মায়ের আত্মার জন্য, তারপর জাহানারা আর রওশনআরার জন্য…তারপর নিজের অজান্তেই কখন যে শুধু তার বাবার জন্যই নয়, এতগুলো বছরে তিনি যা কখনও করেন নি–তাঁর ভাই মুরাদ, শাহ সুজা আর দারা শিকোর জন্যও দোয়া করছেন, তা টেরও পেলেন না। এতগুলো বছরে যা তিনি কখনও করেননি। কি কারণে এটা করলেন? বুঝতে পারলেন না। কেবল আল্লাহই জানেন, যিনি মানুষের মনের ভেতরটা দেখতে পারেন।
*
হলুদ রেশমি তাকিয়ায় হেলান দিয়ে আকবর আরেক ঢোক সরাব খেলেন। এটা পেটে পড়তেই তার শরীর মন চাঙ্গা হয়ে উঠলো। সম্ভাজির কাছ থেকে তিনি তাঁর লোকজনসহ আর জগিন্দরের রাজপুতরা উষ্ণ আতিথ্য পেয়েছিলেন। সম্ভাজি এখন তার পাশেই আধশোয়া হয়ে রয়েছেন। মারাঠা রাজ্যে ঢুকতেই তার মন উদ্দীপ্ত হল আর তার সিদ্ধান্তে তিনি অটল হয়ে উঠলেন। এই মুহূর্তে অন্তত তিনি তার বাবার হাতের বাইরে রয়েছেন। বেচারা মুয়াজ্জম…তিনি কখনও তার কাছাকাছিও আসতে পারেন নি, ধরা তো দূরের কথা। অনুমান করতে পারছেন এতে তার বাবার কি প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। আওরঙ্গজেব সব সময় ভাবতেন মুয়াজ্জম অতিমাত্রায় সতর্ক আর তার মধ্যে আত্মবিশ্বাসের অভাব রয়েছে। সবার সামনে তাকে সমালোচনা করতেন, যেরকম অন্য সব ছেলেদের সমালোচনা করেন, কমবক্স ছাড়া। তবে তিনি কখনও ভাবেন নি যে, তার বাবা। নিজের মেয়ের প্রতিও এরকম প্রতিহিংসা পরায়ণ হবেন। জেবুন্নিসার কারারুদ্ধ হবার খবর শুনে তিনি মনে বড় ধরনের চোট পেয়েছিলেন। তিনি নিজেকে দোষী মনে করেছিলেন। কেননা তাকে সমর্থন করাতেই তার বাবা এর প্রতিশোধ নিয়েছিলেন। বিজয়ী হওয়ার পর অবশ্যই হবেন–তার প্রথম কাজ হবে নিজে ঘোড়ায় চড়ে গোয়ালিয়র গিয়ে তাকে মুক্ত করা। তিনি হবেন সাম্রাজ্যের সম্রাজ্ঞী–পাদিশাহ বেগম, ঠিক যেরকম তার ফুফু জাহানারা বেগম হয়েছিলেন।
নেংটিপরা দুজন কসরতবাজ কামরায় ঢুকে আকবর আর সম্ভাজির সামনে মাথা নুইয়ে অভিবাদন করলো। লোক দুটির নমনীয়, মসৃণ পেশিবহুল সারা গায়ে তেল মাখায় চকচক করছিল। তারপর ওরা লাফিয়ে, মোচড় দিয়ে আর এমনভাবে ছুটাছুটি করে উল্টে পড়ে কসরত করছিল যেন, ওদের দেহে কোনো হাড় নেই। একজন শূন্যে লাফ দিয়ে তিনবার ডিগবাজি খেতেই সম্ভাজি তার পাশে রাখা একটি চামড়ার থলে থেকে স্বর্ণমদ্রা বের করে ওদের দিকে ছুঁড়ে দিলেন। তারপর এল মাথাকামানো আর পিপার মতো বুকের একজন লোক, তাকে অনুসরণ করে দুজন লোক ভারী একটি জ্বলন্ত কাঠ-কয়লার চুল্লি কাঁধে বয়ে নিয়ে এসে সাবধানে মেঝেতে রাখলো। মাথা-কামানো লোকটি খাপ থেকে একটি ছুরি বের করলো। ছুরিটি একটি লাল রঙের কাপড়ে কয়েক ভঁজে মোড়ানো ছিল। ভালোভাবে দেখার জন্য আকবর সামনে একটু ঝুঁকতেই লোকটি ছুরিটি চুল্লির আগুনে ঢুকিয়ে কাপড়টিতে আগুনে লেগে দপ করে জ্বলে ওঠা পর্যন্ত ধরে রাখলো। তারপর ছুরিটা মাথার উপর দিয়ে দুই তিনবার ঘুরাল, যতক্ষণ না অগ্নিশিখা লক লক করে জ্বলে উঠতে শুরু করে। তারপর মাথা পেছনের দিকে হেলে, ধীরে ধীরে জ্বলন্ত ছুরির ফলাটি মুখের ভেতরে ঢুকাল। সম্ভাজি আর তার সেনানায়করা করতালি দিয়ে উঠলো। সে ছুরির ফলাটি ঢুকাতে ঢুকাতে শেষপর্যন্ত শুধু হাতলটা বাইরে রইল। তারপর সে জ্বলন্ত ছুরিটি মুখ থেকে বের করে তার সহকারীর হাতে দিল। এরপর আরো দুটি ছুরি খাপ থেকে বের করে একই প্রক্রিয়ায় মুখে ঢুকাল, তবে এবার দুটি ছুরিই তার হা করা মুখের ভেতরে অদৃশ্য হয়ে গেল। আকবর সম্ভাজির দিকে তাকিয়ে হাসলেন। মোগল দরবারে এরকম হৈচৈ করে আনন্দোপভোগ করা আওরঙ্গজেব অনেক আগেই বন্ধ করে দিয়েছেন। আগুন খেকো আর তার সহকারীরা তাদের সামনে মাথা নুইয়ে অভিবাদন করতেই আকবর হাততালি দিয়ে তাদেরকে অভিনন্দন জানালেন। তবে মনে হল অনুষ্ঠান এখনও শেষ হয় নি।
