এসব কথা ভেবে তিনি একটু শান্ত হলেন, তারপর এক মুহূর্ত ইতস্তত করার পর গওহারার চিঠিটা তুলে পড়তে শুরু করলেন।
*
আপনি চলে যাওয়ার পর আমাদের বোন দিন দিন আরো দুর্বল হয়ে পড়লেন, ঘর থেকে খুব কম বের হতেন, সারাদিন সেখানে ঝিমুতেন। যখন জেগে থাকতেন তখন সুফিতত্ত্ব, কোরানের বিভিন্ন সূরা আর অনেক সময় তাঁর প্রিয় ফার্সি কবিতা পড়ে সময় কাটাতেন। ক্ষিধে একেবারে কমে গিয়েছিল। আমরা কোনোমতেই তাঁকে ছোট এক বাটি সুরুয়া কিংবা সামান্য ভাতও খাওয়াতে পারতাম না। হেকিম যা বলতেন মনোযোগ দিয়ে সব শুনতেন, মৃদু হেসে সায় দিতেন তারপর হেকিমরা চলে গেলে আবার ঠিক আগের মতোই চলতেন। দশ দিন আগে তিনি খাওয়া-দাওয়া একেবারেই ছেড়ে দেন। আমার চোখের সামনে তিনি শুকিয়ে যাচ্ছিলেন। আমি আপনাকে লিখে জানাতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তিনি কঠোরভাবে আমাকে চিঠি লিখতে নিষেধ করলেন। আপনিতো জানেন, শান্ত হলেও তিনি কিরকম জেদি হতে পারেন।
শেষদিন তাঁর শাসপ্রশাস আসে যায় এমন হচ্ছিল আর নিশাস এত ভাসাভাসা হচ্ছিল যে, তার পরিচারিকা ভোরের আগে আমাকে ডেকে পাঠাল। শেষমুহূর্ত পর্যন্ত অবশ্য জাহানারার জ্ঞান ছিল। খুব ধীরে ধীরে তবে পরিষ্কারভাবে কথা বলে তিনি আমাকে বললেন, আমি যেন অবশ্যই আপনাকে জানাই, আপনার প্রতি তাঁর ভালোবাসা সবসময় অটুট আর নিঃশর্ত ছিল, যদিও আপনার কোন কোনো কাজে তিনি মনে ব্যথা পেয়েছেন। তারপর তাঁকে একটু উত্তেজিত মনে হল। বালিশ থেকে মাথা সামান্য তুলে তিনি আমাদেরকে অনুরোধ করলেন, আমরা যেন আপনাকে অনুরোধ করি পরিবারের সব সদস্যকে একইরকম ভালোবাসার দৃষ্টিতে দেখতে আকবর আর জেবুন্নিসার প্রতি, যাদের জন্য তিনি শেষ আরেক বারের জন্য ক্ষমাভিক্ষা চাচ্ছেন। আর তাদের প্রতিও যাদেরকে তিনি আপনার বৃহত্তর পরিবার মনে করেন–জাতপাত ও সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে সেই প্রজাদের প্রতিও। কথাগুলো বলা শেষ করার পর তাঁর অসুস্থ মাথা আবার বালিশে পড়ে গেল আর তারপর পশ্চিমদিকে মুখ করে চেহারায় প্রশান্তি নিয়ে তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করলেন।
আমাদের বোন একটি চিঠি লিখে অনুরোধ করে যান, তাকে যেন দিল্লিতে খোলা আকাশের নিচে ছেট একটি সমাধিতে দাফন করা হয়। ঠিক যেরকম প্রাচীন মুসলিম অনুশাসনে বলা হয়েছে আর আমাদের পূর্বপুরুষ বাবর যেমন কাবুলে একটি পাহাড়ের ধারে সমাহিত আছেন। তিনি কিছু উইল দ্বারা অর্পিত সম্পত্তি রেখে গেছেন, তবে জানিয়েছেন তার বাকি সব ব্যক্তিগত সম্পদ বিক্রি করে সেই অর্থ দিল্লি আর আগ্রার গরিব হিন্দু-মুসলিম জনসাধারণের মধ্যে বিলিয়ে দিতে। আমি তার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছি।
কামনা করি আল্লাহ আপনাকে এই শোক সহ্য করার শক্তি দিক আর আমিও আল্লাহর কাছে দোয়া প্রার্থনা করছি আমার দুঃখে শান্তি দিতে। তিনি সব সময় আমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ছিলেন।
*
আওরঙ্গজেব খুব যত্ন করে চিঠিটা ভাঁজ করলেন। নীরব শোকে কাতর অবস্থায় হাঁটুগেড়ে বসে জাহানারার একটি কথা তাঁর মনে পড়ে গেল। একবার তিনি বলেছিলেন, ভালো এবং মহৎ চরিত্রের মানুষকে হিন্দুরা : ‘একটি মহৎ আত্মা’, নাম দিয়েছিল। সেই শব্দগুলো জাহানারার জন্য একেবারে সঠিক।
১৫. রাজকীয় মোরগ শাবকের লড়াই
বোরহানপুরের দুর্গ-প্রাসাদের প্রধান তোরণের নিচে দিয়ে যাওয়ার সময় আওরঙ্গজেব উপরে তাকিয়ে ফটকের বেলেপাথরের চৌকাঠের উপর যুদ্ধরত হস্তির প্রতিকৃতি খোদাই করা দেখতে পেলেন। তিনি এই স্থানটিকে ঘৃণা করতেন, ঠিক যেরকম তার বাবাও করতেন। এই একটি বিষয়ে তারা দুজনেই একমত ছিলেন। তার কানে বাজলো, পত্নীশোকে কাতর সম্রাট শাহজাহানের সেই কথাগুলো। সম্রাট আকবরের সময়কার কালক্রমিক ঘটনাপঞ্জিতে লিপিবদ্ধ করা একটি অংশের কয়েকটি লাইন তিনি বার বার বলে যাচ্ছিলেন :
তারা মহান সম্রাটকে জানাল, বোরহানপুর একটি নিকৃষ্ট, অলক্ষুণে এবং অন্ধকার জায়গা। এখানে কোনো মানুষ উন্নতি করতে পারে না…।
সূর্য তখনও দিগন্তে ডুবে যায় নি। আর সারাদিন অনবরত প্রচণ্ড গুমোট গরম ছিল, তা সত্ত্বেও আওরঙ্গজেব কেঁপে উঠেছিলেন। সেই সময়ে তিনি একটি বারো বছর বয়সের সহজসরল বালক ছিলেন। তিনি তাঁর বাবাকে সান্ত্বনা দেওয়ার পাশাপাশি নিজেকেও সান্ত্বনা দেওয়ার আশা করছিলেন। তবে শাহজাহান এমন আচরণ করছিলেন, যেন প্রিয়জন হারানোর যে ব্যথাবেদনা পুরো পরিবারকে শোকাহত করেছিল সেটি যেন তার একারই দুঃখ ছিল।
অবশ্য তাঁর মা মমতাজের মৃত্যুর পর তিনি আরো বেশ কয়েকবার বোরহানপুর এসেছিলেন, তবে এবারকার আসাটা একটু অন্যরকম। যতই এর কাছাকাছি হতে লাগলেন ততই তার মনে একটা আতঙ্ক জেগে উঠতে লাগলো। আতঙ্কের এই অনুভূতি এত প্রবল ছিল যে, তিনি তাঁর সাথে উদিপুরী মহলকেও আসতে অনুমতি দেন নি। তিনি তাকে তার সফরসঙ্গীর অধিকাংশ, সদস্যদের সাথে বিশ মাইল দূরে একটি পাহাড়ের উপর আসিরগড় দুর্গে রেখে এসেছিলেন।
এখন তাঁর মনে যে অমঙ্গলাশঙ্কা জেগেছে তার সাথে কি জাহানারার মৃত্যুর কোনো সম্পর্ক আছে? হতে পারে। এটা অনুভবের পর থেকে গত ছয় সপ্তাহ ধরে অতীতের অনেক ছবি তাঁর মনে ভিড় করেছে। সেইসব স্মৃতির মধ্যে সবচেয়ে প্রবল ছিল এখানে এই বোরহানপুরে এক গ্রীষ্মের সেই রাতের স্মৃতিটি, যখন তাঁর মায়ের নিদারুণ যন্ত্রণা-চিৎকারে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল। তখন তাঁর মায়ের কামরার অর্ধেক খোলা দরজার ফাঁক দিয়ে তিনি দেখেছিলেন, জাহানারা তার মায়ের পাশে বসে কপালে হাত বুলিয়ে তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিল। তখন জাহানারার দু’গাল বেয়ে দরদর করে চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছিল আর লম্বা চুল ঝুলে রয়েছিল। জাহানারা যখন ঘুরে দেখতে পেলেন আতঙ্কিত হয়ে আওরঙ্গজেব চোখ বড় বড় করে দৃশ্যটি দেখছেন, তখন ছুটে গেলেন দরজা বন্ধ করতে, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল, আওরঙ্গজেব দেখে ফেললেন মমতাজ পাগলের মতো আর্তচিৎকার করছিলেন আর এমনভাবে বিছানায় আছড়াচ্ছিলেন যে, তাঁর সবচেয়ে কাছের সেবিকা সত্তি আল-নিসাও তাকে ধরে রাখতে পারছিলেন না। তারপর তার মনে পড়লো তাঁর বাবা যুদ্ধের ময়দানে খবর পেয়ে ফিরে এসে সেই পোশাকেই তাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে কামরায় ঢুকার সাথে আবার ঘরের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। তিনি উঠানের একটি থামের গায়ে হেলান দিয়ে বসে রইলেন যতক্ষণ না তার মায়ের আর্তচিৎকার থেমেছিল। তিনি তখন ভেবেছিলেন এটা ভাল হয়েছে–হয়তো সবকিছু ঠিক হয়ে গেছে, এই নীরবতার অর্থ, অবশেষে তিনি একটি নতুন শিশুর জন্ম দিয়েছেন। কিন্তু তার শোকের বিলাপ শুনে তিনি বুঝতে পারলেন যে, সবকিছু ঠিক নয়…
