সৈন্যরা দ্রুত লোকটির জামা-কাপড় খুলে ফেললো, সে এখন চুপ করে রয়েছে। তারপর তাকে চিৎ করে পাথরটির উপর শুইয়ে দিয়ে চারটি আংটার সাথে দুই হাতের কব্জি আর পায়ের গোড়ালি বেঁধে দিল। হাতিটি একটি পা তুলতেই এর ছায়া লোকটির উপর পড়লো, তারপর মাহুতের ইশারায় হাতিটি পা ধীরে ধীরে লোকটির শরীরের উপর নামিয়ে আনলো। পেটের নাড়িভূড়ি বের হয়ে যেতেই মারাঠি লোকটি একটি বন্য পশুর মতো আর্তনাদ করে উঠলো। বদ বায়ু আর মানুষের মলের বমি উদ্রেক করা দুর্গন্ধ এড়াতে আওরঙ্গজেব তাঁর পাশে দাঁড়ান তরুণ কোরচির কাছ থেকে একটি কাপড়ের টুকরা নিয়ে নাকে চেপে ধরলেন। কোরচি ছেলেটি হঠাৎ উবু হয়ে মাটিতে বসে পড়লো, তারপর আওরঙ্গজেব শুনতে পেলেন সে বমি করছে, তবে কিছু বললেন না। ছেলেটার বয়স খুব কম। সময় হলে সে জানতে পারবে এই ধরনের কাজ যত খারাপই। হোক না কেন, একজন শাসকের প্রজাদের মনে ভয় জাগাবার জন্য এটা প্রয়োজনীয় আর এভাবেই তার কর্তৃত্ব বজায় রাখতে হবে।
সাতজন মানুষের দেহাবশেষ পাথরের টুকরা থেকে একে একে সরিয়ে মাটিতে ছড়িয়ে রাখা পানি নিরোধক কাপড়ে এনে মুড়ে রাখা হল। তারপর দেহগুলো শিবির থেকে বেশ দূরে মাটিতে গর্ত খুঁড়ে সেখানে মাটি চাপা দেওয়া হবে। ইতোমধ্যে বাতাসে প্রচণ্ড দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল। সবশেষ বন্দীটি ছিল কমবয়সী একটি তরুণ, সৈন্যরা তাকে টেনে দাঁড় করাতেই সে একজন পক্ষাঘাতগ্রস্ত বুড়ো মানুষের মতো ঠক ঠক করে কাঁপতে লাগলো। একজন সৈন্য অসতর্কভাবে ইস্পাতের ছুরি দিয়ে তরুণটির হাতের বাঁধন কাটতে গিয়ে তার হাতের চামড়াও একটুখানি কেটে গিয়ে তার ডান হাত বেয়ে দরদর করে রক্ত ঝরতে লাগলো। সৈন্যরা তার পোশাক খোলা শুরু করতেই আওরঙ্গজেব এক হাত তুললেন।
তিনি ধীরে ধীরে বললেন, ‘থাম। এর সাথে আমার কিছু কথা আছে। তোমার বয়স কম বলে তোমার মৃত্যু হবে না তা নয়। তবে আমি তোমাকে বাঁচার জন্য একটি সুযোগ দিতে পারি।’
তরুণ মারাঠি ছেলেটি তখনও থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে তাঁর দিকে তাকাল।
সম্ভাজি সম্পর্কে খবরের বিনিময়ে আমি তোমার প্রতি ক্ষমা দেখাতে পারি। আমি সবকিছু জানতে চাই, সে কী খেতে আর পান করতে পছন্দ করে, সেখান থেকে শুরু করে কী দেখলে সে হাসে আর কেমনভাবে তার লোকদের সাথে কথা বলে সবকিছু। এমনভাবে বলবে যেন, আমি মনে করতে পারি যেন তাকে আমি চিনি। যেন আমি তার সাথে তার শিবিরেই আছি। পারবে এটা করতে? হা..হ্যাঁ, পারবো আমি।’
‘তোমার নাম কী?
‘সন্তাজি।
“ঠিক আছে সন্তাজি। আমাকে দেখাও। তবে আমি হয়তো এটা জানতে পারি যে, তুমি কখনও সম্ভাজির সাথে দেখা কর নি। ‘প্রায় দুই বছর আমি তার দেহরক্ষী দলের সদস্য ছিলাম। তারপর বর্ষার ঠিক আগে আমার বড়ভাই বসন্তরোগে মারা যাবার পর আমার বাবার অনুরোধে সম্ভাজি আমাকে বাড়ি ফেরার অনুমতি দেন।
‘তোমার বাবা এখন কোথায়?
“তিনি…তিনি…এখানে মারা যাওয়া দ্বিতীয় ব্যক্তি।
কথাটা আওরঙ্গজেব বিবেচনা করলেন। সন্তাজি এই মাত্র তার বাবার হত্যাকাণ্ড দেখেছে, এরজন্য সে হয়তো এর প্রতিশোধ নিতে চাইবে। কাজেই তাকে ভুল পথে চালিত করতে হবে। অন্যদিকে তার মনে এখন যে আতঙ্ক চলছে, তার বিপরীতে যে আশার আলো তার চোখে দেখা দিয়েছে তাতে সে মনে করছে হয়তো সে হয়তো মরবে না, এতে বুঝা যাচ্ছে সে বাঁচতেই চাইছে।
“ঠিক আছে আমরা দেখবো। প্রত্যেকদিন সেনা কর্মকর্তারা তোমাকে প্রশ্ন করে সবকিছু আমাকে জানাবে। তোমার কথায় যদি আমি সন্তুষ্ট হই তাহলে তোমার বন্দীজীবন সহজ হবে। আর তা নাহলে.. মনে রেখ আজ কি দেখেছ।
আওরঙ্গজেব দ্রুত হেঁটে তাঁর ঘোড়ার কাছে গেলেন, সহিসকে ইশারা করতেই সে ছুটে সামনে এগিয়ে তাঁকে ঘোড়ায় চড়তে সাহায্য করলো। যুবক বয়সে যেরকম একলাফে জিনে চেপে বসতেন এখন আর সেরকম পারেন না। তবে এখনও যথেষ্ট চটপটে আছেন। শিবিরের চৌহদ্দীর চারপাশে পাহারা দেখার জন্য ঘোড়ায় চড়ে ঘুরে বেড়াতে শুরু করলেন।
সন্ধ্যায় সর্বাধিনায়কের তাঁবুতে নামাজ শেষ করে উঠে অবাক হয়ে দেখলেন তার কোরচি তাঁবুর পর্দার কাছে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। সে নিশ্চয়ই নিঃশব্দে ঢুকেছিল, তাই তিনি তার আসা শুনতে পান নি। ছেলেটি বললো, জাঁহাপনা, আপনার বোন গওহারা বেগম সাহেবার সচিব ইকবাল করিম এই মাত্র আজমির থেকে একটি জরুরি চিঠি নিয়ে এসেছেন। তিনি চিঠিটা এখুনি আপনার হাতে দিতে চাচ্ছেন।
তিনি বললেন, “ঠিক আছে।’ কথাটা বলার সাথে সাথে ইকবাল করিম তাঁবুর দরজায় এসে চিঠিটা এক হাতে ধরে মাথা নুইয়ে দাঁড়াল। সে নিশ্চয়ই তাঁবুর বাইরেই অপেক্ষা করছিল। সিল মোহরে গওহারার ব্যক্তিগত সিলমোহর– লাফিয়ে উঠা একটি মাছের প্রতিকৃতি দেখা যাচ্ছে। আওরঙ্গজেব সিলমোহর ভেঙ্গে চিঠিটা পড়তে শুরু করলেন। প্রিয় ভাই, আমাদের শ্রদ্ধেয় বোন জাহানারা মারা গেছেন…
কোনমতে নিজেকে সামলে নিয়ে তিনি শান্তভাবে বললেন, ‘ধন্যবাদ, ইকবাল করিম। তুমি এখন যাও, পরে তোমাকে খবর দেব।’
একা হতেই আওরঙ্গজেবের হাত থেকে চিঠিটা খসে পড়লো তাঁর হাঁটুর উপর। জাহানারার আত্মার মাগফেরাত কামনা করে দোয়া শুরু করতেই তার দুই চোখ বেয়ে অঝোর ধারায় পানি পড়তে লাগলো। দোয়া পড়তে গিয়ে কি কি উচ্চারণ করছেন তার কিছুই কানে ঢুকছিল না। তাঁর সমস্ত চিন্তা ছিল তাঁর এই বোনের জন্য যাকে তিনি সকল ভাই-বোনের মধ্যে সবেচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন। মায়ের মৃত্যুর পর তিনিই তাকে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন। একমাত্র তাঁর মতামতকেই তিনি মূল্য দিতেন। ভবিষ্যৎ নিয়ে তার মনে খুব ভয় ছিল, তাঁকে নিয়ে, পরিবারকে নিয়ে আর সাম্রাজ্যকে নিয়েও তার মনে আতঙ্ক ছিল। মনে হচ্ছিল তিনি বেঁচে থাকার ইচ্ছে হারিয়ে ফেলেছিলেন। তিনি এটা তাঁর চোখে দেখেছিলেন, তার কণ্ঠস্বরে শুনেছিলেন। যদি তিনি তাকে একটু সান্ত্বনা, একটু আশা দিতে পারতেন, কিন্তু তিনি তা পারেন নি। তার উদ্বেগ দূর করতে হলে তাঁকে নিজের বিবেকের বিরুদ্ধে যেতে হত আর তাঁর বিশ্বাসের সাথে প্রতারণা করা হত। আর সেটা করা কখনও তার পক্ষে সম্ভব ছিল না।
