তিন ঘণ্টা পর যখন প্রধান ফটকের দালানের দোতলা থেকে বুম বুম শব্দে নাকাড়া বেজে উঠলো, তখন আজমিরের উঁচু দেওয়ালের উপরে জালি দেওয়া বেলকনিতে একসাথে দাঁড়িয়ে জাহানারা আর গওহরা তাদের ভাইয়ের হাতির পিঠে করে বাইরে চলে যাওয়া দেখছিলেন। দুর্গের বাইরে অশ্বারোহী আর পদাতিক সেনারা দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে। জাহানারা গওহারার এক হাত ধরলেন। যাদেরকে তিনি ভালোবাসেন কতবার তাদের যুদ্ধে যেতে দেখেছেন? কতবার তিনি এর অন্তঃসার শূন্যতা আর অনাবশ্যকতার কথা ভেবেছেন? আওরঙ্গজেবের চলে যাওয়ার শেষ মুহূর্তটি পার হওয়ার সময় তিনি ভাবছিলেন, তিনি কি শেষবারের মতো তাঁর সাথে আরেকবার দেখা করতে আসবেন কিংবা তিনি নিজে তাঁর সাথে দেখা করার চেষ্টা করবেন। কিন্তু তিনি জানেন তাদের দুজনেরই যা যা বলার ছিল বলেছেন। কোনোকিছুতেই ধর্ম, সাম্রাজ্য আর পারিবারিক দায়িত্ব সম্পর্কে তাদের মধ্যে যে মতপার্থক্য রয়েছে তার আর মিল হবে না।
আওরঙ্গজেবের নেতৃত্বে অগ্রবর্তী দল যখন দক্ষিণ দিকে চলতে শুরু করলো, তখন অসময়ের গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়া শুরু হতেই মাটি ভিজে গেল। জাহানারা লাঠিতে ভর দিয়ে একটু ঝুঁকে দেখতে লাগলেন আওরঙ্গজেবের হাতি তাঁকে পিঠে নিয়ে একটি নিচু পাহাড়ের কিনারা ঘুরতেই অবশেষে দৃষ্টির বাইরে চলে গেলেন। অদৃশ্য হাত উঠিয়ে তিনি ফিস ফিস করে বললেন, ‘বিদায়, ভাই… তুমিসহ তোমার লোকজনের উপর শান্তি বর্ষিত হোক।’
*
পেছনে শক্তভাবে হাত বাঁধা আটজন মারাঠি আওরঙ্গজেবের সামনে নতজানু হয়ে বসেছিল। তিনি বললেন, “এরা আমার রসদবাহী গাড়িবহরের লোকজনদের হত্যা করেছে। এদের জন্য একমাত্র শাস্তি হচ্ছে–হাতির পায়ের নিচে পিষে মারা। আর আমি চাই এটা এখুনি করা হোক। আওরঙ্গজেবের কথার সাথে সাথে আটজনের মধ্যে ছয়জন প্রাণভিক্ষা করে কাতরভাবে মিনতি করতে। লাগলো। আরেকজন–যাকে দেখে মনে হচ্ছে বয়সে সবার ছোট, সে চোখ বন্ধ করে ওয়াক ওয়াক করে বমি করার চেষ্টা করতে করতে সামনে পেছনে দুলতে লাগলো। সবশেষের মারাঠি লোকটি চিৎকার করে অবাধ্য হয়ে উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করতেই দুজন সৈন্য লাথি মেরে তাকে মাটিতে ফেলে দিল। তারপরও লম্বাচুলের, মুখে কাটাদাগসহ বলিষ্ঠ গড়নের লোকটি আওরঙ্গজেবের দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকাল। তারপর সে হঠাৎ একদলা হলদে রঙের চটচটে শ্লেষা মুখ থেকে বের করে থুথু করে ফেলতেই কফের দলাটি আওরঙ্গজেবের সবুজ আলখাল্লার একটু উপরে পড়ে ধীরে ধীরে পোশাক বেয়ে নিচে নামতে লাগলো। থুথুর দলাটি আলখাল্লার কাপড়ের গায়ে লম্বা, সরু একটি দাগ রেখে গেল। একজন সৈনিক তার গাদা বন্দুকের কুঁদো তুলতেই আওরঙ্গজেব মাথা নেড়ে বললেন, ‘পরজীবী এই কীটাণুকীটের জন্য তোমার শক্তিক্ষয় করো না, যে কি-না মৃত্যুর এত কাছাকাছি এসেও আল্লাহ আর মানুষের সামনে অপরাধ করছে।
ঝাকড়া চুলের লোকটি চিৎকার করে উঠলো, আপনি আমাদেরকে পরজীবী কীট বলছেন, আপনি নিজে কী? তখনও তার ঠোঁটে থুথু লেগে রয়েছে। ‘একজন ভিনদেশি হামলাকারী ছাড়া আপনি কিছুই না, যে জোর করে আমাদের দেশের উপর নিজের ইচ্ছে চাপিয়ে দিতে চাচ্ছে। যে দেশ আপনার নয়–যে দেশ কখনও আপনার লোকদেরও ছিল না। আপনারা মোগলরা কারা? উত্তরের পর্বতের জংলি এলাকা থেকে আসা একদল দস্যু। চোর যেমন সুযোগ পেলেই চুরি করে, তেমনি আপনারাও চোরের মতো একটি সুযোগ পেয়ে হামলা করেছেন–যাদেরকে সম্ভাজির নেতৃত্বে আমরা এদেশ থেকে উচ্ছেদ করবো।’
আওরঙ্গজেব নিচে লোকটির দিকে তাকালেন। তার ঘাড়ের শক্ত পেশি আর ঘামে ভেজা কপালের ফুলে উঠা শিরাগুলো লক্ষ করলেন। বেদনাদায়কভাবে যখন তার প্রাণ চলে যাচ্ছে, ঠিক তার আগে এমন আবেগ, এমন বিরোধিতা, আর বিশেষ একটি উদ্দেশ্যের প্রতি তার এমন বিশ্বাস–দেখার মতো বিষয় বটে। কি কারণে লোকটি বিশ্বাস করছে যে, সম্ভাজির মতো নেতার জন্য প্রাণ বিসর্জন দেওয়া যায়? তাঁর গুপ্তচরেরা বলেছে, সে তার বাবার চেয়েও অনেক ভোগবিলাসী আর খুব একটা উদ্যমী নয়? তবে তাঁর গুপ্তচরেরা কি সম্পূর্ণ সত্য কথাটি বলে নি, না-কি তিনি যা শুনতে পছন্দ করেন শুধু সে কথাই বলেছে? সম্ভাজির নিশ্চয়ই বিশেষ কোনো গুণ আছে, আর সেজন্যই সে এমন সাহস যোগচ্ছে আর আত্মবিসর্জন করতে লোককে অনুপ্রাণিত করছে। আর তাই যদি হয়ে থাকে, তবে তাকে ছোট করে দেখা ভুল হবে। তাকে ভালোভাবে জানার জন্য একটা উপায় বের করতে হবে। তিনি ওয়াজিম খানের সাথে কথা বলে তাকে জানাবেন মারাঠি শিবিরে ঢুকে সম্ভাজির সম্পর্কে সবকিছু জানার জন্য আরো চেষ্টা করতে।
চোখের এককোণ দিয়ে তিনি সেই বিশাল হাতিটিকে এগিয়ে আসতে দেখলেন, এই হাতি দিয়েই অপরাধীদের পিষে মারা হয়। একটি মাত্র মাহুত হাতিটির কাঁধে চড়ে এটাকে চালিয়ে নিয়ে আসছে। মাথা তুলে দেখলেন কয়েক ফুট দূরে তার কয়েকজন লোক একটা গরুর গাড়ি থেকে একটি পাথরের চওড়া টুকরা ধরাধরি করে নামাচ্ছে। এই পাথরের উপর ফেলেই অপরাধীকে হাতির পা দিয়ে পিষে ফেলা হবে। রক্ত শুকিয়ে পাথরটির রঙ বাদামি হয়ে রয়েছে। আর এর চার কোণায় একটি করে লোহার আংটা লাগান রয়েছে। পাথরটি ঠিকজায়গা মতো স্থাপন করার পর আওরঙ্গজেব তার দেহরক্ষী দলের অধিনায়ককে ইঙ্গিত করে বললেন, ‘ঐ লোকটি!’ যে লোকটি তার গায়ে থুথু ফেলেছিল তাকে দেখালেন। মারাঠি লোকটি হয়তো ভাবছে সে থুথু ফেলেছিল বলে তিনি তার উপর প্রতিশোধ নিচ্ছেন। আসলে তা নয়। লোকটিকে প্রথমে মরার সুযোগ দিয়ে তিনি তার সাহসের প্রশংসা করছিলেন।
