জাহানারা একটি বিবর্ণ রঙের শাল গায়ে দিয়ে জানালার ধারে বসেছিলেন। আওরঙ্গজেব ঘরে ঢুকতেই তিনি তার হাতির দাঁতের হাতলওয়ালা লাঠিতে ভর দিয়ে উঠতে চেষ্টা করলেন।
না, না, আমার জন্য ওঠার দরকার নেই।
জাহানারা আবার বসে পড়লেন, তারপর বললেন, এত ব্যস্ততা সত্ত্বেও যে আমার সাথে দেখা করতে এসেছ সেজন্য বেশ ভালো লাগছে। কখন রওয়ানা দিচ্ছ?
‘সবকিছু ঠিকঠাক করার পর তিন-চার ঘণ্টার মধ্যেই রওয়ানা দেব।
‘দূরে যাচ্ছ, সেজন্য আমি তোমার জন্য দোয়া করবো, তবে একটা ব্যাপার তোমাকে আমার বলা দরকার। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে আমি অনুভব করছি। যে, আমি কমজোর হয়ে যাচ্ছি।’
‘এর মানে কি? আপনি কী অসুস্থ? কেন আমাকে জানান নি? হেকিমকে ডেকে আনাবো?
জাহানারা মৃদু হেসে মাথা নেড়ে বললেন, আমার তেমন অসুখ হয়নি যা হেকিম ভাল করতে পারে…আমি অসুস্থ নই তবে খুব ক্লান্ত। আওরঙ্গজেব… জীবন নিয়ে আমি খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। অনেকসময় সকালে ঘুম থেকে ওঠারও শক্তি থাকে না।
‘আপনি যাই বলেন, আমি হেকিমকে পাঠাচ্ছি। তাদের কাছে নিশ্চয়ই এমন দাওয়াই আছে, যা আপনাকে শান্ত করে দেহে শক্তি দিতে পারে। আল্লাহর ইচ্ছায় আমার অভিযান বেশি সময় নেবে না। আর আমি আজমিরে ফিরে এলেই আপনি ভালো হয়ে যাবেন।
হয়তো তাই, তবে আমার মন বলছে আর হয়তো আমাদের এ পৃথিবীতে দেখা হবে না।
আওরঙ্গজেব অনুভব করলেন তার তলপেট খামচে ধরেছে। তাঁর পাশে হাঁটু গেড়ে বসে তিনি তাঁর একহাত ধরলেন। শুষ্ক পাতলা চামড়ার নিচে হাড় মনে হচ্ছে পাখির মতো ভঙ্গুর। তিনি বললেন, ‘বোন, কে কতদিন বাঁচবে আল্লাহ তা কাউকে জানার অনুমতি দেন নি।
‘আমি সেটা জানি। তবুও আমার কথা যদি ঠিক হয় সেজন্য বলছি, যদি আর কখনও সুযোগ না পাই, সেজন্য কিছু কথা তোমাকে বলতে চাই। না, আমার কথা থামিয়ে দিও না। তোমাকে শুনতেই হবে, আমার জন্য না হলেও আমাদের মায়ের জন্য, যিনি আমাদের দুজনকেই ভালোবাসতেন। আমি তোমাকে অনুরোধ করছি, আকবর আর জেবুন্নিসাকে মাফ করে দাও। তোমার মনে খুঁজে দেখ তাদেরকে ক্ষমা করা যায় কি না।
‘আল্লাহর ওয়াস্তে বলছি, তা আমি পারি না। আকবর অনেক দূর এগিয়ে গেছে। তাকে আমি ক্ষমা করতে পারি না। আর জেবুন্নিসার বিশ্বাসঘাতকতাও উপেক্ষা করতে পারি না।
‘তাহলে সেই চক্র আবার ঘুরতে শুরু করছে, যা আর থামান যাবে না। তখত ইয়া তক্তা সিংহাসন কিংবা কফিন–সেটাই তুমি সবসময় ভেবে এসেছ তাই না? বোকার মতো আমি ভেবেছিলাম যে, হয়তো তোমাকে বাধা দিতে পারবো, তবে এটা ছিল আমার দায়িত্ব–সত্যি বলতে কি পবিত্র দায়িত্ব। সবসময় চেষ্টা করে যাব, ঠিক যেরকম আবার আমি তোমাকে মনে করিয়ে দিতে চাচ্ছি যে, মুসলমানদের মত তোমার হিন্দু প্রজাদেরও তোমার উপর দাবি আছে যে, তুমি তাদের প্রতি খেয়াল রাখবে, তাদের নিরাপত্তা দেবে। যদিও আমি জানি তুমি তা শুনবে না। তবে আমি আরেকটি কথা তোমাকে বলতে চাই…আমাদের মধ্যে যতই মতপার্থক্য থাকুক আমি তোমাকে ভালোবাসি। সেই যখন তুমি একটি ছোট্ট ছেলে ছিলে তখন থেকে। তখন তুমি ভাবতে যে প্রতিটা সমস্যার একটাই সমাধান আছে আর তুমি তা জান। আর কেউ যদি তা না শুনতে চাইতো তখন তুমি তোমার মুঠি দিয়ে তার উপর তা চাপিয়ে দিতে চেষ্টা করতে। আমি দোয়া করি যেন, তুমি এই জীবনে আর পরবর্তী জীবনেও শান্তি পাও।
জাহানারা একটু সামনে ঝুঁকলেন আর আওরঙ্গজেব অনুভব করলেন তাঁর ঠোঁট তার কপাল একবার স্পর্শ করলো। তার চোখে পানি এসে যাচ্ছিল, অতি কষ্টে কণ্ঠস্বর সামলিয়ে তিনি ফিস ফিস করে বললেন, ‘দয়া করে আমার কথা বুঝার চেষ্টা করুন। আপনি যে পথের কথা বলতে চাচ্ছেন তা আমি অনুসরণ করতে পারি না–সেটা এজন্য নয় যে, আপনার প্রতি আমার ভালোবাসা আর শ্রদ্ধার ঘাটতি আছে। শুধু আমার ধর্মীয় বিশ্বাস আর পুরুষ মানুষের জগতের কঠিন বাস্তবতার কারণে আমি এসব করতে বাধ্য হয়েছি।’
‘আমি জানি তুমি কি অনুভব করছো, আর কেন। আর কেবল সেই নির্মম অনিবার্যতাই আমাকে দুঃখী করেছে।
‘জাহানারা, আমি…’ কুচকাওয়াজের ময়দান থেকে শিঙার আওয়াজ ভেসে এল। তীক্ষ্ণ কানফাটা আওয়াজটি তাঁকে বাঁচিয়ে দিল। তিনি বললেন, “আমি আর থাকতে পারছি না। তবে আমি আমার শ্রেষ্ঠ হেকিমদের পাঠাব আর যতদিন দূরে থাকবো রোজ তোমার জন্য প্রার্থনা করবো যেন তুমি সুস্থ হয়ে ওঠ।’
‘আর আমি তোমার নিরাপত্তা আর সুখের জন্য প্রার্থনা করবো, যেরকম পরিবারের আর সবার সুখশান্তি আর নিরাপত্তা কামনা করে দোয়া চাইবো। আওরঙ্গজেব, ভাই আমার, আল্লাহ তোমার সহায় হোন।
আওরঙ্গজেব তাঁর বোনের বলিরেখাঙ্কিত কপালে চুমু খেয়ে উঠে দাঁড়ালেন। এক মুহূর্ত ইস্ততত করলেন, তারপর ফিরে তাকাবার ইচ্ছেটা দমন করে দ্রুত কামরা থেকে বের হয়ে হেরেমের মধ্য দিয়ে শেষ মাথায় পৌঁছে সিঁড়ি বেয়ে নেমে উঠানে চলে এলেন। তাঁর প্রিয় হাতিটি একটি নিম গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। এর এঁড়ে যুদ্ধের লাল রঙ করা হয়েছে আর ছাদওয়ালা হাওদা পিঠে বেঁধে দেওয়া হয়েছে। সহিসরা ঘোড়ায় জিন পরাচ্ছিল আর তাঁর দেহরক্ষী দলের বরকন্দাজরা তাদের গাদা বন্দুকে গোলা ভরে সবকিছু পরীক্ষা করছিল। আওরঙ্গজেবের নাকে যুদ্ধের পরিচিত গন্ধ ভেসে এল গা-গরম ঘোড়ার গায়ের গন্ধ, তেল দেওয়া নতুন জিন আর লাগাম, বারুদ আর মানুষের ঘামের গন্ধ। লম্বা একটি দম নিয়ে তিনি স্বস্তির সাথে বিশ্বাস করলেন যে, তিনি তার জগতে ফিরে এসেছেন, যেখানে সিদ্ধান্ত আর কর্মই হচ্ছে শ্রেষ্ঠতর–নির্দিষ্ট আকারহীন, দ্ব্যর্থক আবেগপ্রবণতা নয়।
