অবশেষে আওরঙ্গজেব সিংহাসনে একটু নড়েচড়ে বসে সামনে ঝুঁকে বললেন, ‘তুমি বলেছ, তোমার ক্ষমতানুযায়ী যথাসাধ্য চেষ্টা করেছ, কিন্তু তা আসলে করনি। যদি তাই করতে তাহলে, যে বিশ্বাসঘাতক নিজেকে আমার ছেলে বলে। দাবি করতো, তাকে জীবিত অথবা মৃত আমার হাতে তুলে দিতে। বরং তুমি আমার মতো দাক্ষিণাত্য ভালোভাবে জানা সত্ত্বেও তাকে আর রাজপুত বিশ্বাসঘাতকদেরকে তোমার হাত এড়িয়ে মারাঠিদের সাথে যোগ দেবার সুযোগ করে দিয়েছ। অভিযান সফল করতে তুমি যথেষ্ট নিশ্চিত এবং দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলে না। আরো খারাপ কি করেছ, আমার অনুমতি না নিয়ে অভিযান ছেড়ে চলে এসেছ। তুমি ছোট একটি যে বার্তা কাসিদের মারফত পাঠিয়েছিলে, তাতেই প্রথম আমি জানতে পারি যে, তোমার বাহিনী নর্মদা নদী পাড় হয়ে উত্তর তীরের দিকে আসছে।
মুয়াজ্জম আবার বলতে শুরু করলেন, বাবা…’ কিন্তু আওরঙ্গজেব একটি আঙুল তুললেন। এই আঙুলে এখন সব সময় তিনি তৈমুরের বাঘমুখের ভারী আংটিটি পরতেন। আর এটাই একমাত্র রত্ন যা তিনি ব্যবহার করতেন। মোমবাতির আলোয় সোনা চকচক করে উঠলো, তবে তার বাবার কালো চোখের দৃষ্টিতে কোনো ধরনের আবেগ অনুভূতির চিহ্ন নেই। তিনি সরাসরি তার ছেলের চোখের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। প্রতিরোধ করার জন্য দৃঢ়সংকল্প হলেও, সেই চোখের প্রবল চাউনি এড়াতে না পেরে মুয়াজ্জম চোখ নামিয়ে মেঝের দিকে তাকাতেই, আওরঙ্গজেব বললেন,
‘আমি আবার বলছি, তুমি অতি সতর্ক ছিলে। এই ধরনের বৈশিষ্ট্য আমার কোন সেনাপতির মধ্যে আমি সহ্য করতে পারি না, ছেলে হলে তো কোনো কথাই নেই। আমার মনে একটা অনুকূল ধারণা সৃষ্টি করার এটা তোমার জন্য একটা সুযোগ ছিল, কিন্তু তুমি প্রমাণ করেছ যে, একটি সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দেবার মতো মেধা কিংবা সাহস তোমার মধ্যে নেই। সাম্রাজ্য শাসন করাতো দূরের কথা।
এই কথাটার মানে কি? তার বাবা কি এতদিন তাকেই তাঁর উত্তরাধিকার মনে করতেন আর এখন মত বদলেছেন? এনিয়ে মুয়াজ্জম আর কিছু চিন্তা করার আগেই আওরঙ্গজেব আবার বলে চললেন, “আমি তোমাকে তোমার বর্তমান অধিনায়কের পদ থেকে সরিয়ে দিচ্ছি আর তোমার সাধারণ মানের যোগ্যতানুযায়ী কম গুরুত্বপূর্ণ পদ দেব। এখন আমি দেখছি একমাত্র উপায় হল আমার অপরাধী ছেলের পেছনে অভিযানের নেতৃত্ব একমাত্র আমাকেই দিতে হবে। এখন তুমি যাও। তোমার ব্যাপারে কিছু একটা সিদ্ধান্ত নেবার পর তোমাকে জানাব।’
যাওয়ার জন্য ঘুরতেই মুয়াজ্জমের মনে হল দেয়ালের গায়ে স্থাপন করা জাফরির পেছনে তিনি এক নজর কারও চোখ কিংবা একটি মুক্তার মৃদু ঝলক দেখতে পেলেন। এখানে বসেই জাফরির ফাঁক দিয়ে রাজপরিবারের মহিলারা দরবারের কার্যকলাপ দেখে থাকেন। তার ফুফু জাহানারা কি তাকে লক্ষ করছিলেন? যদি দেখে থাকেন তাহলে তিনি নিশ্চয়ই জানতে পেরেছেন যে, মুয়াজ্জম ফিসফিস করে বলা তার অনুরোধকে সম্মান দিয়েছে। আকবরকে খুঁজে বের করার অভিযানে তিনি আসলে ধীরগতি ছিলেন।
*
আওরঙ্গজেবের গালের কিনারায় আলতো করে হাত বুলিয়ে উদিপুরী মহল মৃদু হেসে বললেন, আপনার সাথে যেতে পেরে আমার খুব আনন্দ হচ্ছে। আপনি জানেন যখন আপনি আমাকে ফেলে কোথাও যান তখন আমার খুব খারাপ লাগে। এতবছর পার হওয়ার পরও তিনি এখনও যথেষ্ট সুন্দরী। মাঝে মাঝে আওরঙ্গজেব ভাবতেন সাটিনের মত তার নমনীয় দেহ ধরে তিনি যে আনন্দ পান সেটা কি কোনো পাপ আর তার হয়তো ঘন ঘন উদিপুরী মহলের সাথে দেহমিলন করাও ঠিক না। প্রথম যখন তিনি তাকে তার স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন, তখন উদিপুরী মহল যেরকম ভালোবাসতেন, এখনও আওরঙ্গজেবের প্রতি তার ভালোবাসা তেমনি উজ্জ্বল আর সেরকমই আন্তরিক। সেজন্যই তিনি তাকে আজমিরে ফেলে রেখে যেতে পারছেন না…এক আল্লাহই জানেন, সামনে যুদ্ধ মোকাবেলা করার সময় তার নিঃশর্ত আর প্রশ্নাতীত ভালোবাসার প্রয়োজন তিনি কতটা অনুভব করেন।
উদিপুরী তার গায়ের সাথে আরো চেপে বসতেই তিনি তার নরম স্তনের ফিতি অনুভব করলেন, তবে এখন দেহমিলনের সময় নয়। আর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাকে একটি সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে মুয়াজ্জমের অসমাপ্ত অভিযানে বের হতে হবে। তার ছেলেকে ধরে আনতে হবে আর মারাঠিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ লাভ করতে হবে। তিনি নিচু হয়ে তার রক্তিম মুখে চুমু খেয়ে বললেন, ‘আমাকে এখন যেতেই হবে। যাওয়ার আগে অনেক কিছু করা বাকি আছে। তবে আমার খুব ভাল লাগে যখন মনে হয় প্রতিদিন বেলাশেষে ফিরে এসে দেখবো হেরেম তাঁবুতে তুমি আমার জন্য অপেক্ষা করছে।’
কামরা থেকে বের হয়ে হেরেম মহলের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে তার মাথায় চওড়া ব্যাসের নলের নতুন কামানের কথাটা ঘুরপাক খেতে থাকলো। তাকে নিশ্চিত করতে হবে যে, এগুলো ঠিকমত গাড়িতে তোলা হয়েছে কি-না, নয়তো এগুলোর সামনের নমনীয় অংশ ভেঙ্গে যেতে পারে। জাহানারার কামরার কাছে পৌঁছতেই দেখলেন দরজা খোলা আর একজন পরিচারিকা বাইরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তাঁকে দেখে সে বললো, ‘জাহাপনা, আপনার বোন জিজ্ঞেস করেছেন হেরেম থেকে বের হয়ে যাওয়ার আগে তিনি কি আপনার সাথে একবার দেখা করতে পারবেন?
‘অবশ্যই, একথা বলে আওরঙ্গজেব চন্দনকাঠের দরজার মধ্য দিয়ে জাহানারার ঘরের দিকে এগোলেন। সত্যি বলতে কি গত কয়েক সপ্তাহ তিনি তার সাথে একা সাক্ষাৎ করা এড়িয়ে চলছিলেন। আকবরের বিদ্রোহ নিয়ে তিনি আর কোনো কথা বলেন নি, তবে যখনই তার সাথে দেখা হত তিনি লক্ষ করতেন তার মুখ দেখে মনে হত তিনি খুব কষ্টে আছেন, কেমন যেন ভূতুড়ে চেহারা হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি বিরক্তবোধ করতেন। আওরঙ্গজেব যা করতে যাচ্ছেন কেন তিনি তার প্রয়োজনীয়তা বুঝতে চেষ্টা করছেন না, শুধু নিজের যুক্তি নিয়ে বসে আছেন?
