এবার আকবর ঘুরতেই টের পেলেন তার উরুর ক্ষতস্থান থেকে রক্ত চুঁইয়ে চুঁইয়ে নিচে পায়ের জুতা পর্যন্ত পড়ছে। তাকেও হেকিমের কাছে যেতে হবে। তিনি জানেন এভাবে একজন সৈন্যকে মুক্ত করে দিয়ে তার কাছে সাম্রাজ্যের ঐক্যের বিষয়ে একটি বার্তা দেওয়া সহজ এবং জনপ্রিয় হলেও তার লক্ষ অর্জন থেকে তিনি এখনও অনেক, অনেক দূরে। যতদিন তার বাবা বেঁচে আছেন তাকে সব সময় সতর্ক থাকতে হবে। তিনি কেবল যা সঠিক বিশ্বাস করেন তার জন্য চেষ্টা করে যাবেন। কতদূর সফল হবেন তা অনেকাংশে নির্ভর করছে সম্ভাজির সাথে মৈত্রির উপর। তাকে এটা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।
১৪. বিদায় ভাই
‘আমার কাছে তোমাকে জবাবদিহি করতে হবে। আমার সবচেয়ে প্রশিক্ষিত এবং অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত সেনাদলের অধিনায়কত্ব তোমাকে দিয়েছিলাম। অনেক আগেই তোমার বিশ্বাসঘাতক ভাইয়ের বিরুদ্ধে তোমার বিজয় এবং তার মৃত্যু কিংবা তাকে বন্দী অবস্থায় দেখে আমি আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করতে চেয়েছিলাম। তবে আমি আশা করি নি যে, তুমি তাকে তার সৈন্যসহ ময়দানে মুক্ত হয়ে ঘুরে বেড়াতে ছেড়ে দিয়ে আজমির ফিরে আসবে। কেন এটা করলে? দিওয়ান-এ-আমে যারা উপস্থিত হয়েছেন, তাদের মনের ভাবনা মুয়াজ্জম অনুভব করতে পারলো। সন্ধ্যা হওয়া সত্ত্বেও তার বাবা সকল উপদেষ্টা আর সেনাপতিদের এখানে উপস্থিত থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কেন তার বাবা এভাবে তাকে হেনস্থা করছেন? তাকে অন্তত কাদামাখা পোশাক বদলে আসার সুযোগ দিতে পারতেন। আর এভাবে সমস্ত সভাসদদের সামনে তাকে হাজির করারই বা কি দরকার ছিল? যেন তিনি তাঁর ছেলে নন, লজ্জাজনক কাজ করা কোনো কর্মকর্তা। পাঁচমাস হল তিনি বাইরে কাটিয়েছেন। এমন অবস্থায় যেকোনো বাবা প্রথমে একান্তেই দেখা করার কথা।
সোনার পাতে মোড়া একটা নিচু সিংহাসনে আওরঙ্গজেব পিঠ খাড়া করে গ্র্যানাইট পাথরের মতো মুখ নিয়ে তার সামনে বসেছিলেন। চিবুক উঁচু করে মুয়াজ্জম তার বাবার দিকে তাকিয়ে বললেন, বাবা আমি আপনাকে আমার বার্তাবহের মাধ্যমে জানিয়েছিলাম যে, আমি খুব দ্রুত অগ্রসর হতে চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু আকবর তার বাদবাকি সেনা আর রাজপুত মিত্রদের নিয়ে বেশ আগেই রওয়ানা দিয়ে অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিল। সেজন্য আমি গোলন্দাজ আর রসদবহর ছেড়ে দ্রুতগামী ঘোড়সওয়ার নিয়ে আলাদা দলে ছুটেছিলাম। তবে অনেক দ্রুত ছুটেও তাদের নাগাল পাই নি। আমার অগ্রবর্তী চরেরা তাদের পদক্ষেপ অনুসরণ করছিল, তবে ওরাও আমাদের সব সময় আমাদের দুই-তিনদিন দূরত্বে এগিয়েছিল। আমি ধারণা করেছিলাম, যেহেতু তার গুপ্তচরেরাও আমাদের গতিবিধি লক্ষ করছে, কাজেই যখন আমি আমার সেনাদলকে দুইভাগে বিভক্ত করলাম, তখন এ খবর পেয়ে আমার ভাই হয়তো পেছন ফিরে আমাদের উপর আক্রমণ করবে। কিন্তু সে হুঁশিয়ার হয়ে আমার টোপে পা দিল না।
‘তারপরও আমি চেষ্টা চালিয়ে গেলাম। মূল বাহিনীর জন্য অপেক্ষা করে, তারপর তাদেরক নিয়ে সবাই মিলে তার পেছনে মারাঠা পাহাড়ি অঞ্চলের দিকে এগোলাম। কিন্তু আবহাওয়া বাদ সাধলো। দিনের পর দিন গরম বেড়েই চললো। স্থানীয়রা খুব বিরূপ আর অসন্তুষ্ট ছিল, আমাদেরকে আসতে দেখেই সমস্ত গবাদিপশু আর খাবার-দাবার নিয়ে গ্রাম ছেড়ে পালাতে লাগলো। সুপেয় পরিষ্কার পানি পাওয়া খুব কষ্টকর হয়ে পড়লো। আমার ভাইয়ের সৈন্যরা আর সম্ভবত স্থানীয় লোকজন অনেক কূপের পানিতে বিষ মিশিয়ে দিয়েছিল কিংবা পানির ডোবায় মরা গবাদিপশু ফেলে রেখেছিল। এই দূষিত পানি পান করে আমার দেহরক্ষী দলের অধিনায়ক সাঈদ আজিজ বমি করতে করতে আর কাপড় ময়লা করে মারা যায়। আপনিতো জানেন সে কিরকম বলিষ্ঠ লোক ছিল।
বৃষ্টি শুরু হতেই স্বস্তির বদলে আরো সমস্যা নিয়ে এল। জমিন কর্দমাক্ত হয়ে– যাওয়ায় আমাদের চলার গতি ধীর হয়ে গেল। আমার শিবিরে আহ্নিক জ্বর আর অন্যান্য রোগ ছড়িয়ে পড়লো–হেকিম কিছুই করতে পারলো না। এরপর থেকে আমরা দৈনিক দুই তিন মাইলের বেশি চলতে পারলাম না। এরপর যখন দেখলাম আমার প্রায় অর্ধেক লোক অসুস্থ হয়ে পড়েছে আর অনেকে মারা গেছে, তখন সিদ্ধান্ত নিলাম এরপর আর অনুসরণ চালিয়ে যাওয়াটা অপরিণামদর্শী হবে। প্রাণহানির কথা ছেড়েই দিলাম। এ অবস্থায় আকবর আর মারাঠারা একত্রিত হয়ে উপরি আক্রমণ করলে আমার লোকেরা তা সামলাতে পারবে কি-না সে ব্যাপারেও আমি নিশ্চিত হতে পারলাম না। কারণ ইতোমধ্যে আমি খবর পেয়েছিলাম যে, মারাঠারাও তার সাথে যোগ দিয়েছে। কাজেই অনিচ্ছাসত্ত্বেও আমি উত্তরমুখি পিছু ফেরার নির্দেশ দিলাম। জানতাম আপনি আমার উপর অসন্তুষ্ট আর হতাশ হবেন, সেজন্য আমি আগেই রওয়ানা দিলাম যাতে যতদ্রুত সম্ভব ব্যক্তিগতভাবে সমস্তকিছু আপনাকে জানাতে পারি। আমার মূল বাহিনী আগামী মাসের মধ্যেই চলে আসবে। তখন আপনি নিজেই তাদের দুরবস্থা আর কতজন সংখ্যায় কমে গেছে দেখতে পারবেন। আপনার আদেশ পালন করার জন্য আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি, তবে আমি দেখতে পেলাম কাজটা অসম্ভব আর বিনা কারণে আমার লোকেরা প্রাণ হারাচ্ছে।
আওরঙ্গজেব স্থির হয়ে বসে রইলেন, তার চেহারা দেখে কিছুই বুঝা যাচ্ছে না কি ভাবছেন। মুয়াজ্জমের হৃৎস্পন্দন বেড়ে গেল। তার বাবা কি কিছু অনুমান করতে পেরেছেন? আওরঙ্গজেব মানুষের মনের গভীরে ঢুকে তাদের মনের গূঢ়তম চিন্তাও খুঁড়ে বের করতে পারতেন। তবে সে অত্যন্ত সতর্ক ছিল…কাউকেই তার আসল উদ্দেশ্য বলে নি। তার ফুফুকে একটি শব্দও চিঠি লিখে জানায় নি যাতে আওরঙ্গজেবের সন্দেহ হতে পারে। দক্ষিণে এই দীর্ঘ যাত্রায় হেঁটে চলার সময় প্রত্যেকবার যখন তার রণ হস্তী এপাশ-ওপাশ দুলতো, তখন প্রতি দুলুনির সাথে তার ফুফুর ফিস ফিস করে বলা কথাগুলো তার মাথায় প্রতিধ্বনিতৃ হত। আমার খাতিরে, তোমার নিজের জন্য আর সেই সাথে তোমার নিয়তির কথা ভেবে, বলছি অতি-উৎসাহী হইও না। সময় নিয়ে ধীরে সুস্থে প্রস্তুতি নিতে থাক আর সেভাবে ভাইয়ের খোঁজেও যাও। আর সে তার কথা পালন করেছিল, কারণ তার নিজের মনেও সে তাই করতে চাইছিল। আকবর বোকা আর নিজের সম্পর্কে তার অত্যধিক উচ্চ ধারণা ছিল। কেন সে ভাবতে পারলো যে, তাই ভাইদের চেয়ে মোগল সিংহাসনে বসার অধিকার। তার বেশি?–তবে আকবর রক্তপিপাসু কিংবা কঠিন মনের মানুষ ছিল না। আসলে সে ঠিক উল্টো ছিল, যদি সে সিংহাসন দখল করতেও চাইতো। তার বিশ্বাসই হয়না যে আকবরের পরিকল্পনা সফল হলে সে তাকে হত্যা করতো আর তিনি নিজেও তার ভাইয়ের হত্যাকারী হতে পারতেন না। তারপর সেই শুষ্ক, শাসরুদ্ধকর গরম, তারপর মৌসুমি বৃষ্টির কারণে সারাক্ষণ ভিজে থাকা–এগুলোই তার অগ্রযাত্রা ধীর হওয়া আর তারপর ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য যথেষ্ট অজুহাত ছিল। এছাড়া তার লোকজন আসলেও ক্লান্ত আর অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। মুয়াজ্জমের পেছন থেকে বিচলিত হয়ে কেউ কেশে উঠলো আর তিনি অন্যদের পা ঘষারও শব্দ পেলেন, তবে আওরঙ্গজেব কিছুই বললেন না। অনেকক্ষণ চুপ। থাকাটা তার বাবার একটি কৌশল। তিনি অসংখ্যবার তার বাবাকে এই কৌশল ব্যবহার করতে দেখেছেন…আর এতে লোকজন এত বিচলিত হয়ে পড়ে যে, তারা নিজেরাই নীরবতা ভেঙ্গে উল্টোপাল্টা কিংবা অর্থহীন কোনো কথা মুখ ফস্কে বের করে ফেলে। যার ফলে নিজেকে দোষারোপ করে কিংবা এমন কোনো দুর্বলতা প্রকাশ করে যার সুযোগটি নেন আওরঙ্গজেব। তবে তার বাবা তাকে ভয় দেখাতে পারবেন না। আর যদি তাকে সন্দেহও করেন, কোনো প্রমাণ পাবেন না।
