দাড়িওয়ালা হামলাকারীটি এবার তার তরোয়াল কোষমুক্ত করে আকবরের প্রায় কাছাকাছি এসে পড়েছিল। আওরঙ্গজেব জিন্দাবাদ–সকল বেঈমান নিপাত যাক’ চিৎকার করতে করতে সে উন্মক্তের মতো আকবরের দিকে তরোয়াল চালাল। আকবর দ্রুত তার তরোয়াল তুলে তার হামলা ঠেকালেন আর তারপর লোকটি আবার তাল সামলিয়ে আবার আক্রমণ করার আগেই আকবর তার তরোয়ালের ডগা লোকটির বগলের কাছে সেঁধিয়ে দিলেন। ক্ষতস্থান থেকে রক্ত ঝরা সত্ত্বেও হামলাকারী আবার আক্রমণ করার চেষ্টা করলো। তবে রক্তক্ষরণের কারণে সে দুর্বল হয়ে পড়ছিল আর এবার আকবর বেশ সহজেই তার তরোয়াল তার পেটে ঢুকিয়ে দিতেই সে ঘোড়ার পিঠ থেকে উল্টে নদীতে পড়ে গেল।
আকবর চতুর্দিকে চিৎকার, ইস্পাতের পাতের ঠোকাঠুকি আর মাঝে মাঝে পিস্তল আর গাদা বন্দুকের গুলি ছোঁড়ার শব্দ শুনতে পেলেন। তারপর হঠাৎ তার ঘোড়াটি সামনের দুই পা শূন্যে তুলে পেছনের পায়ে ভর দিয়ে খাড়া হতেই তিনি ঘোড়ার জিন থেকে পেছনের দিকে হড়কে পড়লেন। দুই হাত শূন্যে তুলে পানিতে পড়লেও তরোয়ালের বাট হাতেই ধরে রাখলেন। ঘোড়ার খুরের আঘাত এড়াতে তিনি নদীর কাদাভরা তলদেশে পা রেখে দাঁড়াতে চেষ্টা করতে লাগলেন। হঠাৎ তার চোখে পড়লো প্রায় দশ ফুট দূরে পানির উপরে বড় বড় দুটো হলুদ চোখ তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। পানিতে মানুষ আর পশুর রক্তের গন্ধ পেয়ে একটি কুমির ত্রিমুখী ধারালো চোয়াল হা করে তার ঘোড়ার পা। কামড়ে ধরতে ব্যর্থ হল। এটা দেখেই হয়তো তার ঘোড়াটি ভয় পেয়ে চমকে উঠেছিল। এবার কুমিরটি আবার চোয়াল হা করে তার দিকে ভেসে এল। সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ে আকবর দেহের সমস্ত শক্তি দিয়ে তার তরোয়ালের ডগা কুমিরের দাঁতের মাঝে গলায় বিধিয়ে দিলেন। ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরতে শুরু করলো। কাটাওয়ালা লেজটি পানিতে কয়েকবার ঝাঁপটিয়ে কুমিরের দেহ স্থির হল। তবে আরেকটি কুমির ভেসে আসতেই তিনি আবার তরোয়াল দিয়ে কোপ মারতেই কুমিরটি ঘুরে চলে গেল।
তারপর পেছনে চিৎকার চেঁচামেচির সাথে অনুভব করলেন দুটো বলিষ্ঠ বাহু তাকে জাপটে ধরে পেছনের দিকে টেনে নিচ্ছে। জগিন্দর তার একজন দেহরক্ষীকে সাথে নিয়ে আবার ঘোড়সহ নদীতে নেমে তাকে টেনে তীরের দিকে নিতে চেষ্টা করলো। তীরে পৌঁছে কোনোমতে নিজেকে সামলে খাড়া হলেন, সারা শরীর থেকে পানি ঝরছিল। হাতে তখনও তরোয়ালটি ধরা ছিল, চারদিকে তাকিয়ে দেখলেন আর কোনো ঘোড়া পাওয়া যায় কি-না যাতে লড়াইটি চালিয়ে যেতে পারেন। তবে হামলাকারীরা তখন ঘোড়া ছুটিয়ে সন্ধ্যার অন্ধকারে পালাতে শুরু করেছে আর আকবরের কিছু সেনা তাদের পিছু পিছু ছুটছে। নদীর পানি রক্তে লাল হয়ে রয়েছে আর কয়েকটি দেহ পানিতে ভাসছিল। তিনি লক্ষ করলেন একটি কুমির ধীরে একটি মানুষের দেহের দিকে এগিয়ে মুখ হা করে ঊরু কামড়ে ধরলো। সাথে সাথে প্রচণ্ড আর্তচিৎকার শোনা গেল। লোকটি তখনও জীবিত ছিল। কুমির তাকে পানির নিচে টেনে নিতেই সে ব্যর্থভাবে পানিতে হাত ছুঁড়তে লাগলো। তবে আল্লাহকে ধন্যবাদ, লোকটি শীঘ্রই মারা যাবে। তার জন্য করার কিছুই নেই, তবে অন্য কেউ বেঁচে থাকলে তাদেরকে সাহায্য করতে হবে।
কারও কাছে শুকনো পিস্তল কিংবা গাদা বন্দুক থাকলে এই বিভৎস পশুগুলোকে গুলি করে মার। আর অন্যরা কেউ জীবিত থাকলে তাদেরকে উদ্ধার কর। তিনি নিজে দৌড়ে নদীতে নেমে রশি ধরে সাঁতার কেটে একটি লোকের কাছে গেলেন। লোকটি দুর্বলভাবে হেঁটে তীরের দিকে আসার চেষ্টা করছিল। তখনও সে বারো ফুট দূরে ছিল। লোকটির বাড়িয়ে ধরা এক হাত জাপটে ধরে তিনি তাকে পাড়ের দিকে টেনে নিয়ে চললেন, এমন সময় একটা গুলির শব্দ শোনা গেল আর এক মানুষ দূরত্বে নদীর পানি ঘুরতে শুরু করলো। একটা বড় কুমির সবার অজান্তে এগিয়ে আসছিল, তবে পাড় থেকে একজন রাজপুত সেনার নজর এড়াতে পারে নি। সে সবার আগে তীরে উঠায় তার গাদা বন্দুক আর বারুদ শুকনো ছিল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে আকবর যে লোকটিকে বাঁচিয়েছিলেন তাকে টেনে নিয়ে তীরে উঠলেন। লোকটাকে তিনি চিনতে পারলেন না, তার পরনে ছিল মোগল সৈন্যদের সবুজ পোশাক। তার মানে সে নিশ্চয় হামলাকারীদের একজন। তার বাহুর উপরের অংশে একটি গভীর ক্ষত হয়েছে, চামড়া ছিঁড়ে গিয়ে লাল মাংসপেশির নিচে সাদা চর্বি দেখা যাচ্ছিল। কয়েকবার নোংরা পানি বমি করে ফেলার পর সে ধীরে ধীরে সুস্থ হতে লাগলো। আকবর তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “কেন আমাদের উপর আক্রমণ করেছ?
‘এখান থেকে দশ মাইল দূরে একটি মোগল ঘাঁটিতে আমরা ছিলাম। আমাদের অধিনায়ক সম্রাটের একজন একনিষ্ঠ সমর্থক। আপনার এদিকে আসার খবর পেয়ে পুরস্কার পাওয়ার আশায় তিনি আমাদেরকে অতর্কিতে আপনাদের উপর আক্রমণ করার নির্দেশ দিলেন। এখন লোকটি পানি থেকে উঠে আসার পর তার ক্ষত থেকে রক্ত উপচে উঠছিল, সারা শরীর কাঁপতে শুরু করলো। সে জিজ্ঞেস করলো, এখন আপনি আমাকে কি করবেন?
‘আমার হেকিমকে ডেকে তোমার ক্ষতস্থানে সেলাই করে পট্টি বেঁধে দিতে বলবো, তারপর তোমাকে মুক্ত করে দেব যাতে তুমি সম্রাটের কাছে ফিরে গিয়ে বলতে পার–যে ছেলেকে তিনি অধঃপতিত আর জঘন্য নীচ ব্যক্তি বলেছেন, সে তোমার জীবন বাঁচিয়েছে। আর এও জানাতে পার এর আগে আমার জীবন বাঁচিয়েছিল একজন হিন্দু রাজপুত আর একজন মুসলিম দেহরক্ষী। তাকে জানাবে এতে বুঝা যায়, যারা হিন্দুস্তানে বসবাস করে, তারা কেমনভাবে একসাথে মিলেমিশে কাজ করতে পারে আর আবার করবে যখন আমি তার বদলে সিংহাসনে বসবো।
