চলে যাওয়ার সময় মুয়াজ্জমের চেহারায় স্বস্তি ফিরে এল। উভয়সঙ্কটে পড়ে সে মনে যে কষ্ট পাচ্ছিল, তার ফুফুর কথায় তার একটা সমাধান খুঁজে পেল।
*
হাতের পিঠে ভ্রূ থেকে ঘাম মুছে আকবর ঘোড়র পাদানিতে দাঁড়িয়ে জঙ্গলঘেরা নদীর তীরের ছোট ছোট ঝোঁপঝাড়ের উপর দিয়ে ওপারে তাকিয়ে বললো, আমার মনে হয় দিনের আলো এখনও যথেষ্ট আছে, কাজেই আমরা সহজেই নদী পার হয়ে তারপর রাতের জন্য তাঁবু খাটাতে পারি, কি বল জগিন্দর?
জগির সায় দিয়ে বললো, আমাদের চরেরা বলেছে নদীর পার খুব বেশি খাড়া নয় আর এসময়ে নদী প্রায় শুকনো থাকায় সহজেই পার হওয়া যায়।’
আকবর মৃদু হেসে বললেন, ঠিক আছে চল এগিয়ে যাই। দ্রুত দক্ষিণ দিকে যাওয়ার সময় সে আর জগিন্দর বেশ কাছাকাছি হয়েছে। আকবরের সেনাবাহিনীর যে কজন সৈন্য তার সাথে রয়ে গিয়েছিল আর জগিন্দরের বাবা, আম্বারের রাজা তাদের সাথে যে ৫০০ রাজপুত অশ্বারোহী সেনা তাদের সাথে দিয়েছিলেন সবাই মিলে ওরা দক্ষিণ দিকে যাচ্ছিল। আকবরের সেনাদলটি এখন বেশ ছোট হলেও সে নিঃসন্দেহ হয়েছে যে, এরা তার প্রতি বিশ্বস্ত। কেননা মুখ ফিরিয়ে চলে যাওয়ার অনেক সুযোগ পেলেও ওরা চলে যায় নি। গৃহীত দায়িত্বের প্রতি তাদের অঙ্গীকার আর একতার কারণে ওর বাবা ওদের পেছনে যে সেনাদলকে পাঠিয়েছিলেন ওরা তাদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে পেরেছিল। কয়েকদিন আগে আকবর সম্ভাজির কাছে একজন দূত পাঠিয়েছিলেন, সে ফিরে এসে খবর দিয়েছিল যে, মারাঠা রাজা দাক্ষিণাত্যে এসে ওদের সাথে যোগ দিয়ে আওঙ্গজেবের বিরুদ্ধে সবার সাথে লড়বেন। এই খবরে আকবরের সৈন্যদের মনোবল আরো বেড়ে যায়।
সম্ভাজি চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন, সবাই মিলে আমরা তাকে দেখিয়ে দেব যে, হিন্দুস্তানের বৃহত্তর স্বার্থে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকলে একসাথে কাজ করতে পারে। এ ধরনের একজন শাসক, যিনি তারই মতো মনোভাব পোষণ করছেন তাকে তার মিশনের অংশীদার করাটা কত চমৎকার হবে। যখন সময় হবে, তখন সম্ভাজি আর সেই সাথে জগিন্দরের বাবার সমর্থন তিনি আবার অন্যান্য রাজপুত রাজ্যগুলোকেও তার সমর্থনে বিদ্রোহে জেগে উঠতে রাজি করাতে পারবেন। এরপর ওরা সবাই মিলে সাম্রাজ্যের অন্যান্য করদ রাজ্যগুলোর মধ্য থেকেও আরো মিত্র আকর্ষণ করতে পারবেন। আর তার গোঁড়ামিপূর্ণ বাবার সাথে যেসব রাজ কর্মকর্তা আর সেনাপতির নামকাওয়াস্তে সমর্থন রয়েছে তাদেরকেও প্রলুব্ধ করে দলে টানা যেতে পারে। তবে এখনই পরে কি হবে সে চিন্তা করার দরকার নেই। তার প্রথম কাজ হবে সম্ভাজির সাথে এক জায়গায় মিলিত হয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কটি সুপ্রতিষ্ঠিত করা।
‘জগির তুমি পঞ্চাশজন রাজপুত যোদ্ধা নিয়ে নদী পার হয়ে তীরের একটু দূরে খুঁটি পুতে ফেল। তারপর আমরা নদীর এপার থেকে ওপার পর্যন্ত একটি রশি টেনে নেব। এতে আমাদের লোকজন আর দুর্বল ঘোড়াগুলোর নদী পাড় হওয়া সহজ হবে।’
জগিন্দর সাথে সাথে পেছন ফিরে একজন কনিষ্ঠ সেনা কর্মকর্তাকে ডেকে তার লোকজনসহ তাকে অনুসরণ করতে বললো। তারপর সে ঘোড়া ছুটিয়ে ঝোঁপঝাড়ের মধ্য দিয়ে নদীর তীরের দিকে চললো। পনেরো মিনিটের মধ্যে একজন রাজপুত জগিন্দরের কাছ থেকে বার্তা নিয়ে এল প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে, এখন মূল সেনাদল নদী পাড় হওয়া শুরু করতে পারে। আকবর সাথে সাথে তার লোকদের নির্দেশ দিলেন পাঁচজন পাঁচজন করে পাশাপাশি হয়ে নদী পাড় হওয়া শুরু করতে।
চারপাশে দেহরক্ষী দল নিয়ে তিনি সারির আগে অবস্থান নিলেন। নদীর তীরের গাছের জঙ্গলে ঢুকতেই রাতের জন্য বাসায় ফেরা পাখিগুলো বিরক্ত হয়ে কিচিরমিচির করতে করতে শূন্যে ভাসলো। চর যেরকম জানিয়েছিল নদীর সেরকম পাড় বেশ মসৃণ আর নিচে নদীর বুকে ঘোড়ার খুরের নিচে শক্ত মাটি ছিল। নদীতে তিনফুট গভীর পানির স্রোত বেশ ধীর গতিতে বয়ে চলছিল। তিনি ঘোড়া নিয়ে নদীতে নামতেই একজোড়া সারস ডানা ঝাঁপটাতে ঝাঁপটাতে তার মাথার উপর দিয়ে উড়ে গেল। একটু পরই তিনি নদীর ওপারে পৌঁছবেন আর তারপর ক্লান্ত শরীরকে বিশ্রাম দিয়ে কিছু খাবার মুখে দিতে পারবেন। একটানা সারাদিন ঘোড়ার পিঠে কাটিয়ে তার হাত-পায়ে ব্যথা হয়ে গিয়েছিল। তার ঘোড়াটি একটু হোঁচট খেয়ে মাথা ঝাঁকাতে শুরু করলো। সম্ভবত নদীর স্রোত পায়ে লাগতেই ঘাবড়ে গিয়ে একটু অসতর্ক হয়ে উঠেছিল। তিনি ঘোড়ার রাশ শক্ত করে ধরে সামনে ঝুঁকে ঘোড়াটির কানে সান্ত্বনাসূচক কথা বলতে শুরু করলেন। ঠিক তখনই কড়াৎ করে একটি আওয়াজের সাথে সাথে তার উরুতে হুল ফোঁটানোর মত যন্ত্রণা হল। তিনি হাত দিয়ে দেখলেন রক্ত বের হচ্ছে। কি ব্যাপার কী হচ্ছে? তার লোকদের বিশ্বস্ততা নিয়ে তিনি কি ভুল ধারণা করেছিলেন? তার বাবার নির্দেশে এক বা একাধিক লোক কি ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছিল, সুযোগ পেলেই তাকে শেষ করে ফেলার?
না। আরো গুলির শব্দ হতেই তিনি খাপ থেকে তরোয়ালটি বের করলেন। তারপর হঠাৎ চিৎকার করতে করতে একদল অশ্বারোহী নদীর অপর তীরের জঙ্গল থেকে বের হয়ে ঘোড়াসহ ছুটতে ছুটতে নদীতে নেমে পড়লো এবং চারদিকে পানি ছিটিয়ে এসে তার লোকদের উপর আক্রমণ করলো। হামলাকারীদের সবার আগে একটি বাদামি ঘোড়ায় চড়ে মুখভরা দাড়ি নিয়ে একজন লোক তার হাতে ধরা পিস্তল দিয়ে একজন তরুণ রাজপুত অশ্বারোহীকে গুলি করলো। গুলির আঘাতে আহত হয়ে সে ঘোড়ার পিঠ থেকে মুখ থুবড়ে নদীর অগভীর পানিতে পড়ে গেল। আকবরের একজন দেহরক্ষী তার দিকে ঘোড়া ছুটাতেই সে পিস্তলে আবার গুলি না ভরে, উল্টো করে ধরে কয়েকফুট দূরে থাকতেই দেহরক্ষীটির দিকে ছুঁড়ে মারলো। পিস্তলের ভারী ইস্পাতের বাট দেহরক্ষীর ঘোড়াটির চোখের মাঝখানে আঘাত করলো। যন্ত্রণায় চিহিহি চিৎকার করে ঘোড়াটি সামনের দুই পা তুলে পেছনের পায়ে ভর দিয়ে খাড়া হতেই তার আরোহী সমেত পাশের দেহরক্ষীকেও পানিতে ফেলে দিল। তারপর কোনোমতে চার পায়ে খাড়া হয়ে গা ঝাড়া দিয়ে যন্ত্রণায় তখনও চিহিহি করতে করতে নদী থেকে উঠে ছুটে পালাল।
