ভাই-বোনের ভালোবাসার সম্পর্কেও কথা শুনে তার ঠোঁটে মৃদু হাসির রেখা দেখা দিয়েছিল, কিন্তু জেবুন্নিসার সাথে রওশনআরার তুলনা করায় তাঁর ভ্র কুঁচকে উঠলো। এই তুলনাটি করা হয়তো তার ঠিক হয় নি, তবে না করেও পারেন নি। এখন যদি তিনি তার উদ্দেশ্যে সফল হতে চান, তাহলে তাকে অন্য রাস্তা ধরতে হবে। কাজেই আবার বললেন, “আমরা হয়তো ঘটনার পুরোপুরি বিবরণ না জেনেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলছি যে, সে তোমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। আমাদের বাবা একবার ভুল করে নিকোলাস ব্যালেন্টাইন নামে একজন ইংরেজের সাথে আমার সম্পর্ক নিয়ে দোষারূপ করে আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ না দিয়ে আমাকে গৃহবন্দী করেছিলেন। তুমি অন্তত জেবুন্নিসাকে ডেকে তার কথাটাও শোন।
না, এই চিঠিগুলোতেই তার অপরাধ পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে। তারপর এক মুহূর্ত পর বললেন, ‘বোন, তাকে দেখলে হয়তো আমার মন নরম হয়ে যাবে আর তাতে আমি সঠিক এবং ন্যায় বিচার করে তাকে উপযুক্ত শাস্তি দিতে পারবো না। কারণ সঠিক শাস্তি হলে তা ভবিষ্যতে কাছের বা দূরের কোনো নারী কিংবা পুরুষ আত্মীয় যদি বিশ্বাসঘাতকতার কথা ভাবে তাদের জন্য একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
জাহানারা আর কিছু বললেন না। আর বলেই বা কি লাভ? তাঁকে এখন মেনে নিতে হবে, জেবুন্নিসা আর রাজপরিবারের অন্যান্য মহিলা নিয়ে তিনি আকবরের পক্ষে ওকালতি করার যে আশা করেছিলেন তা এখন ধূলিসাৎ হয়ে গেল।
*
দুই দিন পর আবার জাহানারা আর আওরঙ্গজেব এক টেবিলে খেতে বসলেন। তিনি জাহানারা আর মুয়াজ্জমকে তার সাথে খাবার খেতে ডেকেছিলেন। মুয়াজ্জম সেদিন সকালেই পাঁচশো অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে দুর্গে পৌঁছেছিল। আকবরের বেশির ভাগ সৈন্য ছত্রভঙ্গ হয়ে গেছে শোনার পর তিনি আকবরকে ধরার জন্য নতুন করে একটি সৈন্যদল গঠন করছিলেন। আর আকবরকে লেখা জেবুন্নিসার চিঠিটা পড়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাকে হাতির পিঠে একটি চারদিক বন্ধ হাওদায় চড়িয়ে আজমির থেকে গোয়ালিয়রে কারাগারে পাঠিয়ে দিলেন। ক্রন্দনরত ভাতিজিকে বিদায় দেওয়ার সময় জাহানারা তাকে চুমু খেয়ে ফিসফিস করে বললেন যে, তার বাবা যাতে তাকে ক্ষমা করেন সেজন্য তিনি যথাসাধ্য চেষ্টা করবেন। সেই সাথে তার হাতে একটি সুফি কিতাবও গুঁজে দিলেন এই আশায় যে হয়তো এটা পড়ে সে মনে সান্ত্বনা পাবে। তারপর শীঘ্র তিনি আওরঙ্গজেবকে অনুরোধ করবেন জেবুন্নিসার পছন্দের ব্যক্তিগত কিছু জিনিসপত্র তার কাছে পাঠিয়ে দিতে যাতে তার কারাবাস একটু সহনীয় হয়।
তার নিজের খাওয়ার রুচি ছিল না। প্রকৃতপক্ষে জেবুন্নিসার ব্যাপারটি জানার পর থেকেই তিনি মুখে প্রায় কিছুই দেন নি আর সামান্য যা কিছু খেয়েছিলেন, সাথে সাথে তা বমি করে ফেলে দিয়েছিলেন। তিনি শুনেছিলেন সেনা কর্মকর্তারা বলাবলি করতো যে, তাদের দুর্বল চিত্তের সৈন্যরা যুদ্ধের কথা শুনলেই আক্ষরিক অর্থেই অসুস্থ হয়ে পড়তো। তিনিও নিশ্চয়ই আতঙ্কে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন–তবে সেটা যুদ্ধের ভয়ে নয়, তিনি অসুস্থ হয়েছেন তাঁর পরিবারের ভবিষ্যতের কথা ভেবে। তাঁর এই আতঙ্ক যাতে সত্যি সত্যি বাস্তবরূপ লাভ না করে, সেজন্য তাকে যথাসাধ্য চেষ্টা করতে হবে তা থামাতে। প্রকৃতপক্ষে একটু হলেও সে চেষ্টা করবেন।
প্লেটে যে সামান্য ডাল আর খাসির মাংসের কাবাব ছিল, তা ছুঁয়েও দেখেন নি। মুখ তুলে দেখলেন আওরঙ্গজেব খাওয়া শেষ করে একটি সুতির কাপড় দিয়ে মুখ মুছে পাশের প্লেটে রাখছেন। তারপর তিনি মুয়াজ্জমের দিকে ফিরে বললেন, তুমি যে এত তাড়াতাড়ি আমার কাছে এসে পৌঁছতে পেরেছ সেজন্য আমি তোমাকে আবার অভিনন্দন জানাচ্ছি। আর সেই সাথে মারওয়াড়ে যে সফল অভিযান করেছ সেই জন্যও।
মুয়াজ্জম মৃদু হেসে বললেন, ‘ধন্যবাদ, বাবা। তবে আগে আওরঙ্গজেবের সাথে থাকলে তিনি যেরকম নরম হাসি দিতেন আজকের হাসিটি সেরকম মনে হল না।
‘এখন আমি চাই তুমি তোমার রাজভক্তি আরেকবার প্রমাণ কর। তুমি সেই বিশ্বাসঘাতক আকবরের খোঁজে গিয়ে তাকে ধরে দিল্লি নিয়ে আসবে। যদি তাকে ধরার জন্য মেরেও ফেলতে হয় তবে, সমস্ত মমর্যন্ত্রণা ঝেড়ে ফেলে তাই করবে। সে জীবিত থাকলে যে রকম তাকে সারা দিল্লি ঘুরিয়ে দেখাতাম সেরকম তার লাশও তাই করতে পারবো।’
আতঙ্কে জাহানারা জমে গেলেন। মুয়াজ্জমের চেহারাও বদলে গেল আর তার কপালে একটি শিরা দপ দপ করতে লাগলো। সে বললো, “ঠিক আছে। তবে আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করবো যাতে সে আত্মসমর্পণ করে। তাকে আমি মারতে চাই না…সে আমার ভাই।’
‘তুমি ভুল বলছো। সে আর তোমার ভাই নয়। জেবুন্নিসার মতো তার কার্যকলাপ তাকেও পরিবারের বাইরে নিয়ে গেছে।’
মুয়াজ্জম মাথা নিচু করে টেবিলের উপর থরে থরে সাজান নানারকম সুস্বাদু খাবারের দিকে তাকিয়ে বললো, আমি আপনার নির্দেশ পালন করবো, যেরকম মারওয়াড় আর অন্যান্য জায়গায় করার চেষ্টা করেছি।’
‘ভালো। এবার যাও প্রস্তুতি নিতে শুরু কর, যাতে আকবরের খোঁজে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব যেতে পার।
মুয়াজ্জম উঠে দাঁড়াল, একটু ইতস্তত করে তার বাবার দিকে মাথা ঝুঁকিয়ে তারপর বের হয়ে গেল।
জাহানারাও উঠলেন। লাঠিতে ভর দিয়ে তিনি তার ভ্রাতুস্পুত্রকে অনুসরণ করে দরজা পর্যন্ত গিয়ে টেনে নিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। গালে চুমু খাওয়ার সময় ফিস ফিস করে কানে কানে বললেন, “আমার খাতিরে, তোমার নিজের জন্য আর সেই সাথে তোমার ভবিতব্যের জন্য বলছি অতি-উৎসাহী হইও না। সময় নিয়ে ধীরে সুস্থে প্রস্তুতি নিতে থাক আর সেভাবে ভাইয়ের খোঁজেও যাও।
