তার ভাই যখন বার্তাবহদের ধন্যবাদ দিচ্ছিলেন আর ওয়াজিম খানকে আরো কিছু নির্দেশনা দিচ্ছিলেন, জাহানারা তখন চুপ করে দাঁড়িয়েছিলেন। তার মনে পড়ে গেল সেই কাহিনীর কথা যা তিনি শুনেছিলেন যে, আওরঙ্গজেবের সৈন্যরা দারাশিকোকে ধরার পর বন্দী করে ছালার পোশাক পরিয়ে একটি হাতির পিঠে চড়িয়ে সারা দিল্লি ঘুরিয়ে তারপর তাকে হত্যা করেছিল। হায় আল্লাহ আকবরের যেন এই অবস্থা না হয়। তোক তিনটি চলে যাওয়ার পর তিনি আস্তে আস্তে আওরঙ্গজেবকে বললেন, আওরঙ্গজেব, আমি তোমার কাছে কৃতজ্ঞ যে তোমার কৌশলের কারণে রক্তপাত এড়াননা গেছে। আমি সত্যি আমার পরিবার আর রাজপুতদের মাঝে আমাদের বন্ধু আর সেই সাথে আমাদের সৈন্যদের জন্য ভয় পাচ্ছিলাম…।
আওরঙ্গজেব তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, আপনি খুব বেশি দয়ালু। কতজন রাজপুত মারা যেত সেটা কোনো বিবেচনার বিষয় নয় আর সেই জঘন্য নীচ অপরাধী আকবর আমার ছেলে নয়। তবে আমাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হবে, যারা আল্লাহর প্রতি আর সাম্রাজ্যের প্রতি বিশ্বস্ত, তারা কেউ আজ মারা যায় নি আর সেজন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতে হবে।
আওরঙ্গজেবের কণ্ঠস্বরে ঘৃণার আভাস পেয়ে জাহানারা যে যুক্তিগুলো মনে মনে সাজাচ্ছিলেন তা আর প্রকাশ করলেন না। তাঁর ইচ্ছা ছিল তিনি আওরঙ্গজেবকে যুক্তি দিয়ে বুঝাবেন যে, সাম্রাজ্যের মাঝে নতুন করে ঐক্য আনার প্রতীকি চিহ্ন হিসেবে আকবর আর রাজপুতদের ক্ষমা করে দেওয়া যায়। তবে এখন এসব কথা বলা বৃথা। তার চেয়ে বরং সময় আর সুযোগের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। প্রয়াজন হলে গওহরা, জানি, জেবুন্নিসা আর সম্ভব হলে উদিপুরী মহলের সমর্থন নিয়ে এক ধরনের মেয়েলি দরখাস্তের মতো ব্যবস্থা নিতে হবে। তিনি শুধু বললেন, ‘আকবরকে খোঁজার জন্য মুয়াজ্জমকে পাঠানো এছাড়া এরপর আর কী ব্যবস্থা নেবে?
‘আকবরকে ছেড়ে যারা চলে এসেছে, তাদের আত্মসমর্পণ আমি গ্রহণ করবো, তবে সময় মতো ওদের মধ্যেকার সেনা কর্মকর্তাদেরকে এমন জায়গায় বদলি করবো যাতে ওরা আর কোনো সমস্যা সৃষ্টি করতে না পারে। আর যে কথা দিয়েছিলাম সে অনুযায়ী তাহার খানকে সবার সামনে খোলাখুলিভাবে পুরস্কৃত করবো, যাতে সবাই দেখতে পারে যে, আমি আমার কথা রাখি। আর এতে ভবিষ্যতে যদি কাউকে কোনো কথা দেই তা লোকে বিশ্বাস করে। তবে তার উপর নজর রাখা হবে। তার মন আকবরের কাছে পড়ে থাকবে আর তার বিশ্বাসঘাতকতা তার মনকে বিষাক্ত করে তুলবে। কে জানে সে কী করবে? তাকে আমি আর কখনও বিশ্বাস করতে পারবো না।
তার পরিবারের সবাইকে নিশ্চয় কোতল করা হবে না, তাই না?
‘মেয়েদেরকে হয়তো করা হবে না–তবে তাদের এমন দুরবস্থা করা যাবে যাতে ওরা চাকরের মতো ছোট কাজ করতে বাধ্য হয়। পুরুষগুলোকে কোতল করে আমি কোনো আনন্দ পাবো না, তবে দুর্বল চিত্ত মানুষদের উচিত নয় কখনও কাউকে ভয় দেখান, যদি তা ওরা পালন করতে পারবে না।’
একঘণ্টা পর ভাইবোন আবার একসাথে সকালের নাস্তা খেতে বসেছেন। আওরঙ্গজেব বেশ তৃপ্তির সাথে রুটি আর সজির তরকারি খাচ্ছিলেন, তবে জাহানারা পারছিলেন না। তিনি কেবল খাবারগুলো আঙুল দিয়ে নাড়াচাড়া করে প্লেটের উপর চারপাশে ঘুরাচ্ছিলেন আর আঙুল দিয়ে রুটির টুকরাগুলো ছিঁড়ছিলেন। আওরঙ্গজেবের বিজয় পরিকল্পনা আকবর আর সাম্রাজ্যকে কোথায় নিয়ে ফেলেছে সেকথা ভেবে তার মনে যে দারুণ দুশ্চিন্তা চলছে, সে এ অবস্থায় কেমন করে মুখে খাবার তুলবেন। এমন সময় ওয়াজিম খান কামরায় ঢুকতেই তিনি মুখ তুলে তাকালেন। এই মিষ্টভাষী চক্রান্তকারী লোকটিকে তিনি অত্যন্ত অপছন্দ করেন। সে তার ষড়যন্ত্রমূলক পরামর্শগুলো দিয়ে তার ভাইয়ের সন্দেপ্রবণ মনে একটি আস্থার আসন গড়ে তুলেছে। এখন সে অর্ধেক পোড়া কতগুলো কাগজ হাতে নিয়ে গম্ভীরমুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
‘জাহাপনা এগুলো আপনার দেখা দরকার। আমার লোকেরা আপনার ছেলের পরিত্যক্ত তাঁবুতে এগুলো খুঁজে পেয়েছে। আমার মনে হয় শাহজাদা খুব তাড়াহুড়া করে চলে যাওয়ার সময় এগুলো পুরোপুরি পুড়াতে পারেন নি।
‘কি এগুলো?
তার কাছে লেখা তার বোন জেবুন্নিসার চিঠি।
জাহানারার শীর্ণ শরীরের মধ্য দিয়ে একটি শীতল স্রোত বয়ে গেল।
নিচু যে খাওয়ার টেবিলে বসে ভাই-বোন নাস্তা খাচিছলেন, আওরঙ্গজেব সেখান থেকে উঠে হাত বাড়িয়ে বললেন, ‘দেখি চিঠিগুলো। ইদানীং তিনি গলায় একটা সবুজ ফিতায় চশমা ঝুলিয়ে রাখেন। কম আলোয় কোনো কিছু পড়তে হলে এই চশমাটি ব্যবহার করতেন, আজও সে প্রয়োজন হওয়ায় চশমাটি উঠিয়ে চোখে লাগালেন। কয়েকমুহূর্ত পর চিঠিগুলো মাটিতে ফেলে দিয়ে বললেন, ‘আরো বিশ্বাসঘাতকতা। আর এমন এক জায়গা থেকে যা কখনও আশা করি নি!
ব্যাপারটা অনুমান করতে পারলেও জাহানারা যন্ত্রের মতো জিজ্ঞেস করলেন, ‘জেবুন্নিসা চিঠিতে কি লিখেছে?
‘সে আকবরকে তার বিদ্রোহে সমর্থন আর উৎসাহ দিয়ে তার বিজয় কামনা করেছে।
জেবুন্নিসা যে এরকম ধারণা পোষণ করছে তা জেনে জাহানারা অবাক হলেন না। তাঁর ভাইঝি আকবরের অনেক সহিষ্ণু মতবাদের অংশীদার ছিল, যা তাঁর নিজের মতবাদগুলোরও বেশ কাছাকাছি। তবে বোকার মতো তার বিদ্রোহে উৎসাহিত করা ঠিক হয় নি, আবার কাগজে-কলমে লিখে তা জানান দিয়েও আরো বোকামি করেছে। আওরঙ্গজেবের চোখে এখন যে আগুন জ্বলছে, কি বলে তা উপশম করবেন? তারপরও বললেন, ভাই, জেবুন্নিসা খুবই বোকা একটি মেয়ে–না, তার চেয়েও বেশি, নিজের ভাইকে উৎসাহ দিয়ে সে আপনার অবাধ্য হয়েছে–তবে দয়া করে তার প্রতি বেশি কঠোর হইও না। তুমি জান আর আমিও জানি, আমাদের মধ্যে মতের পার্থক্য থাকলেও ভাই বোনের ভালোবাসার সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। যে কারণে রওশনআরা বাবার বিরুদ্ধে তোমার সাথে হাত মিলিয়েছিল। এখন যদি তুমি মনে কর রওশনআরা ঠিক কাজই করেছিল, তাহলে হয়তো এখন তুমি বুঝতে পারছো তিনি তখন কি অনুভব করছিলেন।
