*
আকবর চিঠিটা একপাশে ছুঁড়ে ফেললেন। তাহাব্বুর খান আর রাজপুতদের তিনি কোনো দোষ দিতে পারলেন না। তার বাবা কৌশল করতে গিয়ে এমন নিচে নেমেছেন যা, তিনি নিজে কখনও করতে পারতেন না। তবে তিনি আকবরকে ঠিকই বোকা বানিয়েছেন। হিন্দু আর মুসলিম, রাজপুত আর মোগলদের সম্পর্কের মধ্যে যে ফাটল ধরেছিল, তা এত গভীর ছিল যে, তিনি এত অল্প সময়ে তা কাটিয়ে উঠতে পারেন নি। আওরঙ্গজেব বেশ সহজেই পুরোনো ক্ষতটি আবার খুঁচিয়ে তুলেছেন। তবে আকবর এত সহজে হাল ছেড়ে দেবেন না। কারণ একটি বিষয় হল, তিনি বিশ্বাস করেন না যে তার বাবা তাকে ক্ষমা করবেন। এটা ছিল তাহাব্বুর খানকে বশ করার আরেকটি চাল। তার বাবা সব সময় তার কাছের মানুষদের প্রতি ক্ষমাহীন ছিলেন। গৃহযুদ্ধের সময় আওরঙ্গজেব প্রতারণা করে তাঁর ভাই মুরাদকে বন্দী করেছিলেন, তারপর তাকে হত্যা করেন। তাঁর সবচেয়ে বড় ছেলেকে আওরঙ্গজেব নিজে কারাগারে আটক করেছিলেন, যেখানে শেষ পর্যন্ত তার মৃত্যু হয়। যদি আকবর তার সেনাদলকে হারিয়েও ফেলেন, তারপরও তিনি নিজেকে এ ধরনের পরিণতির কাছে সঁপে দেবেন না।
তাছাড়া তিনি যদি হাল ছেড়ে দেন, তাহলে এই আত্মসমর্পণ হবে চিরদিনের জন্য নিজের আশা-আকাঙ্ক্ষা বিসর্জন দেওয়া আর সেই সাথে সমগ্র সাম্রাজ্যকে বিভিন্ন বিভক্তি, সন্দেহ, ধর্মীয় আর তার বাবার ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার মাঝে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে যেতে দেওয়া। তিনি বরং তার প্রচেষ্টা আরো তীব্রতর করবেন। তার পূর্বপুরুষ বাবর এবং হুমায়ুন তাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে গিয়ে এর চেয়েও খারাপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিলেন। তার পিতামহ শাহজাহানেরও একই অভিজ্ঞতা হয়েছিল। তাদের অভিজ্ঞতা আর নিজের সঞ্চিত সাহস থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাবেন সাম্রাজ্যকে নতুন করে ঐক্যবদ্ধ করতে যা, তার নিজের নামের মহান সম্রাট আকবর প্রথম করেছিলেন। তরুণ কোরচির দিকে ঘুরে তিনি বললেন, যারা এখনও আমার অনুগত আছে তাদেরকে ডেকে আন। আমরা এখুনি আমবারের রাজার কাছে যাব যদি, এতটুকু বলে জগিন্দরের দিকে ফিরে তারপর বললেন, তিনি আমাদের নিরাপত্তা দেন।
‘তিনি তা অবশ্যই দেবেন, আমি আপনাকে নিশ্চয়তা দিচ্ছি, জাঁহাপনা।
‘তাহলে এখনই রওয়ানা দেওয়া যাক। কয়েক মিনিটের মধ্যে যা যা জিনিসপত্র নেওয়া যায়, নিয়ে বাকি সব কিছু ফেলে যেতে হবে।
‘কোনো খবর পাওয়া গেল?
বোনের গলার আওয়াজ পেয়ে আওরঙ্গজেব ঘুরে দেখলেন একটি খিলানযুক্ত দরজার মধ্য দিয়ে জাহানারা আজমির দুর্গের প্রাচীর ঘেরা ছাদের একটি নির্জন অংশের দিকে এগিয়ে আসছেন। এখান থেকেই আওরঙ্গজেব নিচে সমতল ভূমির দিকে তাকিয়ে রয়েছেন, যেখান দিয়ে আকবরের শিবিরের অশ্বারোহী দল আসার কথা। তিনি এখনও খাড়া হয়ে দাঁড়াতে পারলেও তার ৬৭ বছর বয়সী বোন একটু কুঁজো হয়ে হাতির দাঁতের হাতলওয়ালা একটি লাঠির উপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। সকাল বেলার ঠাণ্ডা এড়াতে তার গায়ে একটি শাল জড়ান ছিল। না কিছুই না।
জাহানারার চোয়াল ঝুলে পড়লো। আকবরের বিদ্রোহের কারণে তাঁর দেহ-মন দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তিনি আওরঙ্গজেবের কাছে স্বীকার করেছেন যে, তার জন্য চিন্তা আর সেই সাথে সাম্রাজ্যের ঐক্যের সাথে তার ভাইয়ের ছেলের প্রতি তার ভালোবাসার দ্বন্দ্ব, এসব মিলে দুশ্চিন্তায় তিনি ঘুমাতে পারছেন না। দুই এক মুহূর্ত পর নিজের অস্থিরতা দমন করতে না পেরে আওরঙ্গজেব ছাদের উপর পায়চারি করতে লাগলেন। একটু পর পর দিগন্তের দিকে তাকাচ্ছেন, তবে বৃষ্টির কারণে সে জায়গাটি ঝাপসা দেখাচ্ছে। তারপর বৃষ্টির মধ্য দিয়ে দেখা গেল দুজন অশ্বারোহী এদিকে আসছে। মাঠ থেকে ঢালু পথ বেয়ে উপরের দিকে দুর্গের প্রধান ফটকের কাছে আসতে লাগলো। নিশ্চয়ই বার্তাবাহক।
দীর্ঘ দশ মিনিটের অনিশ্চয়তার পর দুই অশ্বারোহী হাজির হল। আপাদমস্তক বৃষ্টিতে ভেজা আর কাদা ছিটা। পরিষ্কার ধোপদুরস্ত কালো পোশাকপরা ওয়াজিম খান ওদেরকে সাথে নিয়ে এল। চওড়া মুখে হাসি নিয়ে সে বললো, ‘আপনার পরিকল্পনায় কাজ হয়েছে, জাঁহাপনা। রাজপুতরা প্রায় সবাই পালিয়ে গেছে, সেই সাথে আকবরের অধিকাংশ সৈন্য। তাহাব্বুর খান আর অন্যান্য দলছুট সৈন্যরা আপনার অনুমতির জন্য অপেক্ষা করছে। আপনার অনুমতি পেলে ওরা এসে আপনার কাছে আত্মসমর্পণ করবে।
নিরুদ্বেগ হয়ে আওরঙ্গজেব শরীর মন শিথিল করে হাঁটু গেড়ে মুনাজাতে বসে পড়লেন। এই ধারণাটি আমাকে দেওয়ার জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি। একটি ন্যায্য কারণ আর শক্তিশালী মন প্রচুর অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত কিন্তু দুর্বলচিত্ত এবং বিশ্বাসঘাতক একটি দলকে পরাস্ত করেছে।
উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জাহানারা জিজ্ঞেস করলেন, আর আকবরের খবর কী?
আওরঙ্গজেব ওয়াজিম খানকে জিজ্ঞেস করলেন, আমার মনে হয় সে। রাজপুতদের সাথে চলে গেছে, তাই না? ওয়াজিম খান মাথা নেড়ে সায় দিল। ‘ঠিক আছে। দুই-তিন দিনের মধ্যে মুয়াজ্জম চলে আসবে। কারণ সে মূল সেনাবাহিনীর আগেই রওয়ানা দিয়েছে। সে এলেই তাকে আমি তার ভাইয়ের খোঁজে পাঠাব। সেখান থেকে সে আকবরকে ধরে শিকলে বেঁধে দিল্লি নিয়ে আসবে।’
