‘হ্যাঁ, জাঁহাপনা। আমি তা বিশ্বাস করেছি বলেই এখানে রয়ে গেছি। প্রথমে সভার সবাই চিঠিটার বিষয়বস্তু বিশ্বাস করে নি, তবে সভার সবার সামনে জিজ্ঞাসাবাদের সময় পরবর্তীতে বন্দী লোক দুটো আরো কিছু তথ্য জানাল। যেমন, সারির একেবারে প্রথমে ঘোড়ায় চড়ে যাওয়ার সময় আপনি হঠাৎ ঘুরে যাবেন আর তার ঠিক আগেই আপনার পাশে পাশে চলা কোরচি তার হাতের পতাকাটি মাটিতে ফেলে দিয়ে আপনার বাবার গোলন্দাজদের সংকেত দেবে। তখন কামানের গোলা বর্ষণ শুরু হবে। ততক্ষণে প্রায় সবাই এটা বিশ্বাস করলেন। আমার বাবা অবশ্য প্রস্তাব করলেন আপনার মুখোমুখি হয়ে আত্মপক্ষ সমর্থন করার জন্য আপনাকে একটা সুযোগ দিতে। আপনার সাথে কথা বলার জন্য তিনি একজন সেনা কর্মকর্তাকে পাঠালেন। তবে আপনার দেহরক্ষী দলের একজন সেনানায়ক বললো, আপনি ঘুমাচ্ছেন আর তার কঠোর নির্দেশ আছে, ঘুমন্ত অবস্থায় আপনাকে যেন বিরক্ত না করা হয়। বিশেষত রাজপুতরা যেন কোনো মতেই আপনার শিবিরের কাছে আসতে না পারে। সেনা কর্মকর্তা ফিরে যখন জানাল আপনার দেহরক্ষী দলের নেতা কি বলেছে তখন তা সভাসদদের সন্দেহ আরো উসকে দিল। পরিশেষে ওরা একমত হল যে, সবাই মিলে আপনার সাথে আজমির যাওয়ার ঝুঁকি নেওয়ার চেয়ে এই মুহূর্তে এখান থেকে সরে পড়াটাই বরং নিরাপদ হবে। আমার বাবার মতো আরো কয়েকজন কাছাকাছি থাকতে চেয়েছিলেন, তবে অন্যান্যে যার যার রাজ্যে ফিরে যাওয়ার পক্ষে ছিলেন। রাতে ঝড়ের আড়ালে বেশিরভাগই শিবির উঠিয়ে চলে গেলেন। আমার বাবা এখান থেকে কয়েক মাইল পশ্চিমে পাহাড়ের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছেন। তবে অন্যদের ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই।’
‘কিন্তু আমার নিজের অন্যান্য মোগল সেনা কোথায়?
‘আমাদের চলে যাওয়ার প্রস্তুতি আর পুরো বিষয়টি শুনে ওদের মধ্যে কিছু লোক আতঙ্কিত হয়ে ভাবলো যে, আপনি আপনার বাবার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করার জন্য ওদেরকে ফাঁদে ফেলেছেন, আর ধরা পড়লে ওদেরকে শাস্তি দেওয়া হবে। তখন ওরা তাদের সেনাপতি, আপনার বন্ধু তাহাব্বুর খানের তাঁবুতে গিয়ে দেখলো উনিও সেখানে নেই। তখন এই চক্রান্তে সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে অনেকেই ইতোমধ্যে চলে গেল আর বাদবাকি যারা এখনও রয়েছে ওরাও চলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে–তবে আমার মনে হয় অনেকেই আপনার বাবার কাছে আত্মসমর্পণ করার জন্য যাবে। আর বিদেশিসহ অন্যান্যে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে রসদবহর থেকে যা পারছে লুট করে নিয়ে পালাচ্ছে।
আকবরের তরুণ কোরচিটি সারাক্ষণ তার পাশেই দাঁড়িয়েছিল। তিনি তার দিকে ফিরে বললেন, ‘দেহরক্ষী দলের সেনানায়ককে ডেকে আন। ছেলেটি চলে গেল তারপর একটুপরই ফিরে এসে বললো, তিনিও চলে গেছেন, জাঁহাপনা।
আকবর মাথা নাড়লেন। অবাক হলেন না। এটা পরিষ্কার যে, তার বাবা তাকে ঘুষ দিয়ে বশ করেছেন। কাউকে তার সাথে দেখা করতে না দেওয়াটা ছিল চক্রান্তেরই পরিকল্পনার একটি অংশ, যাতে রাজপুতদের সন্দেহ এতে বেড়ে যায়–আর তা-ই আসলে হয়েছিল। তখনও স্তম্ভিত অবস্থায় তিনি জগিন্দর আর তার কোরচিকে তার পিছু পিছু আসতে ইশারা করলেন। কর্দমাক্ত মাঠে পরিত্যক্ত অস্ত্রশস্ত্র আর সমরসম্ভারের পাশ দিয়ে তাহাব্বুর খানের তাঁবুর দিকে হেঁটে চললেন। যে কজন সৈন্য তখনও রয়ে গিয়েছিল, তারা তাকে দেখে সালাম দিল, তবে বেশিরভাগই দুদ্দাড় করে ছুটে পালাল, বুঝাই যাচ্ছে কেটে পড়ার তালে রয়েছে।
তাহাব্বুর খানের তাঁবুতে ঢুকে আকবর দেখলেন, তার দুধ-ভাইয়ের ব্যবহারের বেশিরভাগ জিনিসপত্র নেই, তবে একটা নিচু টেবিলের উপর সিলমোহর মারা ভাঁজ করা একটা কাগজ খাড়া করে রাখা আছে। উপরে তার নাম লেখা। কাঁপা কাঁপা হাতে কাগজটা তুলে নিয়ে তিনি ভজ খুললেন।
*
প্রিয় দুধ-ভাই, আপনাকে ছেড়ে যেতে হল বলে ক্ষমা চাচ্ছি। জানি এটা করে আমি আমার সম্মান হারিয়েছি। তবে আর কোনো উপায় ছিল না। গতরাতে আপনার বাবার উপদেষ্টা মিষ্টভাষী চালবাজ ওয়াজিম খান ছদ্মবেশে আমার কাছে এসেছিল। যখন আমরা একা হলাম, তখন সে আজমির দুর্গ ছেড়ে দেবার শর্ত নিয়ে আলোচনা না করে বললো, আপনার বাবা আমার জন্য একটা বার্তা পাঠিয়েছেন। সম্রাট তাকে বলেছেন আমাকে জানাতে যে, আমার বিশাসঘাতকতার কারণে আমার আসন্নপ্রসবা স্ত্রী, ছোট দুই ছেলে আর বাবা মাকে বন্দী করা ছাড়া তার আর কোনো উপায় ছিল না। তাদেরকে বন্দী করার প্রমাণ হিসেবে ওয়াজিম খান তাদের আংটি দেখাল। যদি আমি তাঁর আনুগত্যে ফিরে না যাই, তাহলে সম্রাট পরিবারসহ আমার একমাত্র ভাই আর সকলকে হত্যা করার নির্দেশ দেবেন। অর্থাৎ এই পৃথিবীর বুক থেকে আমাদেরকে নির্বংশ করা হবে। আপনি নিশ্চয়ই অনুমান করতে পারছেন আমি ওয়াজিম খানকে হত্যা করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু জানি তা করতে পারবো না। আমি অনেক অনুনয়-বিনয় করলাম, কিন্তু সে তাতে মোটেই কান দিল না, বরং বলা শুরু করলো হত্যা করার আগে তাদের উপর কি ধরনের অত্যাচার করা হবে। আর বললো, যদি আমি তাদের প্রস্তাবে রাজি হয়ে আওরঙ্গজেবের কাছে ফিরে গিয়ে সঠিক দায়িত্ব পালনের পথে যাই তবে আমাকে পুরস্কৃত করা হবে। সে আরো জানাল যে, শুধু আমার কাছেই এই ধরনের প্রস্তাব দেওয়া হয়নি… তাছাড়া সে শুনেছে যে, রাজপুতরাও আপনাকে ছেড়ে চলে যাবে। সে আমাকে নিশ্চয়তা দিয়ে বললো যে, আপনার বাবা কথা দিয়েছেন যে আপনাকে বন্দী করা হলে তিনি আপনাকে ক্ষমা করে দেবেন। সে বললো আপনাকে ত্যাগ করলে খারাপের চেয়ে বরং আপনার ভালো হবে। আমি দুর্বল হয়ে শেষ পর্যন্ত তার কথায় রাজি হলাম। অনুভব করলাম পরিবারের স্বার্থে এছাড়া আর কিছু আমার করার ছিল না। কুচকাওয়াজ পরিদর্শনের সময় সারাদিন আমি আপনাকে কিছু বলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু পারি নি। দয়া করে আমাকে ক্ষমা করবেন।
