আকবরের বক্তৃতার সাথে সাথে আকাশ থেকে ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়া শুরু হল।
১৩. মিষ্টভাষী চালবাজ/কপট উপদেষ্টা
ঘুমের ঘোরে আকবর এপাশ-ওপাশ করছিলেন। রাতে তাঁবুর ছাদে প্রচণ্ড বৃষ্টি পড়ার শব্দে আর ঝড়ো হাওয়ার গর্জনে দু-একবার তার ঘুম ভেঙ্গেছিল। একটি হাত তার কাধ ধরে আস্তে আস্তে ঝাঁকি দিতে দিতে তাকে বললো, “জাহাপনা, রাজপুতরা চলে গেছে।
এটা হয়তো একটা স্বপ্নের অংশ–যে স্বপ্নে চরম ভীতি আর উদ্বেগ একেবারে সামনে চলে আসে। তাকে এখুনি জেগে উঠে দেখতে হবে যে এটা সত্যি নয়। তিনি চোখ খুলে, চোখে আঙুল ঘষে ঘুম কাটাতে চেষ্টা করলেন। তবে হতাশ হলেন বাস্তবে ফিরে এসে। তার তরুণ কোরচি তার রেশমি আলখাল্লা এক হাতে বাড়িয়ে ধরে কথা বলছিল। রাতপোশাকের উপর এটা পরে তাকে অনুসরণ করে তাঁবুর দরজার কাছে এলেন। ছাউনির নিচ থেকে সামনে উঁকি দিয়ে ছোট ছোট খানাখন্দের উপর দিয়ে সামনে তাকালেন। সেখানে রাজপুতদের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সাহসী আর উদ্যমী সেই যোদ্ধাদের সেরকম কোনো হাঁকডাক, শোরগোল কিছুই শোনা যাচ্ছে না। কোনো চুলার আগুন নেই আর স্তূপ করা অস্ত্রশস্ত্রও দেখা যাচ্ছে না। তাছাড়া মনে হল রাজপুতদের বেশির ভাগ তাবুই নেই।
এটা কেমন করে হতে পারে? তাবুর ভেতরে একটি টেবিলের উপর পানির জগ রাখা ছিল। সেখান থেকে কিছু পানি নিয়ে মাথায় ছিটিয়ে এই ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টা করলেন। ভোরের ঠাণ্ডা পানিতে মাথা ভিজে গেলেও তার চোখের সামনের দৃশ্যটির কোনো পরিবর্তন হল না। এটা বাস্তবতা। আকবর থরথর করে কেঁপে উঠলেন। রাজপুতরা তাকে ছেড়ে চলে গেছে। তার সমস্ত আশা-আকাঙ্ক্ষা ধুলায় মিশে গেছে। তার বাবা তাকে ধরতে পারলে তার জীবন অর্থহীন হয়ে যাবে। নির্বাক হয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে তিনি বুঝার চেষ্টা করলেন কী হয়েছে, এমন সময় যে কয়েকটি তাবু তখনও ছিল সেখান থেকে কমলা রঙের পোশাকপরা একজন রাজপুত তার দিকে এগিয়ে এল। আকবর সাথে সাথে লোকটিকে চিনতে পারলেন–আম্বারের রাজার ছোট ছেলে জাগিন্দর। একে তিনি তার প্রায় সারা জীবন ধরে চিনতেন। জাগিন্দর কাছে এসে প্রণামের ভঙ্গিতে ভেজা মাটিতে লুটিয়ে পড়তেই আকবর তাকে উঠে দাঁড়াতে ইশারা করে বললেন, ‘এসবের দরকার নেই। কি হয়েছে বল?”
‘আমার বেশিরভাগ রাজপুত বন্ধুরা চলে গেছে। শুধু আমি আমাদের কয়েকজন অশ্বারোহীসহ রয়ে গেছি আপনাকে বিষয়টা জানাবার জন্য। কেননা আমি যতটুকু আপনাকে জানি, তাতে আমি বুঝি, যে কারণ দেখিয়ে ওরা চলে গেছে তা আমার বিশ্বাস হয় নি।
‘তুমি কী বলতে চাচ্ছ?
মাটির দিকে তাকিয়ে থেমে থেমে জাগিন্দর বলতে শুরু করলো, গতকাল আপনি যখন সেনাবাহিনী পরিদর্শন করছিলেন, তখন বিকানিরের রাজা শিবির সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য একটি প্রহরীদলকে চারপাশ টহল দিতে পাঠিয়েছিলেন। ওরা তখন দেখতে পেল দুজন নিরস্ত্র লোক নিঃশব্দে চোরের মতো শিবিরের দিকে আসছে। টহলদলটি সামনে এগোতেই ওরা দ্রুত তাদের কাছে আত্মসমর্পণ করলো। লোকদুটি শিবিরের দিকে চুপি চুপি আসছিল। ওদেরকে যখন জিজ্ঞাসা করা হল এখানে ওরা কি করছে, তখন ওরা প্রায় সাথে সাথে স্বীকার করলো যে, ওরা আপনার চাকর, আপনি যে চিঠি আপনার বাবাকে লিখেছিলেন তার উত্তর নিয়ে ওরা আপনার বাবার কাছ থেকে আসছিল। তারপর ওরা আওরঙ্গজেবের সিলমোহরসহ চিঠিটা টহলদলের হাতে দিল। ওরা চিঠিটা নিয়ে বিকানিরের রাজার কাছে দিল। তিনি সিলমোহর ভেঙ্গে চিঠিটা পড়লেন, তারপর সাথে সাথে অন্য রাজাদেরকে একটি সভায় ডাকলেন। সেখানে আমিও আমার বাবার সাথে উপস্থিত ছিলাম। সেখানে দেখলাম বিকানিরের রাজা রেগে ফেটে পড়ে বললেন, “আমি অনেক আগে থেকে উদ্বিগ্ন ছিলাম যে, মোগলদেরকে বন্ধু হিসেবে বিশ্বাস করা যায় কি-না। তারপরও আমি সভায় যোগ দিয়েছি আর আমাদের জনগণের একতার স্বার্থে আপনারা আকবরকে যে সমর্থন দিয়েছেন তাতে বিনা আপত্তিতে সায় দিয়েছি। আর এখন বাবার কাছ থেকে ছেলেকে লেখা এই চিঠিতে আমার সন্দেহই সঠিক প্রমাণিত হল। এটা অবশ্যই সম্রাটের নিজের হাতের লেখা–আমাকে লেখা তার চিঠি থেকে এ লেখা আমি খুব ভাল করে চিনি। এটা এভাবে শুরু হয়েছে শুনুন, “খুব চমৎকার কাজ করেছ, আমার সাহসী ছেলে। অসভ্য আর বর্বর রাজপুতদেরকে ফাঁদে ফেলার জন্য তুমি যে দক্ষতা আর চাতুরি দেখিয়েছ, তার জন্য আমি তোমাকে অভিনন্দন জানাচ্ছি।” আওরঙ্গজেব বিশদভাবে চিঠিটিতে বর্ণনা করেছেন, কিভাবে আপনারা দুজনে মিলে আজ আমাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করার জন্য কী পরিকল্পনা করেছিলেন… কিভাবে আপনি আমাদের সেনাদেরকে পথ দেখিয়ে এখান থেকে আজমির দুর্গে যাওয়ার মাঝপথে জঙ্গল আর ঝোঁপঝাড়ের আড়ালে লুকানো আপনার বাবার সবচেয়ে বড় কয়েকটি কামানের সামনে নিয়ে যাবেন।
আকবরের মাথা ঘুরতে শুরু করলো, জগিন্দর কি বলছে তা বুঝার চেষ্টা করতে লাগলেন, তখনও নিজেকে বুঝাচ্ছিলেন যে এটা বাস্তবতা কি-না। তারপর ফেটে পড়ে বললেন, এটা মিথ্যা, সম্পূর্ণ মিথ্যা। উত্তেজনায় তার গলা কাঁপছিল। আমি কখনও আমার বাবার সাথে চিঠি আদান-প্রদান করি নি। আমার একটা সম্মান আছে, যখন কোনো কথা দেই তা অবশ্যই রাখি। এটা তার আরেকটি জঘন্য চাল…বুঝতে পারছো না?
