হ্যাঁ, আপনার ছেলে সবার আগে ঘোড়ায় চড়ে এদিকেই আসছেন। আরো কয়েকজনের সাথে তিনি হয়তো বেশ আগেই আপনার কাছে পৌঁছে যাবেন। আমার গুপ্তচরেরা জানিয়েছে তার সদর দফতরের কয়েকজন তরুণ সেনানায়ক তাকে তার ভাইয়ের সাথে যোগ দেবার জন্য অনুরোধ করেছিল, তবে তিনি তাদেরকে জানিয়েছেন যে, তিনি প্রথমে তার বাবা আর নিজ ধর্মের প্রতি বিশ্বস্ত থাকবেন।
আওরঙ্গজেব স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। তার ছেলেরা তার বিরুদ্ধে এক হচ্ছে না। তারপর বললেন, ভালো কথা বলেছ। আমি তাকে নতুন দায়িত্ব দিয়ে পুরস্কৃত করবো আর তার ভাইয়ের অধীনে যেসব জায়গাজমি আছে সেগুলো তাকে দেব। তবে মুয়াজ্জমের শিবিরে যারা আমার বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতা করার জন্য তাকে উস্কে দিতে চেয়েছিল তাদের একটা তালিকা আমাকে দাও। সময় এলে আমি তাদেরকে কঠিন শাস্তি দেব।’
‘অবশ্যই জাঁহাপনা। শাহজাদা আকবরের এগিয়ে আসা থামাতে আর কিছু কি আমি করতে পারি? আমি ইতোমধ্যেই আপনার সেনা কর্মকর্তাদের বলেছি মুসাফিরের ছদ্মবেশে কিছু চর পাঠাতে, যাতে ওরা তার শিবিরে ঢোকার চেষ্টা করে ওদের পরিকল্পনা জানার চেষ্টা করে। সেনা কর্মকর্তারা জানিয়েছে, আপনার হুকুমে কোষাগার থেকে সৈন্যদের মাঝে অর্থপুরস্কার বিতরণ করা হয়েছে, আর তা পেয়ে ওরা খুব খুশি হয়েছে। এতে ওদের মনোবল চাঙ্গা হয়েছে আর ওরা নতুন উদ্যমে অনুশীলন করছে, যদিও সংখ্যায় বেশ কম। রসদের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানিয়েছে অস্ত্রভাণ্ডারে বারুদ, গাদা বন্দুক আর কামানের গোলা যথেষ্ট পরিমাণে মজুদ রয়েছে। শস্যভাণ্ডার আর পানির আধারগুলোও ভর্তি রয়েছে। কাজেই ওরা যদি দুর্গ অবরোধ করে তাহলে আমরা প্রতিরোধ করতে পারবো।’
‘তোমার কথা শুনে আমি খুশি হলাম। এই মুহূর্তে তোমার জন্য আর কোনো কাজ নেই। আরো দু-একটা বিষয় নিয়ে আমি ভাবছি, তবে তা তোমাকেও বলার আগে আমাকে আরো ভাবতে হবে কিভাবে আকবরের এগিয়ে আসা ব্যাহত করা যায়।
*
বর্শার ডগায় কমলা রঙের লম্বা সরু পতাকা উড়িয়ে অশ্বারোহী দলের প্রথম সারিটি সামনে এগোতেই আকবর মন্তব্য করে উঠলেন, কি সুন্দর লাগছে দেখতে। দুই পাশে তাহাব্বুর খান আর মেবারের রানাকে নিয়ে তিনি তার যুদ্ধহস্তির খোলা হাওদার উপর দাঁড়িয়েছিলেন। ত্রিশ হাজার অশ্বারোহী সেনার বেশিরভাগই ছিল আম্বার ও বিকানিরের রাজপুত আর মারওয়াড় এবং মেবারের অশ্বারোহী সেনা। ক্রমাগত আরো সেনা আসছিল। ওরা সবই চকচকে কমলা, হলুদ আর লাল রঙের রণবেশ আর পাগড়িপরা ছিল। সূর্য আর চন্দ্রের প্রতাঁকের নিচে অগ্নিশিখা সম্বলিত পতাকা ওরা বহন করছিল। ঘোড়ার পিঠে বাদকদল ঢাক আর শিঙায় রক্ত গরম করা রণসঙ্গীত বাজিয়ে চলছিল। আকবরের হাতির সামনে দিয়ে কুচকাওয়াজ করে যাওয়ার সময় সৈন্যরা একযোগে খাপ থেকে তরোয়াল বের করে ঠোঁটে লাগাতেই সকালের রোদ পড়ে তরোয়ালের পাতে ঝিলিক দিয়ে উঠছিল। এক এক সারিতে পঞ্চাশজন ঘোড়সওয়ার থাকলেও প্রায় এক ঘণ্টা লাগলো সবাইকে হাতির সামনে দিয়ে পার হয়ে যেতে।
এরপর এল গোলন্দাজ বাহিনী। প্রথমে এল পানি নিরোধক কাপড়ে ঢাকা বারুদ আর কামানের গোলা বহনকারী শকটগুলো। তারপর এল আট কিংবা দশ চাকার গরুর গাড়িতে টেনে আনা লম্বা নলের কামান। কামান টেনে আনা আঁড়গুলোর শিংয়ে লাল নীল রঙের ফিতা বাঁধা ছিল। গোলন্দাজদের মধ্যে অনেক তুর্কি ভাড়াটে সেনা ছিল। কাঁধে লোহার দণ্ড নিয়ে ওরা কামানের পাশে পাশে হাঁটছিল। দুই তিনজন ইউরোপিয়কে দেখে আকবর বেশ মজা পেলেন। তার কাছে আসতেই কামানের নলের উপর চড়ে বসে ওরা তাদের টুপি নাড়ছিল। রোদে পুড়ে ওদের মুখ লাল হয়ে রয়েছে।
কামানের সারি চলে যাওয়ার পর আকবর তাহব্দুর খানকে বললেন, আজমির দুর্গের অবরোধ যদি শুরু করতে হয় তবে এগুলোই তার জন্য যথেষ্ট। এমন সময় ধূলিধূসরিত পথে পদাতিক সেনারা আসতে শুরু করলো। পুরো সেনাবাহিনীর মধ্যে এরা ছিল সবচেয়ে সাধারণ। অনেকে খালি পায়ে পুরোনো ধরনের অস্ত্রশস্ত্র, বল্লম আর তীর-ধনুক নিয়ে এসেছে। তাসত্ত্বেও এদেরকেও যথেষ্ট সুশৃঙ্খল মনে হল আর তার সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় ওরা তার জয়ধ্বনি করতে করতে গেল।
পরিদর্শন শেষ হওয়ার পর আকবর হাতির পিঠ থেকে নামলেন। রানা আর। তাহাব্বুর খানকে সাথে নিয়ে তিনি একটি অস্থায়ী কাঠের মঞ্চের দিকে হেঁটে চললেন। সেখানে অন্যান্য রাজপুত রাজা আর তার নিজের মোগল জ্যেষ্ঠ সেনানায়করা তার জন্য অপেক্ষা করছিল। নিম্নপদস্থ সেনা কর্মকর্তারা মঞ্চের চারপাশে দাঁড়িয়ে প্রচণ্ড গরমে ঘামছিল। সকালবেলা যে কালো মেঘ দিগন্তে দেখা গিয়েছিল, তা এখন মাথার উপর অর্ধেক আকাশ ঢেকে ফেলেছে। ঝড় আসতে আর বেশি দেরি নেই। আকবর ক্ষীপ্রগতিতে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে মঞ্চে উঠে রাজপুত রাজা আর তার সেনাপতিদের তার পেছনে অর্ধবৃত্তাকারে দাঁড়াতে বললেন। তারপর কয়েক পা হেঁটে মঞ্চের সামনে গিয়ে একহাত তুলে সবাইকে চুপ হতে বলে উপরের দিকে মুখ করে নিচে দাঁড়ান নিম্নপদস্থ সেনাপতিদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিতে শুরু করলেন।
দুই হাত তুলে নিচের সবাইকে আলিঙ্গনের ভঙ্গিতে তিনি বললেন, “আজ আপনাদের শৃঙ্খলা আর বিভিন্ন শাখার অস্ত্রভাণ্ডার দেখে আমি আর আমার সহযোদ্ধা ভাইয়েরা সত্যি অভিভূত হয়েছি। শুধু তাই নয় আপনারা সবাই আমাকে যে দিলখোলা সালাম জানিয়েছেন তাও অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক ছিল। আজমির দুর্গ থেকে এই দেওয়ারাই মাত্র দশ মাইল দূরে। আগামীকাল আমরা সামনে এগিয়ে দুর্গ ঘিরে ফেলে আমার বাবা আর তার মুষ্টিমেয় সমর্থকদের আত্মসমর্পণ করতে শক্তি প্রয়োগ করবো। হিন্দু, মুসলিম আর শিখ, সবার কাছ থেকে সমর্থনের বার্তা এসেছে। কাজেই একবার আমার বাবা আমাদের কজায় এলে সমস্ত বিরাধিতা অদৃশ্য হয়ে যাবে। বিজয় আমাদের হবে আর এই সাম্রাজ্য আবার একতাবদ্ধ হবে।
