মেবারের রানা বললেন, “আমাদের চরদের কাছ থেকে আমরা যে খবর পেয়েছি তাতে বুঝা যাচ্ছে যে, আওরঙ্গজেব আজমিরেই রয়েছেন এবং আমরা সেখানে পৌঁছার আগে তাঁর বাইরে থেকে সেনাবাহিনীর সহায়তা পাওয়ার খুব একটা সম্ভাবনা নেই। আর এখান থেকে আজমির যেতে তিন থেকে চারদিন লাগবে। ‘সে যাইহোক, আজমির দুর্গ খুবই সুরক্ষিত।
তবে শহরের অনেক বাসিন্দা রাজপুত বংশীয় আর আমরা বিশ্বাস করি ওরা আমাদের প্রতি সহানুভূতিশীল। ওদের সাহায্য নিয়ে আমরা প্রতিরক্ষা ভেদ করে ভেতরে ঢুকে আপনার বাবাকে কজা করতে পারি।
রানার দুই সারি পেছন থেকে মোটামতো একজন সেনা কর্মকর্তা বলে উঠলো, ‘আর আমাদের লোকজনদের সাথে তিনি যা ব্যবহার করেছেন, তাতে তাকে মেরে ফেলাই ঠিক হবে।
রানা ঘুরে লোকটির দিকে ইস্পাতকঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, ‘থাম রবি। এসব বিষয়ে তোমার বিচার করার অধিকার নেই। আর তা তোমার ভালর জন্যই বলছি।
আকবর বললেন, একটা ব্যাপার আমি আপনাদেরকে জানাতে চাই। আমি কখনও আমার বাবার মৃত্যুদণ্ড দিতে রাজি হব না। তাকে আরামদায়ক অবস্থায় আটক করে রাখতে হবে।’
‘আমার পেছনে এই রবির মতো মাথা-গরম দু-একজন লোকেরা রাজদরবারের সভায় যোগ দেওয়ার জন্য উপযুক্ত নয়, এদের স্থান কেবল যুদ্ধের ময়দান। আপনার কাছে প্রস্তাব নিয়ে আসার আগে থেকেই আমরা জানতাম যে, আপনি তাঁর মৃত্যুদণ্ডের ব্যাপারে রাজি হবেন না। তাঁকে কারাগারে বন্দী করে রাখার বিষয়ে আমরা একমত।
‘শুনে আমি খুশি হলাম।
তবে আপনাকে অনুরোধ করবো, যত আরামেই তাঁকে বন্দী রাখুন, জায়গাটি অবশ্যই ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে অনেক দূরে কোথাও হতে হবে। আগ্রা কিংবা দিল্লিতে রাখলে তিনি তাঁর অতিসূক্ষ্ম বুদ্ধি আর কূটচাল দিয়ে কোনো একটা ফন্দি বের করে মতবিরোধ জাগিয়ে তুলবেন। সবচেয়ে ভাল হয় তাকে কয়েকশো মাইল দূরে কোথাও নির্বাসন দিলে।
‘কোথায় সেটা হতে পারে তেমন কোনো জায়গার কথা ভেবেছেন?
‘রাজস্থানের মরুভূমির মাঝে কোনো দুর্গ কিংবা জয়সলমির দুর্গ-নগরী সম্ভবত ঠিক হবে। সেখানে যে কঠিন পরিশ্রমী আর ধর্মপ্রাণ হিন্দুরা থাকে, তাদের মধ্যে তিনি খুব একটা সমর্থক পাবেন না।
মাঝখান থেকে তাহার খান বললেন, জাঁহাপনা, আমরা সবাই এই বিষয়ে মোটামুটি একমত যে, আপনার বাবাকে বন্দী করা হবে। কোথায় তাকে রাখা হবে সেটা ভবিষ্যতের ব্যাপার। প্রথমে তাকে আমাদের পাকড়াও করতে হবে। আর রানা যাই বলুন আমার মনে হয় না ব্যাপারটা এত সহজ হবে। আমাদেরকে দ্রুত কাজে লেগে পড়তে হবে।
‘তুমি ঠিক বলেছ তাহাবুর খান। রানা, আজমির দুর্গকে বাইরের সাহায্য থেকে বিচ্ছিন্ন করতে আর আমার বাবাকে বন্দী করার জন্য আপনার সেনাবাহিনী। কখন রওয়ানা দেবে?
‘আগামীকাল ভোরের আলো ফোঁটার সাথে সাথে।
‘আমার সেনারাও তাই করবে। তাহাব্বুর খান, তুমি প্রয়োজনীয় নির্দেশ দাও। কাল ভোরে আমরা মোগল সাম্রাজ্যের একটি নতুন প্রভাত সৃষ্টি করার জন্য রওয়ানা দেব।’ এই প্রথম সম্রাটের ক্ষমতার স্বাদ আর সেই সাথে সঠিক শব্দ চয়ন করতে পেরে আকবর বেশ খুশি হলেন। তার ঠোঁটে মৃদু হাসি দেখা দিল।
*
আজমির দুর্গের মূল আঙিনায় একটি ছড়ানো নিম গাছের ছায়ার নিচে বসে আওরঙ্গজেব চাপরাশিকে হুকুম করলেন, ‘ওয়াজিম খানকে আমার কাছে পাঠাও।’ ওয়াজিম খান ছিলেন তাঁর পুরোনো একজন উজিরের ছেলে। আওরঙ্গজেবের গুপ্তচর চক্রের কেন্দ্রে সে দিন দিন একজন নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত ব্যক্তি হয়ে উঠেছিল। তিনি খুব আশা করতেন তাঁর বাদবাকি উপদেষ্টা আর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারাও তার মতো কর্মঠ, উদ্ভাবনপটু আর বিচক্ষণ হোক।
কয়েক মিনিট পর কালো পোশাক পরা বলিষ্ঠ ওয়াজিম খান হাজির হল। প্রভুর কাছে ছুটে আসার কারণে সে তখনও একটু একটু হাঁপাচ্ছিল। আওরঙ্গজেব হাতের ইশারায় তাকে তার পাশে বসতে বললেন, এখানে আমার কাছে এসে বস।
ওয়াজিম খান ভ্র থেকে ঘাম মুছে আসন গেড়ে তার পাশে বসতেই ম্রাট জিজ্ঞেস করলেন, ‘আকবর আর তার রাজপুত মিত্রদের খবর কী?
‘ওরা প্রচুর সৈন্য নিয়ে আজমিরের পথে রয়েছে।
‘তাই আশা করেছিলাম। আচ্ছা, দুদিন আগে তুমি যখন আমার সাথে দেখা করেছিলে, তখন আমার ছেলের শিবিরের একজন গণকের কথা বলেছিলে। তুমি বলেছিলে তাকে ঘুষ দিলে সে পঞ্জিকা থেকে গণনা করে ওদেরকে জানাবে যে, বারো দিন পর নতুন চাঁদ উঠার আগে আজমির আক্রমণ করা শুভ নয়। আর এতে আমরা মূল্যবান কিছু সময় হাতে পাব।
হ্যাঁ, আমি লোক পাঠিয়েছি। ওরা ইতোমধ্যেই কিছু সফলতার খবর জানিয়েছে।
যুক্তিসম্পন্ন কোনো মানুষ কি করে যে এইসব আজেবাজে বিষয়ে বিশ্বাস করে তা আমি বুঝি না। যাই হোক, তাহলে আমরা আশা করতে পারি যে, ওরা এটা বিশ্বাস করে সামনে এগোন আপাতত স্থগিত করেছে। আর তাই যদি হয় তাহলে বাইরে থেকে আমাদের সেনারা হয়তো তাদের আক্রমণের আগেই এখানে পৌঁছতে পারবে। ওরা কতদূর এগোল, জেনেছ কিছু?
কাসিদরা নিশ্চিত করেছে, বিভিন্ন দিক থেকে আপনার বিশ্বস্ত সেনারা দ্রুত এদিকেই ছুটে আসছে। তবে ওরা এখনও বেশ দূরে রয়েছে আর নতুন চাঁদ উঠার আগে অনেকেই এখানে পৌঁছতে পারবে না।’
‘ঐ বিশ্বস্ত সেনাবাহিনীর মধ্যে কী মুয়াজ্জম আছে?
