‘তুমি কি বলছো একবার ভেবে দেখ। শুধু একজন শাসকের মতো নয় বাবার মতোও আচরণ কর। এককালে তুমি বিশ্বাস করতে, সেটা সঠিক হোক আর ভুল হোক, যে তোমার আর তোমার মতামতের প্রতি বাবার কোনো শ্রদ্ধা ছিল না। আকবরও হয়তো তোমার ব্যাপারে তাই ভাবতে পারে। আমি জানি সে অসন্তুষ্ট হয়েছে, কারণ তুমি তার খুব বেশি সমালোচনা কর। তুমি যদি তাকে আরো ভালোবাসতে, তার প্রতি আরো আস্থা রাখতে, তাহলে হয়তো সে কখনও অন্যের কথায় কান দিত না কিংবা তার প্রশংসা শুনতে তৈরি থাকতো না। আমি প্রায়ই এ ব্যাপারে তোমার সাথে কথা বলতে চেয়েছি, কিন্তু তোমাকে যতটুকু জানি তাতে ভয় হত যে, এতে হয়তো ভালো না হয়ে বরং আরো ক্ষতি হতে পারে। তাই বিষয়টা আমি নিজের মধ্যে চেপে রাখি। এখন নিজেকে দোষী মনে হচ্ছে কেন, আরো কঠিনভাবে চেষ্টা করলাম না।
‘এতে খুব একটা ক্ষতি-বৃদ্ধি হত না। প্রশংসার পরিবর্তে নিন্দাই বেশিরভাগ সময় আকবরের প্রাপ্য ছিল। আমি কেবল চেষ্টা করেছিলাম তাকে সঠিক পথে আনতে–তবে মনে হয় সফল হতে পারি নি।
তাই যদি তোমার উদ্দেশ্য হত, সেক্ষেত্রে তুমি যদি এত কঠোর না হতে তাহলে হয়তো সে রাজপুতদের চাটুবাক্যে এত সহজে প্রভাবিত হত না। তোমার ছেলেদের মধ্যে একমাত্র কমবক্সের প্রতি তুমি যা কিছু আদর ভালোবাসা দেখাও।
তার কারণ সে একটা শিশু মাত্র। যখন কমবক্স বড় হবে তখন আমি আশা করবো সেও আমাকে মান্য করবে আর আমার মতামতের প্রতি সম্মান। দেখাবে।
‘তোমার চেহারা দেখে আমি বুঝতে পারছি এত কথা বলে আমি তোমার ধৈর্যচ্যুতি ঘটাচ্ছি। আর এও জানি এবার যা বলতে যাচ্ছি তা তোমাকে আরো বিরক্ত করে তুলবে। এটা আমি আগেও বলেছি আর অবশ্যই আবারও বলবো। এই বিদ্রোহর জন্য হিন্দুদের প্রতি তোমার আচরণও কিছুটা দায়ী। তুমি কি দেখতে পাচ্ছ না, যদি তুমি আরো সহিষ্ণুতা দেখাতে, তাহলে সাম্রাজ্য শাসন করাটা আরো স্বচ্ছন্দ হত, আর তুমি আর রাজপুতদের মতো তোমার প্রজারা, উভয়েই আরো সন্তুষ্ট থাকতে?
‘শাসনের সাথে স্বাচ্ছন্দ্য আর সন্তুষ্টির কী সম্পর্ক? ন্যায় আর কর্তব্য হচ্ছে এখানে একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
‘আমি তো কর্তব্যের কথাই বলতে চাচ্ছি–ভালোভাবে শাসন করার কর্তব্য, তোমার অধীনস্থ সমস্ত মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করা, শুধু কিছু মানুষকে শাস্তি দেওয়া কিংবা কেউ কেউ যেমন বলে নির্যাতন করা নয়।’
যারা শাস্তি পাওয়ার যোগ্য নয় তাদেরকে আমি কখনও শাস্তি দেই না।’
‘পৃথিবী সম্পর্কে তোমার ধারণা কখন এত শীতল হল? একজন সম্রাট হিসেবে তোমার অনেক ভালো কিছু করার ক্ষমতা আছে। তারপরও তুমি কেবল ছায়া ছড়াতে পছন্দ করছে। আমার কথায় তুমি কষ্ট পেলে আমি দুঃখিত, তবে এখানে তোমার মা থাকলে তিনিও একথা বলতেন। তুমি অতি সহজে নিন্দা করতে পার, তবে প্রশংসা করার বেলায় বেশ ধীর…এমন রুঢ় আর ক্ষমাহীন আচরণ কর যে, তোমার ছেলেরাসহ লোকজন সবাই তোমাকে ভয় পায়। সেজন্যই তারা মন খুলে কথা বলে না কিংবা সুপরামর্শও দেয় না। আজ্ঞাবহ মানুষের মতো কেবল তোমার কথায় সায় দেয়।
আওরঙ্গজেব কিছু বললেন না। এতে সাহস পেয়ে জাহানারা আবার বলতে শুরু করলেন, ‘দয়া কর আওরঙ্গজেব–যদি তুমি দেখ যে আকবরকে ক্ষমা করা কঠিন, তাহলে এই বিদ্রোহ দমন করতে যাতে রক্তপাত না হয় সেজন্য যা কিছু তুমি করতে পার কর। আমাদের পরিবার আবার ভেঙ্গে টুকরা টুকরা হোক। আমি আর তা সহ্য করতে পারবো না। যত চেষ্টাই করুন তার গলা ভেঙ্গে গেল, একটু দয়া কর, আমি তোমার কাছে ভিক্ষা চাচ্ছি…’।
জাহানারা আপনার মনের অবস্থা আমি বুঝি। আপনি সারা জীবন আমাদের পরিবারকে এক করে রাখার চেষ্টা করে কাটিয়েছেন। আমি সেটা জানি, যদিও অনেক সময় তা প্রকাশ করি নি। তবে, যাইহোক, এতটুকু বলার পর আওরঙ্গজেব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তারপর বললেন, যা ঘটছে তার জন্য আমার দোষ খুঁজতে গিয়ে আপনি একজন পুরুষের জগৎ সম্পর্কে একজন নারীর অজ্ঞতার সাথে প্রতারণা করছেন। আমি সম্রাট আর আমাকে একাই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তা যতই বেদনাদায়ক হোক। আকবর আর তার বিধর্মী মিত্রদেরকে কোনো ধরনের দয়ামায়া দেখানো হবে না, তাদেরকে অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে। একটু থামলেন, তারপর চোখ নামিয়ে মেঝের দিকে তাকিয়ে গলার স্বর নরম করে বললেন, এই বিষয় নিয়ে আর তর্ক-বিতর্ক করা অনর্থক বরং আমরা উভয়েই কষ্ট পাব। তার চেয়ে ভালো হয় যদি আপনি দয়া করে আপনার ঘরে ফিরে যান।’ জাহানারা উঠে ধীরে ধীরে কামরা থেকে বের হয়ে গেলেন। নিজের ঘরে ফিরে মনে সান্ত্বনা পাওয়ার জন্য একটি সুফিবাদের বই তুলে নিলেন। তবে তাঁর দুই-চোখ ভরে পানি চলে আসায় বইয়ের শব্দগুলো ঠিকমত দেখতে পারছিলেন না। সারাটি জীবন তিনি তাঁর পরিবারকে এক করে রাখার চেষ্টা করে এসেছেন আর বার বার ব্যর্থ হয়েছেন। শাহজাহান আর মমতাজ সারাজীবন পরস্পরকে ভালোবেসে আর একসাথে দুঃখ-কষ্ট ভোগ করে কাটিয়েছিলেন, অথচ তাঁদের সন্তানদের একদিন এই পরিণতি হবে কে তা ভেবেছিল?
১২. সম্রাট দ্বিতীয় আকবর
জাঁহাপনা, সভাসদরা আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।
চকচকে রত্নখচিত রাজদরবারের আলখাল্লা পরা আমবারের রাজার কথাগুলো ২৩ বছরের আকবরের কানে মধুবর্ষণ করলো। রাজা আর তাহাব্বুর খানকে সাথে নিয়ে তিনি বালুময় মাটির উপর দিয়ে তার তাঁবুর দিকে হেঁটে চললেন। একজন পরিচারক মাথার উপর বিরাট একটি সাদা ছাতা ধরে রয়েছে। তাঁবুর কাছে পৌঁছে দেখলেন তার রাজপুত মিত্ররা তাঁবুটিকে ঐতিহ্যবাহী মোগল সর্বাধিনায়কের লাল টকটকে রঙে রাঙিয়েছে। তাঁবুর ছাউনির নিচে স্থাপন করা মখমলে ঢাকা নিচু সোনার সিংহাসনটির দিকে এগোতেই দুইপাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ান রাজপুত রাজারা একযোগে তাকে কুর্নিশ করলো। এই সদিচ্ছাজ্ঞাপক ভঙ্গি দিয়ে ওরা তার প্রতি যে আস্থা আর শ্রদ্ধা দেখাচ্ছে তা তিনি উপভোগ করলেও, রাজপুতদের গর্ব আর সামাজিক অবস্থান ও পদমর্যাদা সম্পর্কেও তিনি সচেতন। তিনি জানেন তার এই নতুন অবস্থানের অহংকারে তাকে ডুবে থাকলে চলবে না। তিনি দ্রুত রাজাদেরকে উঠতে ইশারা করে বললেন, যদিও আমি আপনাদের নেতা, তবে আমার এই অবস্থানে পৌঁছাবার জন্য আপনারা যে সমর্থন আর উৎসাহ যুগিয়েছেন তার জন্য আমি আপনাদের কাছে ঋণী। আপনারা আমার সহযোদ্ধা-ভাই। আমরা একসাথে মিলে মোগল সাম্রাজ্যকে এর বর্তমান খণ্ডিত অবস্থা থেকে নতুনভাবে আবার এর ঐক্যবদ্ধ গৌরবময় অবস্থায় ফিরিয়ে আনবো। তবে তা করার আগে আমার বাবা আর তার গোঁড়ামিপূর্ণ হামসাচ্চা সমর্থকদের মধ্যে বিভাজন করার যে শক্তি মূর্ত রয়েছে তা আমাদেরকে দমন করতে হবে। তাদের সর্বশেষ সামরিক তৎপরতা সম্পর্কে আমরা কী জানি?
